ফেব্রুয়ারির শেষ দিনে ইরানে ব্যাপক হামলা চালিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটিকে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ করতে বলেন। কিন্তু অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে সেই ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি, স্থাপনা ও ইসরাইলে পালটা আঘাত শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের কোটি কোটি ডলারের রাডার সিস্টেম ধ্বংস হয়ে যায় স্বল্প মূল্যের ড্রোনে। এখন সেই ইরানের শর্তেই সমঝোতা করল যুক্তরাষ্ট্র। এমন বিজয় উপসাগরীয় অঞ্চলে দেশটিকে যে আরও প্রভাবশালী করবে, তা নিয়ে সন্দেহের সুযোগ কম।
যুদ্ধ বন্ধ ও হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ১৪ দফার একটি সমঝোতা প্রস্তাব ছিল আলোচনার টেবিলে। এ সপ্তাহের শুরুতে ওই প্রস্তাবে আগেভাগেই সই করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। অপেক্ষা ছিল তেহরানের স্বীকৃতির। গত বুধবার রাতে চুক্তিতে সইয়ের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।
আজ সুইজারল্যান্ডে অন্তর্বর্তী চুক্তির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে। চুক্তিটি কীভাবে বাস্তবায়ন হবে এবং পরবর্তী চূড়ান্ত চুক্তির রূপরেখা কেমন হবে-এখন এসব বিষয় নিয়ে দুপক্ষের আলোচনা চলবে।
এরই মধ্যে চুক্তির শর্ত অনানুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমের সামনে এসেছে। এটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, কার্যত এতে ইরানের দাবিগুলো প্রাধান্য পেয়েছে। এ চুক্তির মাধ্যমে ইরান ফেরত পাচ্ছে বিভিন্ন দেশের ব্যাংকে জব্দ তাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ। এছাড়া দেশটিকে সহযোগিতা করতে ৩ হাজার কোটি ডলারের তহবিল গঠন করা হবে। পাশাপাশি তেহরানের ওপর থেকে সব ধরনের বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে।
ট্রাম্প ও পেজেশকিয়ান সমঝোতা চুক্তির ইলেক্ট্রনিক সংস্করণে সই করেছেন। বিবিসি জানায়, গত বুধবার ট্রাম্প চুক্তিটির একটি মুদ্রিত অনুলিপিতেও সই করেন। সুইজারল্যান্ডে আজ আলোচনার মাধ্যমে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির বিষয়টিও নিশ্চিত করা হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিবিসি জানায়, সুইস শহর বুর্গেনস্টকে আজ আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে দেবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। ইরানের প্রতিনিধি দলে থাকবেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ।
আয়োজনকারী দেশ সুইজারল্যান্ড এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান, মধ্যস্থতাকারী হিসাবে পাকিস্তান, কাতারসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দেশের সঙ্গে আগামীকাল বুর্গেনস্টকে সমঝোতা স্মারকের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা শুরু হবে।
চুক্তিটি গত বুধবার থেকে কার্যকর বলে মেনে নেওয়া হয়েছে। এ খবরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম অব্যাহতভাবে কমছে। ওয়েলপ্রাইস ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বৃহস্পতিবার বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও কমে প্রতি ব্যারেল ৭৮ দশমিক ৬৪ হয়েছে, যা গত বুধবারের তুলনায় ৩ ডলার কম। চুক্তি সইকে স্বাগত জানিয়েছে কাতারসহ বিভিন্ন দেশ। মধ্যস্থতা করায় প্রশংসায় ভাসছে পাকিস্তানও। অন্তর্বর্তী চুক্তির প্রশংসা করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান।
তিনি এটাকে ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত বলে বর্ণনা করেছেন। পেজেশকিয়ান বলেন, এ চুক্তিতে ইরানের মানুষের আওয়াজ প্রতিফলিত হয়েছে। কোনো চাপ বা হুমকিতে স্বাধীনতা ও মর্যাদাকে বিকিয়ে দেওয়া হয়নি। চুক্তি স্বাগত জানিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে সপরিবারে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল। একই দিনে মিনাব শহরে একটি স্কুলে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়ে ১৬৮ শিশু শিক্ষার্থীকে হত্যা করা হয়। এরপরই পালটা হামলা শুরু করে ইরান।
ইরান চুক্তির সমালোচকদের ‘নির্বোধ’ বললেন ট্রাম্প : ইরানের বিষয়ে ‘যথেষ্ট কঠোর নন’ বলে যে সমালোচনা করা হচ্ছে, তার জবাব দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেন, ‘এই বোকারা মনে করে আমি ইরানের বিষয়ে যথেষ্ট কঠোর ছিলাম না; এটা এমন এক সময়ে তারা মনে করছে যখন শেয়ারবাজার সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং তেলের দাম কমছে। তারা হয় হিংসুক, খারাপ মানুষ, নয়তো নির্বোধ।’
শর্তে যেসব বিষয় ইরানের পক্ষে : মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন ট্রাম্প প্রশাসনের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চুক্তির অনানুষ্ঠানিক একটি খসড়া গত বুধবার প্রকাশ করে। এতে দেখা গেছে, অধিকাংশ শর্তই ইরানের পক্ষে। ইরান বারবার যেসব দাবি জানিয়ে আসছিল, সেগুলোর প্রতিফলন এ ১৪ দফায় উঠে এসেছে। পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্রমাগতভাবে ইসরাইলের সমালোচনা করে যাচ্ছেন। সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরির আবহও সৃষ্টি হয়েছে।
১৪ দফা চুক্তিতে বিভিন্ন দেশে ইরানের অবরুদ্ধ সম্পত্তি অবমুক্ত করার বিষয়টি রয়েছে। শুরুতে আছে লেবাননে যুদ্ধ বন্ধের প্রসঙ্গ। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডতাকে সম্মানের কথা বলা হচ্ছে। দুই দেশ একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না। যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ তুলে নেবে; হরমুজ খুলে দেবে তেহরান। ইরানের পুনর্বাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ৩ হাজার কোটি ডলারের অর্থায়ন নিশ্চিত করবে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের ওপর আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে অঙ্গীকারের কথা এ অন্তর্বর্তী চুক্তিতে রয়েছে। ইরান পুনর্ব্যক্ত করছে-তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন করবে না। পরমাণু নিয়ে আলোচনার বিষয়টি পরবর্তী সময়ের জন্য রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য, ব্যাংকিং, বিমা, পরিবহণ ও সংশ্লিষ্ট পরিষেবার রপ্তানির জন্য ছাড়পত্র জারি করবে-এমন বিষয়ও শর্তে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
লেবাননে অব্যাহত হামলা ইসরাইলের : চলমান পরিস্থিতিতে লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। আলজাজিরা জানায়, গতকাল দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের হামলায় অন্তত ৩ জন নিহত হয়েছেন। লেবাননের রাষ্ট্রীয় ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি জানায়, কাফর তাবনিত শহরে ড্রোন হামলায় অন্তত দুজনকে হত্যা করে ইসরাইল। জাবাদিন এলাকায় আরেকজন নিহত হন। এর আগের দিন বুধবারও লেবাননের বিভিন্ন স্থানে হামলা হয়েছে।
বৈরুত থেকে আলজাজিরার জিনা খোদর জানান, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির ঘোষণার পর সংঘাতের মাত্রা কিছুটা কমলেও হামলা পুরোপুরি থামেনি। লেবাননের পাশাপাশি গাজায়ও হামলা চালাচ্ছে ইসরাইল।