Image description
নীরব মহামারি অনলাইন জুয়া : শেষ পর্ব

অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে প্রতিদিন দেশ থেকে পাচার হচ্ছে কয়েকশ কোটি টাকা। বিদেশি মূল হোতাদের হয়ে দেশীয় এজেন্টরা মোবাইল ব্যাংকিং বা এমএফএস ব্যবহার করে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করছে। এরপর তা নিষিদ্ধ ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে মুহূর্তের মধ্যে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে দেশের বাইরে। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ভাড়া করা সিম এবং এমএফএসের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে জুয়ার সাইটগুলোতে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। মোটা অঙ্কের কমিশনের লোভে গড়ে ওঠা এই ‘ডিজিটাল হুন্ডি’ চক্র দেশের অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ালেও, ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন ট্র্যাক করার প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এর কূলকিনারা করতে পারছে না।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান (ভারপ্রাপ্ত) ডিআইজি আলি আকবর খান যুগান্তরকে বলেন, অনলাইন জুয়ার টাকা ফরমাল কোনো চ্যানেলে লেনদেন হয় না। দেশে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেন নিষিদ্ধ। তারা এর মাধ্যমে লেনদেন করছে। ইনফরমাল চ্যানেলে লেনদেন হওয়ার ফলে বিষয়টি শনাক্ত করা মুশকিল। আমরা যাদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছি তাদের মধ্যে দেখা গেছে একেকটি গ্রুপ প্রতিদিন প্রায় ২০ কোটি টাকার মতো লেনদেন করছে। এমন আরও অনেক গ্রুপ রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের নন-ফিন্যান্সিয়াল ব্যাংকিং সেক্টরে যারা আছেন আর ফিন্যান্সিয়াল মনিটরিং সিস্টেমে যারা আছেন তাদের সঙ্গে বসে অনলাইন জুয়ার টাকা লেনদেন কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় সে বিষয়ে আলোচনা করে তাদের সহযোগিতা চাইব। কারণ আলটিমেটলি একটা এমএফএস অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে যখন টাকা ট্রান্সফার হয় অ্যাকাউন্টটা তখন ক্লোজ হয়ে যায়, তখন আর আমরা ক্লু পাই না, এখানে গিয়ে আটকে যেতে হয়। উনারা যদি একটু সহযোগিতা করেন তাহলে হয়তো আমরা আর একটু আগাতে পারব।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, দেশে জুয়ার টাকা লেনদেনের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে-বিকাশ, নগদ, রকেট, উপায়সহ অন্যান্য মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস)। বেশি লেনদেন হয় গভীর রাতে। এ সময় ১ মিনিটে একেকটি এজেন্ট অ্যাকাউন্টে ২০০ থেকে ৪০০ বারও লেনদেন হয়। গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, ২৪ ঘণ্টায় জুয়ার টাকার লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫০০ থেকে ১০০০ কোটি টাকা পর্যন্ত। এর মধ্যে একটি অংশ বিদেশে পাচার হয়ে যায়।

অনলাইন জুয়াকে কেন্দ্র করে দেশে নিষিদ্ধ ক্রিপ্টোকারেন্সির একটি বড় মার্কেটও গড়ে উঠেছে। এমএফএসের মাধ্যমে স্থানীয় মুদ্রা (টাকা) সংগ্রহের পর তা বাইন্যান্স বা অন্যান্য এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে ইউএসডিটি বা বিটকয়েনের মতো ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করা হয়। রূপান্তরিত এই অর্থ মুহূর্তের মধ্যে দেশের বাইরে থাকা মূল সাইট পরিচালকদের অ্যাকাউন্টে চলে যায়, যা দেশের ব্যাংকিং চ্যানেলের সম্পূর্ণ বাইরে থাকে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষে এই অর্থ ট্র্যাক করা কঠিন হয়ে পড়ে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জুয়ার সাইটগুলো পরিচালিত হচ্ছে দেশের বাইরে থেকে। আর দেশে একেকটি জুয়ার সাইটের টাকা সংগ্রহে গড়ে উঠেছে একেকটি নেটওয়ার্ক। দেশি এজেন্টরা বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে মোবাইল সিম ভাড়া নেয়। প্রতিটি সিমের ভাড়া দিচ্ছে মাসে তিন থেকে চার হাজার টাকা। সেই সিমে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এজেন্ট অ্যাকাউন্ট খুলে টাকা লেনদেন করছে। পরে এমএফএস প্রতিষ্ঠানের ডিএসওর (ডিস্ট্রিবিউশন সেলস অফিসার) মাধ্যমে তুলে নিচ্ছে টাকা। এরপর ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে বিদেশে অনলাইন জুয়ার মূল হোতাদের কাছে টাকা পৌঁছে দিচ্ছে। এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য দেশি এজেন্টরা অনলাইন জুয়ার টাকার সর্বোচ্চ ২০ ভাগ পর্যন্ত কমিশন পাচ্ছে। কোনো কোনো এজেন্ট দিনে দুই থেকে তিন লাখ টাকাও কমিশন পান এমন তথ্য মিলেছে গোয়েন্দাদের অনুসন্ধানে।

সম্প্রতি জুয়ার কারবারে জড়িত ছয় চীনা নাগরিককে গ্রেফতারের পর টাকা লেনদেনকারী কয়েকশ সিম উদ্ধার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। ডিবির ভাষ্য, গ্রেফতাররা সংঘবদ্ধভাবে অনলাইন জুয়া, প্রতারণা, অবৈধ ই-ট্রানজেকশন ও অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত। তারা অন্যের নামে নিবন্ধিত এমএফএস এজেন্ট সিম সংগ্রহ করে জিএসএম গেটওয়ের মাধ্যমে শতাধিক সিম একসঙ্গে সক্রিয় রাখে।

সম্প্রতি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে জুয়ার লেনদেন করে এমন ৮৭৯ মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট ও বিভিন্ন ব্যাংকের ৪৩টি অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে এবং ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গোয়েন্দা বিভাগকে (বিএফআইইউতে) অনুরোধ জানিয়েছে সিআইডি। ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের এক কর্মকর্তা বলেন, ক্রিপ্টোকারেন্সির সঙ্গে বাংলাদেশের একটা লিগ্যাল অ্যাগ্রিমেন্ট লাগবে। যার মাধ্যমে জানা যাবে কোথা থেকে কিভাবে টাকা হস্তান্তর হচ্ছে। এটা অন্যান্য মাধ্যমগুলোর সঙ্গেও লাগবে; যেন গোয়েন্দারা তথ্য-উপাত্ত চাইলে পান।

অনলাইন জুয়ার টাকা লেনদেনে সম্পৃক্ততার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিকাশের জনসংযোগ শাখার প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম যুগান্তরকে বলেন, আমরা আমাদের এজেন্টদের কার্যক্রম তদারকি করি এবং সেখানে যে কোনো সন্দেহজনক লেনদেন লক্ষ্য করলেই আমারা রিপোর্ট করি। এক্ষেত্রে আমাদের দুটি শাখা রয়েছে। এছাড়া গণমাধ্যমে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে, সামাজিক মাধ্যমে আমরা সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন দিচ্ছি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নগদের জনসংযোগ শাখার প্রধান সজল জাহিদ বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজ নিতে হবে।