দেশের কৃষি উৎপাদনে নীরবে ক্রমে হুমকি হয়ে উঠেছে মাটির অ্যাসিডিটি বা অম্লতা। দেশের প্রায় ৩৯ লাখ হেক্টর আবাদি জমি, অর্থাৎ প্রায় ৪৬ শতাংশ আবাদি জমি বর্তমানে অম্লতা থেকে অতি অম্লতার পর্যায়ে রয়েছে।
কৃষি গবেষকরা বলছেন, সঠিক মাত্রায় চুন বা ডলোমাইট প্রয়োগের মাধ্যমে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। এতে শুধু উৎপাদনই বাড়বে না, জাতীয় অর্থনীতিতেও হাজার কোটি টাকার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
দেশের প্রায় অর্ধেক আবাদি জমিতে অম্লতার প্রভাব : এসআরডিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট ৮৫ লাখ হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে প্রায় ৩৯ লাখ হেক্টর জমির মাটির পিএইচ ৫.৫-এর নিচে। অর্থাৎ দেশের প্রায় ৪৬ শতাংশ আবাদি জমি অম্লতা বা অতি অম্লতার অবস্থায় রয়েছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন কৃষি-প্রতিবেশ অঞ্চল এ অম্ল মাটির বিস্তার রয়েছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা এবং উচ্চ বৃষ্টিপাতপ্রবণ অঞ্চলে এই সমস্যা বেশি।
এসআরডিআইয়ের তৈরি মাটির অম্লতা মানচিত্রে দেখা যায়, দেশের উল্লেখযোগ্য অংশে মাটির পিএইচ ৪.৫ থেকে ৫.৫-এর মধ্যে অবস্থান করছে। এ ধরনের মাটিতে ফসল প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করতে পারে না, এতে ফলন কমে যায়।
গবেষণায় মাটির অম্লতা বৃদ্ধির কয়েকটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমত, ফসলের মাধ্যমে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম ও সোডিয়ামের মতো ক্ষারধর্মী উপাদান ক্রমাগত অপসারণ হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ইউরিয়া ও সালফারজাত রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহার মাটিকে আরো অম্ল করে তুলছে।
এ ছাড়া জৈব সারের ব্যবহার কমে যাওয়া, জৈব পদার্থের ক্ষয়, অতিবৃষ্টি ও পুষ্টি উপাদান ধুয়ে যাওয়া, চুনজাতীয় উপাদানের ব্যবহার না করা এবং উচ্চ ফসল নিবিড়তাও মাটির অম্লতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একই জমিতে বছরে তিন থেকে চারটি ফসল উৎপাদনের ফলে মাটির ওপর চাপ বাড়ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, মাটির অম্লতা শুধু উৎপাদন কমায় না, এটি একটি বড় পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সমস্যাও। অম্ল মাটিতে অ্যালুমিনিয়াম, আয়রন ও ম্যাঙ্গানিজের বিষক্রিয়া বাড়ে। অন্যদিকে ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও মলিবডেনামের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানের প্রাপ্যতা কমে যায়।
চুন প্রয়োগে সমাধান : এসআরডিআই গবেষকদের মতে, মাটির অম্লতা দূর করার সবচেয়ে কার্যকর ও অর্থনৈতিক উপায় হলো চুন বা ডলোমাইট প্রয়োগ। চুন প্রয়োগের মাধ্যমে মাটির পিএইচ বাড়ে ও অম্লতা কমে যায়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব জমির পিএইচ ৫.৫ বা তার নিচে, সেসব জমিতে চুন প্রয়োগ করা প্রয়োজন। চুনের সঠিক মাত্রা নির্ভর করে মাটির ধরন, জৈব পদার্থের পরিমাণ এবং বিদ্যমান পিএইচ অবস্থার ওপর।
রাজশাহীতে মাঠপর্যায়ের গবেষণায় আশাব্যঞ্জক ফল : রাজশাহীর তানোর উপজেলার বিনোদপুর এলাকায় আলুচাষিদের নিয়ে পরিচালিত একটি মাঠ গবেষণায় ডলোমাইট ও জৈবসারের সমন্বিত ব্যবহারের সুফল মূল্যায়ন করা হয়েছে। গবেষণায় কৃষকের প্রচলিত পদ্ধতি এবং গবেষকদের সুপারিশকৃত পদ্ধতির তুলনা করা হয়।
ফলাফলে দেখা যায়, কৃষকের জমিতে আলুর ফলন ছিল প্রতি হেক্টরে ৩৩.৬ টন। একই জমিতে ডলোমাইট ও উন্নত মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনা প্রয়োগের ফলে ফলন বেড়ে প্রতি হেক্টরে ৪৫ টনে পৌঁছায়। অর্থাৎ ১১.৪ টন বা প্রায় ৩৪ শতাংশ ফলন বেড়ে যায়।
গবেষকরা বলছেন, এটি শুধু একটি পরীক্ষামূলক প্লটের ফল নয়; সঠিক প্রযুক্তি বিস্তার করা গেলে দেশের অম্লমাটিপ্রবণ এলাকাগুলোতে একই ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
কৃষকের ব্যয়ও কমেছে : শুধু ফলনই নয়, উৎপাদন খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কৃষকের নিজস্ব পদ্ধতিতে প্রতি হেক্টরে সার বাবদ খরচ ছিল ৬৮ হাজার ৭১০ টাকা। গবেষণা পদ্ধতিতে সেই খরচ নেমে এসেছে ৩৮ হাজার ৬৭৫ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি হেক্টরে সাশ্রয় হয়েছে ৩০ হাজার ৩৫ টাকা, যা কৃষকের মোট সার খরচের ৪৩.৭১ শতাংশ।
মাটির রাসায়নিক গুণাগুণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চুন প্রয়োগের আগে মাটির পিএইচ ছিল ৪.৯। গবেষণা পদ্ধতি অনুসরণের পর তা বেড়ে ৬ পর্যন্ত উঠেছে। একই সঙ্গে মাটিতে ফসফরাস, পটাসিয়াম ও সালফারের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
মাটির স্বাস্থ্যেও ইতিবাচক পরিবর্তন : গবেষণায় মাটির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের উন্নতির তথ্যও উঠে এসেছে। চুন প্রয়োগের আগে গবেষণা এলাকার মাটির পিএইচ ছিল ৪.৯। বিভিন্ন মাত্রায় ডলোমাইট প্রয়োগের পর পিএইচ বেড়ে ৫.৬ থেকে ৬.৫ পর্যন্ত পৌঁছায়। একই সঙ্গে মাটিতে ফসফরাস, পটাসিয়াম, সালফার ও ম্যাগনেসিয়ামের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
গবেষকদের মতে, শুধু ফলন বৃদ্ধি নয়, দীর্ঘমেয়াদে মাটির উর্বরতা পুনরুদ্ধারেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জাতীয় অর্থনীতিতে হাজার কোটি টাকার সম্ভাবনা : তানোর উপজেলার ২২,৮০০ হেক্টর চাষযোগ্য জমির মধ্যে ১৩,১৩৫ হেক্টর (৫৭.৬%) জমিতে আলু চাষ হয়। গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, এই একটি উপজেলাতেই সঠিক পদ্ধতিতে চাষ করলে কৃষকরা বছরে প্রায় ৪০ কোটি টাকা সার বাবদ অপচয় থেকে রক্ষা পেতেন। বর্ধিত উৎপাদন থেকে (প্রতি কেজি ২৫ টাকা হিসাবে) আরো প্রায় ৩৭ কোটি টাকা বেশি আয় সম্ভব।
সারা দেশে আলু চাষের মোট জমির পরিমাণ ৪.৫৭ লাখ হেক্টর। এই পুরো এলাকায় গবেষণার পদ্ধতি প্রয়োগ করা গেলে বছরে এক হাজার থেকে এক হাজার ১০০ কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, দেশে জমিতে অতিরিক্ত ও অসুষমভাবে রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে মাটির অম্লত্ব ক্রমাগত বাড়ছে, যা মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা ও উৎপাদনক্ষমতার জন্য উদ্বেগজনক।
তিনি মনে করেন, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় রাসায়নিক সারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে সবুজ সার, খামারজাত জৈব সার এবং ভার্মিকম্পোস্টের ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। এতে মাটির গুণগত মান উন্নত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই কৃষি উৎপাদন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।