মাঝরাতে হঠাৎ বুকটা ধড়ফড় করলে বিছানায় উঠে বসেন মোহাম্মদপুরের ৭২ বছর বয়সী রহিমা বেগম। তার বিশাল চার বেডরুমের ফ্ল্যাটটি থেকে তখন শুধু ভেসে আসে ঘড়ির টিকটিক শব্দ। নিস্তব্ধতা যেন গ্রাস করে তাকে। স্বামী মারা গেছেন বহু আগেই।
দুই সন্তানকে তৈরি করেছেন সমাজের উঁচুতলার মানুষ হিসেবে। তাদের একজন নামকরা বহুজাতিক কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তা, অন্যজন স্থায়ীভাবে থিতু হয়েছেন সুদূর লন্ডনে। আজ তারা ব্যস্ত নিজেদের জীবন নিয়ে। অবশ্য সন্তানরা বেশ টাকা খরচ করে মায়ের জন্য একজন সাহায্যকারী রেখে দিয়েছেন। যিনি সারাদিন থাকেন, সব কাজ করে রাতে চলে যান। এরপর থেকেই একা হয়ে পড়েন রহিমা। তার পাশে থাকেন না কথা বলার কোনো মানুষ। এমনকি রাতের বেলা এক গ্লাস পানি এগিয়ে দেওয়ার জন্যও পাওয়া যায় না কাউকে।
শুধু রহিমা বেগম নন, ‘জাদুর শহর’ ঢাকার রাজকীয় ফ্ল্যাটগুলোর বন্ধ দরজার আড়ালে লুকিয়ে আছে এমন হাজারো প্রবীণের গল্প। সন্তানের একটু হাসির জন্য নিজেদের পুরো জীবন, যৌবন আর সঞ্চয় উৎসর্গ করে দেওয়া বাবা-মায়েরা হয়ে পড়ছেন একা। ক্যারিয়ার, নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ততার চোরাবালিতে হারিয়ে সেই সন্তানরাই মা-বাবাকে বানিয়ে দিয়েছেন ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা ‘পরিত্যক্ত আসবাব’। সম্প্রতি বেশ কয়েকজন প্রবীণের মৃত্যুর ঘটনা প্রকাশ পেতেই আলোচনায় এসেছে তাদের নিঃসঙ্গ জীবনের প্রসঙ্গ।
বাংলাদেশে প্রবীণদের একাকিত্ব, নিঃসঙ্গতা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, এআরসিইডি ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একাধিক জরিপ ও গবেষণাপত্র প্রকাশ হয়েছে। এসব বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রবীণদের নিঃসঙ্গতার হার শহর ও গ্রামীণ জীবনের নানা প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ভিন্নভাবে উঠে এসেছে।
প্রবীণ জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘প্লস ওয়ান’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৫১ দশমিক ৫ ভাগ প্রবীণ কোনো না কোনোভাবে একাকিত্ব বা মানসিক নিঃসঙ্গতায় ভোগেন। এর মধ্যে ঢাকায় প্রবীণদের একাকিত্বের হার অনেক বেশি। এ শহরে বসবাসরত প্রবীণদের মধ্যে ৫৭ দশমিক ১ ভাগ প্রবীণ একাকিত্ব বা নিঃসঙ্গতা অনুভব করেন। শহুরে অ্যাপার্টমেন্ট কালচার, ব্যস্ত জীবনযাত্রা এবং সামাজিক মেলামেশার অভাব এই নিঃসঙ্গতার অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকার বাইরে অঞ্চলভেদে এই হার কিছুটা ভিন্ন। যেমন: রংপুর বিভাগে ৫৭ দশমিক ৬, খুলনা বিভাগে ৫২ দশমিক ৫, চট্টগ্রামে ৫১ দশমিক ১ ও সিলেট বিভাগে ৪২ দশমিক ৭ ভাগ।
সাম্প্রতিক সমাজতাত্ত্বিক সমীক্ষা ও প্রবীণ অধিকারবিষয়ক ক্ষুদ্র গবেষণামূলক প্রতিবেদনে ঢাকা শহরের অন্য এক চিত্র উঠে এসেছে। পরিসংখ্যান বলছে, রাজধানী ঢাকার প্রবীণ জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩ থেকে ৫ শতাংশ মানুষ কোনো সঙ্গী বা সন্তান ছাড়াই বিশাল ফ্ল্যাট বা বাড়িতে সম্পূর্ণ একাকী জীবনযাপন করেন। তাদের দেখভালের জন্য শুধু গৃহকর্মীই ভরসা।
অর্থনৈতিক সংকট, আবাসন সমস্যা ও আধুনিকায়নের প্রভাবে কয়েক বছর ধরেই ঢাকায় যৌথ পরিবার ভেঙে দ্রুত একক পরিবার গড়ে উঠছে। ফলে ঢাকার প্রায় ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ বয়স্ক মানুষ সন্তান ছাড়া শুধু জীবনসঙ্গীকে নিয়ে আলাদা থাকছেন। সন্তানরা নিজেদের সংসার নিয়ে আলাদা ফ্ল্যাটে থাকছেন। বাকি ৮০ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবীণ যৌথ পরিবারে সন্তান-নাতি-নাতনির সঙ্গে থেকেও একা।
গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকায় বসবাসরত প্রবীণদের নিঃসঙ্গতার আরেকটি বড় কারণ সঙ্গী হারানো। জীবনসঙ্গী মারা যাওয়ার পর তীব্র ও চরম একাকিত্বে ভোগেন তারা, যা পরে গভীর মানসিক ব্যাধি ও চরম অবসাদে রূপ নেয়। গবেষণায় দেখানো হয়, যেসব প্রবীণ পরিবার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা বা একা বসবাস করেন, তাদের মধ্যে নিঃসঙ্গতার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এ হার প্রায় ৭২ দশমিক ২ শতাংশ। স্বামী বা স্ত্রী মারা যাওয়ার কারণে প্রায় ৩৩ দশমিক ৫ ভাগ প্রবীণ তীব্র নিঃসঙ্গতায় ভোগেন। আর যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার হওয়া এবং সন্তানদের দূরবর্তী স্থানে বা বিদেশে অবস্থান করাকে ১৮ দশমিক ৬ ভাগ প্রবীণ তাদের নিঃসঙ্গতার মূল কারণ বলেছেন।
মোহাম্মদপুরের রহিমা বেগম চোখের কোণটা আলতো করে মুছে অস্পষ্ট স্বরে বলছিলেন, ‘ছেলেটা যখন ছোট ছিল, নিউমোনিয়ায় ভুগত। সারা রাত কোল থেকে নামাতাম না। কত রাত যে ও বিছানা ভিজিয়ে দিয়েছে, ওকে নিজের বুকের ওপর শুকনো জায়গায় শুইয়ে আমি নিজে ভেজা কাঁথায় শুয়ে বিছানায় রাত কাটিয়েছি।’
দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে, খানিক থেমে বলে ওঠেন, ‘অথচ বুড়ো বয়সে আমি একটু অসুস্থ হলে ঘরে কেউ এক ফোঁটা জল দেওয়ার থাকে না। টাকা দিয়ে কাজের লোক রাখা যায়; কিন্তু নাড়ির টান তো বাজারে কিনতে পাওয়া যায় না!’
উত্তরায় কথা হলো ডা. রেজাউল করিমের সঙ্গে। বারান্দার গ্রিল ধরে বাইরের পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যে বয়সে ঘর জুড়ে নাতি-নাতনিদের কোলাহল থাকার কথা, সেই বয়সে একাকিত্বের চাদর মুড়ি দিয়ে বারান্দায় চুপচাপ বসে থাকতে হয়। দূর থেকে যখন অন্য শিশুদের খেলতে দেখি, মনটা কেমন যেন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। শুধুই মনে হয়— যদি নিজের নাতি-নাতনিদের একটু বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে পারতাম!’
ঢাকার গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি এবং উত্তরার মতো অভিজাত এলাকাগুলোর মধ্য ও উচ্চবিত্ত পরিবারের তরুণদের একটি বড় অংশ উচ্চশিক্ষা বা চাকরির সূত্রে স্থায়ীভাবে উন্নত দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। এই তরুণদের স্থানান্তরের চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে প্রবীণ মা-বাবাকে। বিশাল ফ্ল্যাটে একাকী থাকতে থাকতে যখন আর শরীর চলে না, তখন বাধ্য হয়ে অনেকে প্রথাবদ্ধ জীবন ছেড়ে আশ্রয় নিচ্ছেন বিভিন্ন বৃদ্ধাশ্রমে। অথচ সমীক্ষা বলছে, দেখভালের অভাব ও একাকিত্ব থেকে বাঁচতে বৃদ্ধাশ্রমে আসা প্রবীণদের ৬০ শতাংশ মানুষই সেখানে গিয়ে তীব্র বিষণ্নতায় ভোগেন। পরিবার থেকে দূরে বাস করতে গিয়ে ছটফট করেন।
প্লস ওয়ানের গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সামগ্রিকভাবে প্রায় ৭ দশমিক ৭ ভাগ প্রবীণ সম্পূর্ণ একা বা একাকী একটি পরিবারে বসবাস করেন। তবে ব্যাপক অর্থে, বাংলাদেশের প্রায় ২০ ভাগ প্রবীণ হয় একেবারেই একা থাকেন অথবা সন্তানহীন অবস্থায় শুধু বৃদ্ধ স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে বসবাস করেন। সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে এ সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. শেখ তৌহীদুল ইসলাম আগামীর সময়কে বলছিলেন, ঐতিহ্যবাহী যৌথ পরিবার ব্যবস্থা ভেঙে যাওয়া, কর্মসংস্থান বা উন্নত জীবনের খোঁজে সন্তানদের শহর কিংবা বিদেশে পাড়ি জমানো এবং জীবনসঙ্গী হারানোর কারণে বাংলাদেশের প্রবীণদের একা বেঁচে থাকার এই হার জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার হওয়ার সামাজিক ও মানসিক চড়া মূল্য চুকাতে হচ্ছে প্রবীণদের।
একাকিত্বের প্রভাব কেমন হতে পারে, জানতে চাইলে এই বিশেষজ্ঞ বললেন, ‘একাকিত্ব শুধু মানসিক কষ্ট নয়, এটি প্রবীণদের ডিমেনশিয়া (স্মৃতিভ্রম), উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। সেজন্য সামাজিকভাবে প্রবীণবান্ধব ডে-কেয়ার সেন্টার বা কমিউনিটি ক্লাব গড়ে তোলা দরকার। যেখানে তারা সমবয়সীদের সঙ্গে সময় কাটাতে পারবেন। পাশাপাশি হাসপাতাল, গণপরিবহন এবং সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে প্রবীণ ডেস্ক বা বিশেষ অগ্রাধিকার কোটা চালু করা এখন সময়ের দাবি।’