Image description

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আদায় করবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট আয়ের ৮৬ দশমিক ৯০ শতাংশ। শুধু এনবিআর সংস্কার এবং সংস্থাটি আলাদা করার মাধ্যমে এই অর্থ আদায় করার পরিকল্পনা নিয়েছেন তিনি। যদিও চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দশ মাসে এনবিআর রেকর্ড ঘাটতি ১ লাখ কোটি ছাড়িয়েছে। বছর শেষে হিসাব করলে তা আরও ত্রিশ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। অর্থনৈতিক এই ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী বড়দের ছাড় দিয়ে ছোটদের করজালে এনে এই আয়ের পরিকল্পনা করেছেন। এনবিআরের মাধ্যমে এই রাজস্ব আয় প্রায় অসম্ভব বলেও জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত বাজেটের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, অর্থমন্ত্রী এনবিআরের ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য মোটা দাগে ৬টি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েছেন। সংস্থাটির ছয়টি বিষয়ে ভর করে ৬ লাখ কোটি টাকার বৈতরণি পার হতে চান অর্থমন্ত্রী। প্রথমেই রাজস্ব বাড়ানোর জন্য এনবিআরের কর নীতি এবং বাস্তবায়ন আলাদা করার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। যদিও এনবিআর দুই ভাগ করতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যাপক আন্দোলন হয়েছে। ক্যাডার দন্ধে গঠিত কমিটির প্রতিবেদনের পর আটকে যায়। আর আন্দোলন ইস্যুতে অনেক কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে এসব কর্মকর্তাকে শাস্তির মাধ্যমে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। বিষয়টিকে রাজস্ব আয় বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া দ্বিতীয় পদক্ষেপ হিসেবে আয়কর ই-রিটার্ন এবং ভ্যাট ই-রিটার্ন চালু করা হবে। যদিও এনবিআর চলতি অর্থবছর থেকে আয়করে ই-রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা হয়। ই-রিটার্ন চালুর মধ্যে ১ কোটি ২০ লাখ টিআইএনধারীর মধ্যে মাত্র ৫০ লাখ রিটার্ন দাখিল করেন। এই রিটার্নের মধ্যে বেশ শূন্য রিটার্ন রয়েছে। যেখান থেকে এনবিআর কোনো ধরনের কর পায়নি। তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উৎসে কর যাচাইয়ের মাধ্যমে সময় কমিয়ে রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা কষেছেন অর্থমন্ত্রী। যদিও বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আরেকটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে জনবান্ধব কর প্রশাসন গড়ে তোলার মাধ্যমে করের আওতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছেন অর্থমন্ত্রী। জনবান্ধব কর প্রশাসনের বিষয় নিয়ে ব্যবসায়ী এবং সাধারণ করদাতার মধ্যে বেশ আলোচনা রয়েছে। ব্যবসায়ীরাও বলছেন, তৃণমূল পর্যায়ে কর আদায় করতে জনবান্ধব কর প্রশাসনের বিকল্প নেই। কর কর্মকর্তাদের নিয়ে যে ভীতি, তা দূর করতে হবে।

জানতে চাইলে তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু কালবেলাকে বলেন, এনবিআরের বিশাল এই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বেশ চ্যালেঞ্জিং। এই বিশাল অঙ্কের রাজস্ব অর্জনে তৃণমূল পর্যায়ে করজাল সম্প্রসারণ করতে হবে। আর তৃণমূলে কর আদায় করতে গেলে এনবিআরের কর্মকর্তাদের নিয়ে সাধারণ মানুষের যে ভীতি রয়েছে, তা দূর করার বিকল্প নেই বলেও জানান এই ব্যবসায়ী নেতা।

প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, কাস্টমসের পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন এবং রপ্তানির সম্বাবনাময় খাতকে শুল্কমুক্ত ব্যবস্থায় উপকরণ আমদানি সুবিধার মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছেন অর্থমন্ত্রী। যদিও বর্তমান বাস্তবতায় কাস্টমসের পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন তৈরি হতে বেশ সময়ও লাগতে পারে। অটোমেশন পরিপূর্ণ না করেই চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা থেকে আরও বাড়িয়ে নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া নতুন অর্থবছরে উৎসে করের বেশকিছু জায়গায় কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। নতুন করে ভ্যাটের আওতা বাড়ালেও আগামী অর্থবছরে ভ্যাটের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার কোটির ঘরে। এ ছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী সারা দেশের ক্ষুদ্র ও খুচরা বিক্রেতা থেকে হাজারপ্রতি দুই টাকা করে আদায় রাজস্ব আদায় বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন। যদিও সব উদ্যোগ মিলিয়ে নতুন অর্থবছরে ৩৮ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা বাড়তি আদায়ের পরিকল্পনা নিচ্ছে এনবিআর। কিছু ক্ষেত্রে করকে উৎসে করসহ কিছু কৌশলী কর নির্ধারণের কৌশল নিয়েছে সংস্থাটি। তবু লক্ষ্যমাত্রা অর্জন খুবই কঠিন বলেও জানিয়েছেন খোদ এনবিআর কর্মকর্তারা।

নতুন অর্থবছরে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রাহমান কালবেলাকে বলেন, চলতি অর্থবছরেই ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড ঘাটতি হতে পারে। এর মধ্যে নতুন অর্থবছরে আরও বাড়িয়ে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে। আগামী অর্থবছরেও রেকর্ড ঘাটতির মুখে পড়তে পারে সরকার। আর রাজস্ব ঘাটতিতে পড়লে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেবে। এতে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হবে। আর উচ্চ মূল্যস্ফীতির নিয়ন্ত্রণের যে লক্ষ্য নিয়েছে সরকার, তা পূরণ করাও চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে বলেও জানান এই ব্যবসায়ী নেতা।

বাজেট বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, আগামী অর্থবছরে করের হার নয়, করের আওতা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। এতে করছাড় পেয়েছেন প্রায় সবাই, তবে করের আওতায় বেশি পড়েছেন ছোটরাই। বাজেটের ক্ষুদ্র ও খুচরা ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ কর ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে করের আওতা বাড়াতে খুচরা বিক্রেতাদের কর ব্যবস্থার আওতায় আনতে পণ্য সরবরাহের সময় ০.২০ শতাংশ অগ্রিম কর কেটে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি এক হাজারে ২ টাকা কর দিতে হবে। হারটি খুবই কম হলেও এর মাধ্যমে খুচরা পর্যায়ের ব্যবসাকে করের আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। ব্যবসায়িক ব্যাংক হিসাবের জন্য ব্যবসায় শনাক্তকরণ নম্বর (বিন নিবন্ধন) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৫০ সিসি বা তার বেশি ক্ষমতার মোটরসাইকেল নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও টিআইএন প্রয়োজন হবে। আবার বাজেটে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাব, ইউটিলিটি সেবা ও সম্পত্তির তথ্যকে একটি সমন্বিত ডাটাবেজে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে জনবান্ধব কর প্রশাসনের বিকল্প নেই বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এনবিআর সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছর থেকে আকার বাড়িয়ে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় যা ১৮ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে এনবিআরের লক্ষ্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২০ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ বেশি। এই লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশের প্রাচীন ব্যবসায়ী সংগঠন এমসিসিআই। সংগঠনটি বলেছে, চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত এনবিআর সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৬৫ শতাংশ রাজস্ব আদায় করতে পেরেছে এনবিআর। এ অবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া নতুন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে। সংগঠনটির আশঙ্কা, রাজস্ব আদায়ে চাপ বাড়লে করদাতারা হয়রানির শিকার হতে পারেন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যেতে পারে বলেও জানিয়েছে। এর বাইরে গবেষণা সংস্থাগুলোও রাজস্ব আহরণ সম্ভব নয় বলেও অভিমত দিয়েছেন। যদিও বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বাজেটে করের আওতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।