মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল, এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) এবং কয়লা আমদানিতে বাংলাদেশকে চার মাসে (মার্চ থেকে জুন) প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে। যুদ্ধের কারণে এই তিন পণ্যেই দেশের ১৮ কোটি মানুষের ঘাড়ে গড়ে ১৮৩৩ টাকার বোঝা চেপে বসেছে। এর মধ্যে তেল আমদানিতে ৪ মাসে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা, এলএনজি আমদানিতে ১২ হাজার কোটি টাকা এবং কয়লা এবং ফার্নেস অয়েল আমদানিতে ৩-৪ হাজার কোটি টাকা বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে।
এর বাইরে এলপিজিসহ (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) অসংখ্য আমদানি করা নিত্যপণ্য আছে। যা সাধারণ মানুষকে আগের চেয়ে অনেক বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। বিশেষ করে এলপিজির ১২ কেজির সিলিন্ডার ১৪০০-১৫০০ টাকা থেকে বেড়ে এখন ২ হাজার টাকায় কিনতে হচ্ছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরু হয়। ইতোমধ্যেই ১০০ দিন অতিক্রম করেছে। কবে সবকিছু স্বাভাবিক হবে তা কেউ জানেন না। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে তত বেশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে বাংলাদেশ। কেননা জ্বালানি তেল, এলএনজি এবং এলপিজি, সার অনেকটাই মধ্যপ্রাচ্য নির্ভর। হঠাৎ বিকল্প বাজার খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকদের।
আজ প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করা হচ্ছে। যুদ্ধের কারণে জুন পর্যন্ত এই তিন পণ্যে যে লোকসান দিতে হয়েছে তার একটি হিসাব তৈরি করা হয়েছে। এই লোকসান পুষিয়ে নিতে ইতোমধ্যেই সরকারি সংস্থাগুলো মন্ত্রণালয়গুলোকে চিঠি দিয়েছে। যুদ্ধের কারণে বেশি ক্ষতি হয় জ্বালানি তেল আমদানি ও বিক্রয় করে। জ্বালানি বিভাগ এবং বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, ১ মার্চ থেকে ৯ জুন পর্যন্ত বিপিসিকে লোকসান দিতে হয়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকা। জুনের বাকি ২১ দিনে এই সংস্থাকে আরও ৩ হাজার কোটি টাকা লোকসান দিতে হবে।
সরকারি কর্মকর্তারা জানান, যুদ্ধ শুরুর আগে ৩০ হাজার টন ডিজেলের একটি জাহাজ বা পার্সেল আমদানি করতে বিপিসির খরচ হতো ২ থেকে ২ কোটি ২০ লাখ ডলার। এখন কিনতে হচ্ছে ৩ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বেশি দামে। এপ্রিলে একটি পার্সেল ৫ কোটি ৩০ লাখ ডলারেও ক্রয় করতে হয়েছে। বিপিসি লিটারে ১১৫ টাকায় ডিজেল বিক্রি করলেও এখন ক্রয় করতে হচ্ছে ১৮০ টাকার বেশি দিয়ে।
বিপিসি জানিয়েছে, সম্প্রতি তারা জ্বালানি বিভাগের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বিপিসি বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য ৩৮ হাজার কোটি টাকা রেখেছিল। সেই টাকা থেকে ইতোমধ্যেই (চিঠি দেওয়া পর্যন্ত) ১২ হাজার কোটি পর্যন্ত খরচ করা হয়েছে। সরকার বিপিসিকে কোনো ভর্তুকি দিচ্ছে না। এখন যুদ্ধ বিলম্বিত হলে বিপিসির বাকি টাকা শেষ হতে বেশি সময় লাগবে না। তাই তারা লোকসানের সব টাকা ভর্তুকি আকারে ফেরত চেয়েছে। তবে জ্বালানি সচিব মাহাম্মদ সাইফুল ইসলাম গত সপ্তাহে যুগান্তরকে বলেছেন, আগামী অর্থবছরে বিপিসিকে ভর্তুকি হিসাবে কোনো অর্থ দেওয়া হচ্ছে না। বিপিসি তাদের অর্থ দিয়েই আপাতত খরচ সামাল দেবে। বিপিসি বছরে ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে। গত বছর ব্যয় করা হয়েছে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার। বিপিসির লাভ হয়েছে ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বেশি।
পেট্রোবাংলা প্রতিবছর ৭০ লাখ টনের মতো এলএনজি আমদানি করে। দেশে দৈনিক ২৭০ কোটি ঘনফুটের মতো গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে আমদানি করা এলএনজি হচ্ছে ১০৫ কোটি ঘনফুট।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) একেএম মিজানুর রহমান যুগান্তরকে জানান, যুদ্ধের কারণে চার মাসে এলএনজি খাতে ১২ হাজার কোটি টাকার মতো লোকসান হবে। যুদ্ধের আগের হিসাব অনুযায়ী ৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকিতে চলতি অর্থবছর সামাল দেওয়ার কথা ছিল। সেই হিসাবে পেট্রোবাংলা ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমদানি করেছে। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর এলএনজি আমদানি ব্যয় অনেকে বেড়ে গেছে।
জানা গেছে, পেট্রোবাংলা গত মে পর্যন্ত এলএনজি আমদানি করতে অর্থ বিভাগ থেকে ১২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি পেয়েছে। এই জুন পর্যন্ত আরও ৪ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বা লোকসান সামাল দেওয়ার অর্থ দিতে চিঠি দেওয়া হয়েছে অর্থ বিভাগকে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবি জানিয়েছে, দেশের ৮টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বছরে দেড় কোটি থেকে দুই কোটি টন কয়লা ব্যবহৃত হয়। জানুয়ারিতে যে কয়লা প্রতি টন ছিল ৬৫ ডলার সেটি এখন হয়েছে ৮৫ ডলারে। শুধু যুদ্ধের কারণে নয় ইন্দোনেশিয়ার সরকারি নীতির কারণেও এই দাম বেড়েছে। বাংলাদেশ তার চাহিদার সব কয়লা আমদানি করে ইন্দোনেশিয়া থেকে। সেই সঙ্গে বেড়েছে জাহাজ ভাড়া, ইন্স্যুরেন্সসহ বিভিন্ন ব্যয়।
একই ভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলের দামও যুদ্ধের কারণে হু হু করে বেড়েছে। আগে প্রতি টন ফার্নেস অয়েল ছিল ৫৫০ ডলার। এখন সেই তেলের দাম প্রতি টন ৮০০ ডলার। কয়লা এবং ফার্নেস অয়েলের কারণে বাড়তি ব্যয় হবে জুন পর্যন্ত ৩ হাজার কোটি টাকা। এ সব কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় এখন আগের চেয়ে প্রতি ইউনিট ৪৯ পয়সা বেড়েছে বলে পিডিবি জানিয়েছে।
এদিকে, মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফা কামাল বুধবার যুগান্তরকে বলেছেন, আগে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন এলপিজি ছিল ৪০০ থেকে ৫০০ ডলার। এখন হয়েছে ৭৯৯ ডলার। জাহাজ ভাড়াও বেড়েছে। প্রতি টনে ভাড়া আগে ছিল ১০০-১২০ ডলার। এখন ২০০ ডলারও নেওয়া হচ্ছে। এ কারণে এলপিজির বাজারও বেশ অস্থির। এই মাসে কিছুটা দাম কমেছে।