ঢাকাকে মশামুক্ত করার ঘোষণা, নতুন নতুন প্রকল্প, শত শত কোটি টাকা ব্যয়, বিদেশ সফর, ড্রোন প্রযুক্তি থেকে শুরু করে নানা উদ্ভাবনী উদ্যোগ সবই হয়েছে গত আড়াই দশকে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—২৫ বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে মোটেও দমেনি মশা।
একসময় এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগ ছিল রাজধানীকেন্দ্রিক, এখন তা দেশের প্রায় সব জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে লক্ষাধিক মানুষ, মারা যাচ্ছে শত শত মানুষ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্যকর পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক জরিপ, দক্ষ জনবল ও জবাবদিহির অভাবই মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার প্রধান কারণ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০০০ সালে দেশে প্রথম বড় আকারে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ওই বছর পাঁচ হাজার ৫৫১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়। এর পর থেকে কোনো বছরই ডেঙ্গুমুক্ত হতে পারেনি দেশ। রোগীর সংখ্যা কখনো কমেছে, কখনো বেড়েছে; কিন্তু সংক্রমণ থামেনি।
ডেঙ্গুর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বছর ছিল ২০২৩ সাল। সে বছর আক্রান্ত হয় তিন লাখ ১৮ হাজার ৭৩৯ জন এবং মারা যায় এক হাজার ৭০৫ জন।
শুধু ডেঙ্গুই নয়, অন্যান্য মশাবাহিত রোগও দেশের জন্য বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত ১৫ বছরে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে চার লাখ ১৭ হাজার ৪৫০ জন। এতে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে ১০ হাজারের বেশি মানুষ। এ ছাড়া জিকা ভাইরাস ও ফাইলেরিয়ার মতো রোগেও আক্রান্ত হয়েছে শতাধিক মানুষ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে, শুধু ফগিং বা কীটনাশক দিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক জরিপ, দক্ষ জনবল, নিয়মিত মূল্যায়ন, জলবায়ু সংবেদনশীল পরিকল্পনা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ। অন্যথায় ব্যয় বাড়বে, প্রকল্প বাড়বে, কিন্তু মশা ও মশাবাহিত রোগের বিস্তার কমবে না।
মশা নিধন কার্যক্রম কেন ব্যর্থ : বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ব্যর্থতার মূল কারণ চারটি। এক. কোটি কোটি টাকা খরচের পর কাজের ফলাফল যাচাইয়ের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। নেই কোনো মানদণ্ড বা স্বাধীন মূল্যায়ন প্রক্রিয়া।
দুই. দক্ষ জনবলের সংকট। ১২টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে কেবল ঢাকা উত্তরে একজন কীটতত্ত্ববিদ আছেন। সারা দেশে ৩৩টি অনুমোদিত পদের ১৮টিই খালি। তিন. গত দেড় বছরে কোনো জাতীয় এডিস মশা জরিপ হয়নি। ফলে মশার ঘনত্ব বা ঝুঁকির জায়গাগুলো সম্পর্কে না জেনেই চালানো হচ্ছে নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম।
চার. জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। অর্থাৎ তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের ফলে মশার প্রজননক্ষেত্র বিস্তৃত হচ্ছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে, কিন্তু কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে তার কোনো বিশ্লেষণ নেই। কত শতাংশ মশা কমেছে, কোন এলাকায় উন্নতি হয়েছে, তার কোনো তথ্য নেই। তিনি মনে করেন, মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের মূল্যায়ন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হওয়া উচিত।
জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. গোলাম সারোয়ার বলেন, শুধু কীটনাশক ছিটালেই হবে না, সেটি কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। স্প্রে করার সময় গতি, দূরত্ব ও ড্রপ সাইজ ঠিক না থাকলে মশা না মরে বরং কীটনাশকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত এডিস মশা জরিপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গত দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে কার্যত কোনো জাতীয় জরিপ হয়নি।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার (সিডিসি) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের স্পষ্টতা নেই। একই সঙ্গে দক্ষ কীটতাত্ত্বিক জনবল ও আধুনিক গবেষণাগারেরও ঘাটতি রয়েছে। তাঁর মতে, ওয়ার্ডভিত্তিক জরিপ, শক্তিশালী ল্যাব এবং প্রশিক্ষিত কীটতত্ত্ববিদ ছাড়া কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
ডেঙ্গুর বোঝা বড় হচ্ছে : শ্যামলীর ২৫০ শয্যার টিবি হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আয়শা আক্তার দীর্ঘদিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি জানান, ২০১৫ সালের আগে ডেঙ্গু মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক ছিল। এর পর থেকে ধীরে ধীরে ঢাকার বাইরের রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। বর্তমানে মোট আক্রান্ত রোগীর ৬০ শতাংশেরও বেশি ঢাকার বাইরের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত এক লাখ দুই হাজার ৮৬১ জন রোগীর মধ্যে ৬৯ শতাংশই ছিল ঢাকার বাইরের। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৬০ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৬৫ শতাংশ, ২০২২ সালে ৩৭ শতাংশ এবং ২০২১ সালে ছিল ১৬ শতাংশ। অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, নানা সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও গত ২৫ বছরে ঢাকায় এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। ঢাকার বাইরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় ভবিষ্যতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা আরো কঠিন হবে।
বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, অতিবৃষ্টি এবং আর্দ্রতার পরিবর্তনের ফলে মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৭৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে দেশে গড় তাপমাত্রা প্রায় ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। এতে মশার বিস্তৃতি ও রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়েছে। তিনি বলেন, একসময় ডেঙ্গু শহরাঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন তা গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে।
বাজেট বাড়ে, মশাও বাড়ে : ১৯৯৬-৯৭ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাজেট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মশা নিধনে ব্যয় হয়েছে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে রয়েছে মশার ওষুধ কেনা, ওষুধ ছিটানো, ওষুধ দিয়ে ধোঁয়া দেওয়া, মালপত্র পরিবহন, যন্ত্রপাতি ক্রয়, মশা নিয়ন্ত্রণকাজের সঙ্গে যুক্ত থাকা কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা।
২০২১-২২ অর্থবছরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মশা নিয়ন্ত্রণ বাজেট ছিল ৫৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। একই সময় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বাজেট ছিল ২৩ কোটি এক লাখ টাকা। চার বছরের ব্যবধানে ডিএনসিসির বাজেট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৫ কোটি ৫০ লাখ টাকায়, আর ডিএসসিসির বাজেট বেড়ে হয়েছে ৪৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের বিদেশ সফর এবং প্রশিক্ষণের নামে সরকারি অর্থ ব্যয়ের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ‘অপরিহার্য প্রয়োজনে বিদেশে প্রশিক্ষণ নেওয়া যুক্তিসংগত হলেও বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই এসব সফরের যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ।’
তাঁর মতে, প্রশিক্ষণের নামে বিদেশ সফর এখন দক্ষতা উন্নয়নের চেয়ে মূলত ‘সুবিধাভোগের’ হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে; যা কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার পুরনো সংস্কৃতিরই একটি ধারাবাহিকতা।
জনগণের করের টাকা ব্যয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও জবাবদিহির তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, যাঁরা এসব সফরের অনুমোদন দিচ্ছেন এবং যাঁরা এর সুবিধা নিচ্ছেন, উভয় পক্ষকেই জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।
সিটি করপোরেশনের ভাষ্য : ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, শহরের আনাচে-কানাচে এমন অনেক জায়গা আছে, যেখানে সিটি করপোরেশনের পক্ষে ওষুধ পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এটিই মশা নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জনগণের মধ্যে সচেতনতা থাকলেও তাঁরা মশা নির্মূলে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন না।
বিদেশ ভ্রমণসংক্রান্ত বিষয়ে তিনি বলেন, “গত এক বছরে তাঁর বিভাগ থেকে একজন সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা একটি মেশিন ক্রয়ের ‘প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশনে’ বিদেশে গেছেন। যদিও তিনি চেয়েছিলেন একজন মশক সুপারভাইজারকে পাঠাতে, যাতে তিনি সরাসরি ওই মেশিনটি ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারেন।”
তিনি বলেন, কীটনাশক কম্পানিগুলো যখন তাদের খরচে কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের প্রস্তাব দেয়, তখন সেই খরচ মেশিনের মূল দামের সঙ্গেই যোগ করা থাকে (প্রায় ৭০ থেকে ৯০ লাখ টাকা), যা পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রের অর্থের অপচয়। ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন বলেন, তিন ধাপের পরীক্ষায় কার্যকারিতা নিশ্চিত হওয়ার পরই কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে ব্যবহৃত কীটনাশকের বিরুদ্ধে মশার প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।