স্বপ্ন বড়, কিন্তু সক্ষমতা সীমিত। দীর্ঘ ১৯ বছর পর ক্ষমতায় এসে একটি দুর্বল, চাপগ্রস্ত এবং নানা সংকটে জর্জরিত অর্থনীতি পেয়েছে বর্তমান বিএনপি সরকার। এ অবস্থায় আজ সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে দলটি। জানা যায়, বাজেটে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের নানা প্রতিশ্রুতি রয়েছে। কিন্তু রাজস্ব আদায়ের দুর্বল ভিত্তি, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার মধ্যে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি ও ঋণনির্ভর অর্থায়ন নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রথম এই বাজেট উপস্থাপন করবেন।
সরকার বলছে, করের হার নয়, বাড়ানো হচ্ছে আওতা। করদাতার সংখ্যা বাড়ানো, ডিজিটাল নজরদারি জোরদার করা এবং অর্থনীতির আনুষ্ঠানিক খাত সম্প্রসারণকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, ফ্রিল্যান্সারদের জন্য ভ্যাট অব্যাহতি এবং স্টার্টআপের স্বীকৃতি মিলছে। তবে আমদানিনির্ভর পণ্য এবং ডিজিটাল সেবায় কর বাড়ছে। ফলে বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়বে এসব খাত। করব্যবস্থা আরও প্রযুক্তিনির্ভর, তথ্যভিত্তিক এবং বিস্তৃত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে বাস্তবায়নের দক্ষতা, কর প্রশাসনের সক্ষমতা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখার ওপর।
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন যুগান্তরকে বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বাজেটের কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হতে হবে। কারণ, উচ্চ মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় চাপ বহন করে নিম্ন-আয়ের ও মধ্যবিত্ত মানুষ। যদি মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায়, তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফলও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। তিনি বলেন, রাজস্ব আহরণ, মুদ্রানীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয় ছাড়া শুধু বাজেট ঘোষণার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
ব্যয়, আয় ও ঘাটতি : প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে আদায়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এনবিআরবহির্ভূত কর ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং করবহির্ভূত রাজস্ব ৬৬ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ। একদিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি যেমন অন্যতম বড় বাজেট; আবার ঘাটতির দিক থেকেও এটি সবচেয়ে বড়। প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী ব্যাংকব্যবস্থা থেকে প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার কোটি, সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে প্রায় ১৫ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক ঋণ থেকে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। মোট জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীতকরণ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। বাজেটে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়া হবে এবং এ খাতে বরাদ্দ থাকবে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা। যেখানে উচ্চশিক্ষায় গবেষণা খাতে ৫২৯ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকবে।
জানতে চাইলে সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, বাজেটের আকার বড় হলেও পুরো অর্থ ব্যয় করার সক্ষমতা সরকারের আছে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, বছর শেষে উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয়ের একটি অংশ অব্যয়িত থেকে যায়। আবার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যও অনেক সময় পূরণ হয় না। ফলে ঘাটতি অর্থায়নে ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। যেহেতু বড় বাজেট নেওয়া হয়েছে, এখন রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বাড়ানো এবং ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে।
করমুক্ত আয়সীমা বাড়ল : ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা ২৫ হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছে। নতুন আইনে করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন কাঠামো অনুযায়ী, ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত থাকবে। এর পরের ৩ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ, পরবর্তী ৪ লাখ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ এবং এর পরবর্তী ধাপগুলোয় ক্রমান্বয়ে উচ্চহারে কর আরোপ করা হবে।
ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা : এবার ডিজিটাল অর্থনীতির প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন দেখা গেছে। ফ্রিল্যান্সার এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের নির্দিষ্ট সেবা ভ্যাটমুক্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম ফ্রিল্যান্সিং কর্মবাজারে বাংলাদেশের লাখো তরুণ অনলাইনভিত্তিক সেবার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছেন। ফলে এ খাত ভ্যাটের চাপমুক্ত রাখা সরকারের স্মার্ট অর্থনীতির লক্ষ্য বাস্তবায়নে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্টার্টআপ পেল আইনি পরিচয় : অর্থ আইন ২০২৬-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো ‘স্ট্যান্ডার্ড স্টার্টআপ’ সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা। উদ্ভাবনী প্রযুক্তি, নতুন ব্যবসায়িক মডেল, কর্মসংস্থান সৃষ্টি কিংবা নতুন পণ্য উন্নয়নে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যদিও এ মুহূর্তে স্টার্টআপের জন্য বড় কোনো করছাড় ঘোষণা করা হয়নি। তবে নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে বিনিয়োগ, কর সুবিধা ও নীতিগত সহায়তার ভিত্তি তৈরির ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
কর নেটের বাইরে থাকা ব্যবসাকে চিহ্নিত করার উদ্যোগ : অর্থ আইনের অন্যতম বড় বার্তা হলো ব্যবসাকে আরও বেশি আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনা। এখন ব্যবসা পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। ব্যাংক হিসাব খোলা, ঋণ গ্রহণ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট পরিচালনা এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিআইএন প্রয়োজন হবে। রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এর ফলে দীর্ঘদিন করব্যবস্থার বাইরে থাকা বহু ব্যবসা ও লেনদেন শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
কর ফাঁকির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান : অর্থ আইন ২০২৬-এ আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিটের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। নতুন বিধান অনুযায়ী, কর ফাঁকি শনাক্ত করতে তথ্য সংগ্রহ, তদন্ত, তল্লাশি পরিচালনা, নথি জব্দ এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য বিশ্লেষণের সুযোগ আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। সূত্র বলছে, রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে শুধু নতুন কর আরোপ নয়, বিদ্যমান করের যথাযথ বাস্তবায়নই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সেই লক্ষ্যেই তদন্ত ও গোয়েন্দা কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে।
ডিজিটাল হিসাবব্যবস্থার আইনি স্বীকৃতি : ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসাবে ইআরপি (এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং) এবং অনুমোদিত সফটওয়্যারে সংরক্ষিত হিসাবকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাগজনির্ভর হিসাবব্যবস্থার পরিবর্তে প্রযুক্তিনির্ভর হিসাব ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব বাড়বে। একই সঙ্গে কর কর্তৃপক্ষের জন্যও তথ্য যাচাই ও নিরীক্ষা সহজ হবে।
বিদেশি ডিজিটাল সেবায় ১৫ শতাংশ ভ্যাট : প্রস্তাবিত বাজেটে বিদেশ থেকে আমদানি করা বিভিন্ন ডিজিটাল সেবায় ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এর আওতায় ক্লাউড কম্পিউটিং, সফটওয়্যার সাবস্ক্রিপশন, অনলাইন ডেটা সেবা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং অন্যান্য প্রযুক্তিভিত্তিক সেবা অন্তর্ভুক্ত হবে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতে প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় বাড়বে। বিশেষ করে সফটওয়্যার, ডেটা সেন্টার এবং ক্লাউডভিত্তিক সেবা ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত ব্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
আমদানিনির্ভর পণ্যে বাড়তি কর : রাজস্ব আহরণের আরেকটি বড় উৎস হিসাবে আমদানিকৃত বিভিন্ন পণ্যের ওপর সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। আমদানি করা আম, আপেল, আঙ্গুরসহ বিভিন্ন ফলের ওপর ৩০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে চকলেট, বিস্কুট, ওয়েফার, আলুর চিপস এবং অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের ওপরও উচ্চহারে কর নির্ধারণ করা হয়েছে।
তামাক ও কোমল পানীয় খাতে উচ্চকর অব্যাহত : জনস্বাস্থ্য ও রাজস্ব-উভয় বিবেচনায় তামাকজাত পণ্য, কোমল পানীয় এবং মদ্যপণ্যের ওপর উচ্চ করহার বহাল রাখা হয়েছে। কোমল পানীয়র ওপর ১০০, বিয়ারে ২৫০ এবং বিভিন্ন ধরনের মদের ওপর ৩৫০ শতাংশ পর্যন্ত সম্পূরক শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। সিগারেট, নিকোটিন পাউচ এবং অন্যান্য তামাকজাত পণ্যের ক্ষেত্রেও উচ্চকর আরোপ অব্যাহত রাখা হয়েছে।
বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য নতুন করনীতি : ইলেকট্রিক যানবাহনের জন্য পৃথক মূল্যভিত্তিক কর কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। কম মূল্যের বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে করহার কম রাখা হলেও উচ্চমূল্যের গাড়ির ক্ষেত্রে কর উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। এতে একদিকে পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ব্যবহার উৎসাহিত হবে, অন্যদিকে বিলাসী শ্রেণির উচ্চমূল্যের গাড়ি থেকে বাড়তি রাজস্ব আদায়ের সুযোগ তৈরি হবে।