জীবনযাত্রার ব্যয়ে লাগাম টানার চেষ্টা থাকছে আগামী বাজেটে। সাধারণ জনগণকে স্বস্তি দিতে ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে করছাড় দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসা খরচ কমাতে ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা, হার্টের রিং ও চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্স আমদানিতে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। এতে প্রতিমাসের ওষুধ খরচা সাশ্রয় হবে।
সূত্র জানায়, প্রতিবছর বাজেটে রাজস্ব আদায় বাড়াতে পণ্য ও সেবার করহার বাড়ানো হয়। এবারই তার ব্যতিক্রম। নতুন সরকার চাইছে করহার না বাড়িয়ে করজাল বাড়াতে। একই সঙ্গে জনগণকে স্বস্তি দিয়ে কর আদায় করতে। তাই ব্যাপক হারে ভ্যাট-ট্যাক্সে ছাড় দেওয়া হচ্ছে, যা বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করবেন।
খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিকাজে ব্যবহৃত জিংক সালফেট, ম্যাগনেশিয়াম সালফেটসহ পাঁচটি সারের ব্যবসা পর্যায়ে ভ্যাট সাড়ে ৭ শতাংশ থেকে প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এ কারণে সারের দাম কমতে পারে। কীটনাশক-বালাইনাশকের শুল্ককর প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এছাড়া মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যে করছাড় দেওয়া হচ্ছে। যেমন-ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, বীজসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ, ১ শতাংশ থেকে হ্রাস করে দশমিক ৫ শতাংশ করা হচ্ছে। এর ফলে বিগত বছরগুলোতে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে জনজীবনে যে নাভিশ্বাস উঠেছিল, তা থেকে কিছুটা হলেও স্বস্তি মিলবে।
দেশে স্বাস্থ্যসেবা খরচ অনেক বেশি-এ বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পেরে প্রস্তাবিত বাজেটে ওষুধ আমদানির উপকরণ, হার্টের রিং, কিডনি ডায়ালাইসিসের উপকরণ আমদানিতে শুল্ককর ছাড় দেওয়া হচ্ছে। এতে চিকিৎসার পেছনে জনগণের খরচ কমবে। হার্টের রিং এবং চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্স সরবরাহের ক্ষেত্রে জোগানদার পর্যায়ে ১০ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে প্রতিটি হার্টের রিং বা স্টেন্টের মূল্য প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে। চোখের প্রতিটি ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের মূল্য প্রায় ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। কিডনি রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহার্য ব্লাড টিউব সেট আমদানিতে আগাম কর প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এর ফলে কিডনি ডায়ালাইসিসের খরচ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পাবে। ক্যানসারের ওষুধ তৈরির নয়টি উপকরণ আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এছাড়া অন্য ওষুধ তৈরির নতুন ৬৮টি মৌলিক কাঁচামাল আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এতে বাজারে ওইসব ওষুধের দাম কমবে।
সাধারণ মানুষের সংসার খরচ কমাতে বাজেটে আমদানি করা শিশুখাদ্য প্রস্তুত সামগ্রীর আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ করা হচ্ছে। এতে দেশের বাজারে শিশুখাদ্যের দাম কমবে। রান্নার প্রধান উপকরণ মসলার ওপর ৫ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এতে এলাচ, দারুচিনিসহ সব ধরনের মসলার দাম কমতে পারে। সিমকার্ড ও ই-সিমকার্ড সেবার বিপরীতে ৩০০ টাকা সুনির্দিষ্ট কর ছিল। এর পরিবর্তে বাজেটে সিমকার্ডের দামের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এতে সিমের দাম কমতে পারে। স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন উৎপাদনে প্রয়োজনীয় ২২টি উপকরণের অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে এক শতাংশ করা হচ্ছে। এতে দেশে তৈরি মোবাইলের দাম কমতে পারে। স্বর্ণালংকার বিক্রিতে ৫ শতাংশ ভ্যাট ছিল, যা স্বর্ণালংকারের বিক্রীত মূল্যের ওপর আদায় করা হতো। বাজেটে ৫ শতাংশের পরিবর্তে ভরিপ্রতি আড়াই হাজার টাকা সুনির্দিষ্ট কর বসানো হয়েছে। এতে স্বর্ণালংকারের দাম কমবে।
দেশে উৎপাদিত ফ্রিজ-রেফ্রিজারেটর উৎপাদনে ১৫ শতাংশ ভ্যাট রয়েছে। এটি কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হচ্ছে। এতে বাজারে দেশি ফ্রিজের দাম কমতে পারে। কম্পিউটার প্রিন্টার আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর ছিল। ভ্যাট প্রত্যাহার এবং অগ্রিম আয়কর ২ শতাংশ নির্ধারণ করায় বাজারে প্রিন্টারের দাম কমতে পারে। ৩০ ইঞ্চি পর্যন্ত কম্পিউটার মনিটর আমদানিতে ভ্যাট প্রত্যাহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করা হচ্ছে। এতে বাজারে মনিটরের দাম কমতে পারে। মোবাইল বা কম্পিউটারে ব্যবহৃত মেমোরি কার্ড আমদানিতে ভ্যাট প্রত্যাহার করায় আগামীতে এ পণ্যটির দাম কমতে পারে।
পরিবেশ সুরক্ষার দিকেও নজর থাকছে আগামী বাজেটে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহিত করতে করছাড় দেওয়া হচ্ছে। সোলার প্যানেল ও ব্যাটারি উৎপাদনে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতির গাড়ি (ইভি) আমদানিতে বর্তমানে ৯৩ শতাংশ শুল্ককর রয়েছে। এটি কমিয়ে ২৫ হাজার ডলার মূল্যের গাড়ির জন্য ৬৪ শতাংশ এবং ৫০ হাজার ডলার মূল্য পর্যন্ত গাড়ির শুল্ককর ৮০ শতাংশ নির্ধারণ করা হচ্ছে। এতে বাজারে ইলেকট্রিক গাড়ির দাম কমতে পারে। এছাড়া ১৮০০ সিসি প্লাগ ইন হাইব্রিড গাড়ির শুল্ক ৯৩.১৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭৩.৪৩ শতাংশ এবং ২০০০ সিসির গাড়ির করভার ১৩২.৩৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯৬.১০ শতাংশ করা হচ্ছে। এতে প্লাগ ইন হাইব্রিড গাড়ির দাম কমতে পারে। পক্ষান্তরে বাড়ানো হচ্ছে তেলে চালিত গাড়ির শুল্ক।
এছাড়া বাজেটে শুল্কহার কমানোতে দাম কমতে পারে-কফি, হার্টের রিং; কিডনি ডায়ালাইসিস খরচ; দেশের উৎপাদিত ত্বক ফর্সাকারী প্রসাধনী সামগ্রী; সানস্ক্রিন বা স্যানট্যাগ সামগ্রী; হাত, নখ বা পায়ের প্রসাধনী সামগ্রী; পাউডার; লিপস্টিক; আইলাইনার; ইলেকট্রিক চার্জার; গার্মেন্টের ঝুট; ইলেকট্রিক কুকার; ইন্ডাকশন কুকার; ইনফ্রারেড কুকার; ওয়াটার পিউরিফায়ার; ওয়াটার হিটার/গিজার, পিয়ানো, ফ্লোট গ্লাস।