২০২৬-২৭ অর্থবছরের বিশাল বাজেটের কর্মযজ্ঞ চলছে। আগামী বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠিত সরকারের প্রথম বাজেট। এ বাজেটে রাজস্ব আয়ের বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যেও জনজীবন সহনীয় করা এবং শিল্পের বিকাশে জোর দিচ্ছে সরকার। যার প্রতিফলন মিলছে বাজেট প্রস্তাবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নানা শর্তের বেড়াজালের মধ্যে কর রেয়াত বাতিলের পরিবর্তে শিল্পের বিকাশে কর অবকাশ সুবিধা অব্যাহত রাখছে। আর কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় উৎপাদন উৎসাহিত করতে নতুন নতুন খাতে দেওয়া হচ্ছে কর রেয়াত। এ ছাড়া উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে জনসাধারণের জীবনযাত্রার ব্যয়নির্বাহের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে হচ্ছে না করারোপ। উল্টো নিত্যপণ্যের উৎসে কর কমিয়ে সাধারণ মানুষের মনে জায়গা করে নিতে চায় সরকার। জনতুষ্টির এ বাজেটে বিশাল আয়ের চ্যালেঞ্জের মধ্যে কর ছাড়ে মনোযোগী সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় রাখতে চাল, গম, আলু, মসলাসহ ৬০টি নিত্যপণ্যে থাকা উৎসে কর কমিয়ে দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব থাকছে। এ ছাড়া নিত্যপণ্যের ক্ষেত্রে থাকছে না রেগুলেটরি ডিউটিও। সেইসঙ্গে শিল্পের বিকাশে কাঁচামাল আমদানিতে থাকা উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব করা হতে পারে আগামী বাজেটে। এ ছাড়া সাধারণ মানুষকে করের বোঝা থেকে মুক্তি দিতে করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হচ্ছে। যদিও চলতি অর্থবছরের বাজেটে এটা ঘোষিত ছিল। তবে পরের অর্থবছরের এ করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা করার ঘোষণা আসছে বাজেটে। এ ছাড়া আয়করের ৫ শতাংশের স্তরটি বাতিল করা হচ্ছে। আর শিল্পের খরচ না বাড়াতে অপরিবর্তিত থাকছে সব খাতে করপোরেট করহার। আর বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ বাড়াতে সব ধরনের ফ্রিল্যান্সিংয়ের আয়ে কর অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া কনটেন্ট ক্রিয়েশন থেকে আয় করমুক্ত রাখার প্রস্তাব করতে পারেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেটে সরকার নতুন করে করারোপের বিষয়ে শিথিলতা অবলম্বন করছে। এ ছাড়া আগামী অর্থবছরের বাজেটে জনজীবনে বিরূপ প্রভাব পড়ে এমন কিছু করা যাবে না বলে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে অর্থমন্ত্রী এবং সরকারপ্রধানের। যার কারণে কিছু কিছু খাতের সানসেট ক্লজ বা কর রেয়াতের প্রজ্ঞাপনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বাড়ানো হচ্ছে। বিশেষ করে আগামীর সঙ্গে তাল মেলাতে দেশীয় বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদন এবং আমদানিতে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ সুবিধা। আর বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ বাড়াতে ফ্রিল্যান্সিংয়ের আয় করা হচ্ছে করমুক্ত। শিল্পের বিকাশে নতুন নতুন খাতে কর রেয়াত দেওয়ার প্রস্তাব করা হতে পারে বলেও জানান এ কর্মকর্তা।
সূত্র আরও জানায়, আগামী বাজেটে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ২০৩৫ সাল পর্যন্ত করমুক্ত রাখার প্রস্তাব করা হতে পারে। এ ছাড়া ব্যবহারকারীদের বিল পরিশোধে থাকছে ৫ শতাংশ রেয়াত সুবিধা। আর সৌরবিদ্যুতের উপকরণ আমদানি ২০৩১ সাল পর্যন্ত করমুক্ত রাখার প্রস্তাব করতে পারেন অর্থমন্ত্রী। দেশে পরিবেশবান্ধব গাড়ি ব্যবহার উৎসাহিত করতে ইলেকট্রিক গাড়ির রেজিস্ট্রেশনে আগাম আয়কর ২ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা করা হচ্ছে। এর বাইরে কর রেয়াত সুবিধা পাচ্ছে স্থানীয়ভাবে ইলেকট্রিক গাড়ি ও ই-বাইক উৎপাদনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। আর এসব গাড়ি ব্যবহার সহজ করতে ইলেকট্রিক বাস, ট্রাক এবং চার্জিং স্টেশন আমদানিতে থাকা ৫ শতাংশের উৎসে কর প্রত্যাহার। বাজেটে জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে থাকা ৫ শতাংশ আগাম কর প্রত্যাহার করা হচ্ছে। সেইসঙ্গে স্বর্ণ ও অলংকার সরবরাহে ৫ শতাংশের উৎসে কর কমিয়ে দশমিক ৫ শতাংশ করা হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন উৎপাদনে ২২টি কাঁচামালে থাকা উৎসে কর কমে হচ্ছে ১ শতাংশ। সেইসঙ্গে মোবাইল ফোন উৎপাদনে ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স (ভ্যাট) অব্যাহতির মেয়াদ বাড়ছে ২০৩০ সাল পর্যন্ত। সেইসঙ্গে বাতিল হচ্ছে মোবাইল সিমের ওপর থাকা ৩০০ টাকা কর। এ ছাড়া রপ্তানি আয়ে নগদ প্রণোদনার ওপর থাকা ১০ শতাংশের উৎসে কর কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হচ্ছে আগামী বাজেটে। দেশীয় শিল্প বিকাশে টিভি, ফ্রিজ ও কম্পিউটার সামগ্রী উৎপাদনের ক্ষেত্রে কর অব্যাহতি সুবিধা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ওষুধ তৈরির ৬৮টি কাঁচামাল আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করতে পারেন অর্থমন্ত্রী। সেইসঙ্গে ক্যানসারের ওষুধ তৈরির ৯টি কাঁচামাল আমদানিতে থাকতে পারে কর রেয়াত সুবিধা। রেগুলেটরি শুল্কহার ৯ স্তর থেকে কমিয়ে ছয় স্তর করা হচ্ছে। আর সিনথেটিক ওভেন ফেব্রিক্স আমদানিতে থাকা ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করা হতে পারে। আর ফ্লোট গ্লাস উৎপাদনে ৫টি কাঁচামাল আমদানিতে থাকা ২৫ শতাংশ শুল্ক কমে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হতে পারে বাজেটে। সব ধরনের কার্ড তৈরির কাঁচামালে থাকা ৫ শতাংশের আগাম কর প্রত্যাহার হচ্ছে। এসএমই উদ্যেক্তাদের জন্য ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার কর দিতে হবে না। সেইসঙ্গে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার ট্যাক্স করমুক্ত করা হচ্ছে। সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র আমদানিতে থাকা ৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব করতে পারেন অর্থমন্ত্রী। এ ছাড়া কৃষকের খরচ কমাতে সার ও কীটনাশকে থাকা সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট এবং কর বাতিলের প্রস্তাব করা হতে পারে আগামী বাজেটে। হার্টের রিং এবং চোখের লেন্সের ওপর থাকা ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করতে পারেন অর্থমন্ত্রী।