দেড় দশকের ব্যবধানে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে বাংলাদেশ পুলিশের সদস্য সংখ্যা। করা হয়েছে নতুন ছয়টি ইউনিট।
কিন্তু সে তুলনায় বাড়ানো হয়নি আবাসন, যানবাহনসহ অন্যান্য সুবিধা। বর্তমানে আড়াই লাখ সদস্যের পুলিশ বাহিনীর মধ্যে আবাসন সুবিধা পান কেবল ১০ শতাংশের মতো। বাকি ৯০ শতাংশ পুলিশ সদস্যকেই বাসস্থানের মৌলিক চাহিদা মেটাতে হয় ভাড়া বাসায় থেকে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবাসনসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা তৈরি না করেই সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর ফলে একদিকে যেমন বাহিনীর ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে নৈতিকতার চর্চাও কঠিন হয়ে পড়েছে। মূলত নিয়োগ কার্যক্রমকে ঘিরে রাজনৈতিক নেতাদের বিত্তবান হয়ে ওঠার কৌশল হিসেবেই পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না বাড়িয়ে পুলিশে পদ সৃজন করা হয় বলে মনে করেন তারা।
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০১০ সালে বাংলাদেশ পুলিশের সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার। বর্তমানে এ সংখ্যা পৌঁছেছে আড়াই লাখে। দেড় দশকের ব্যবধানে বাংলাদেশ পুলিশের সদস্য সংখ্যা বেড়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার। এ সময়ের মধ্যে বাহিনীটির নতুন ইউনিট সৃষ্টি করা হয়েছে ছয়টি—পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), ট্যুরিস্ট পুলিশ, নৌ-পুলিশ, অ্যান্টি-টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ), বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এবং ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি)।
পুলিশে বর্তমানে সব মিলিয়ে কনস্টেবল রয়েছেন ১ লাখ ৭৩ হাজারের মতো। তারা মূলত সরাসরি মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে কেউ কেউ থানায় যুক্ত থাকেন, কেউ আবার থাকেন রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে। বর্তমানে বাহিনীর মোট সদস্যের মধ্যে ১০ শতাংশের মতো আবাসন সুবিধা পান। বাকিরা থাকেন নিজ নিজ ব্যবস্থাপনায়।
পুলিশ সদস্যরা জানান, রাজধানীতে পুলিশের আবাসনের মধ্যে রয়েছে—মিরপুর স্টাফ কোয়ার্টার, তিনতলা অফিসার্স কোয়ার্টার্স, সৈনিক ব্যারাক, অফিসার্স মেস, ইস্কাটনে পুলিশ অফিসার্স মেস, ডেমরা পুলিশ অফিসার্স কোয়ার্টার্স ও নীলক্ষেতে ১৫ তলা একটি অফিসার্স কোয়ার্টার। নীলক্ষেতের ভবনটিতে ৬০০ বর্গফুটের বাসায় পরিদর্শক ও উপপরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তারা থাকেন। উত্তরা এলাকায় এসপিবিএনসহ আরো কয়েকটি ইউনিটের জন্য বেশ কয়েকটি কোয়ার্টার করা হয়েছে। এছাড়া পুরনো রমনা থানা ভবনের পাশে রয়েছে পাঁচতলা একটি অফিসার্স কোয়ার্টার। রাজারবাগে আছে সাতটি ব্যারাক। এসব ব্যারাকে পরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তাসহ কনস্টেবলরাও থাকেন। রাজারবাগ হাসপাতালের পাশে আছে ‘মধুমিতা’ নামে ১৬ তলা একটি অফিসার্স কোয়ার্টার। সেটা বাড়িয়ে এখন ২০ তলা করা হচ্ছে। ভবনটির সব ফ্ল্যাট ১ হাজার ১০০ বর্গফুটের। তার পাশেই ‘তিতাস’ নামে পাঁচতলা একটি অফিসার্স কোয়ার্টার রয়েছে। সেটাও অফিসারদের জন্য বরাদ্দ। এছাড়া রাজারবাগে পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা নামে আরো তিনটি চার-পাঁচ তলাবিশিষ্ট অফিসার্স কোয়ার্টার রয়েছে।
ব্যারাকে থাকা পুলিশ সদস্যরা নাম না প্রকাশের শর্তে অভিযোগ করেন, তাদের জন্য রয়েছে সীমিত পরিসরের আবাসন, সেটাও স্বাস্থ্যকর না। ৩০ হাজার সদস্যের ব্যবস্থায় থাকতে হচ্ছে দ্বিগুণের বেশি। ডিএমপির প্রটেকশন অ্যান্ড প্রটোকল বিভাগের সদস্যদের আবাসনের জন্য ভবন বরাদ্দ দেয়া আছে দুটি, যেখানে থাকতে পারেন ১ হাজার ৫১ জন। যদিও সেখানে বসবাস করতে হচ্ছে প্রটেকশন বিভাগের ২ হাজার ১২২ জনকে। এর বাইরে পুলিশ সদর দপ্তরের কিছু সদস্যও সেখানে বসবাস করছেন। ব্যারাক ভবন দুটিতে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি পুলিশ সদস্য। আবার স্থান সংকুলান না হওয়ায় সিঁড়ির নিচে বিছানা পেতে থাকতে হয়। সেখানেও জায়গা না পেলে অনেককে ভবনের বাইরে খোলা আকাশের নিচে তাঁবু টাঙিয়ে অবস্থান করতে হচ্ছে।
সরজমিনে গত শনিবার ডিএমপির প্রটেকশন ব্যারাক ঘুরে দেখা যায়, প্রটেকশন বিভাগের ১ নম্বর ভবনের নিচতলায় সিঁড়ির নিচে চৌকির বিছানা পাতা। বিভিন্ন ধরনের কাপড় দিয়ে তৈরি এসব বিছানায় বিশ্রাম নিচ্ছেন ডিউটি থেকে ফেরা পুলিশ সদস্যরা। দ্বিতীয় তলার সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠতেই দেখা যায়, ব্যারাক ভবনের বারান্দায় করা রয়েছে অন্তত ১০০ পুলিশ সদস্যের থাকার ব্যবস্থা। ব্যারাকের রুমগুলোর পরিস্থিতি আরো শোচনীয়। রীতিমতো গায়ে গা লাগিয়ে অবস্থান করছেন পুলিশ সদস্যরা। আর যেসব সদস্যের ব্যারাক ভবনের ঘর, বারান্দা বা সিঁড়ির তলায় ঠাঁই হয়নি; তাদের বসবাসের জন্য ভবনের বাইরে টানানো রয়েছে তিনটি তাঁবু। সেগুলোর মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় আবার পড়ে আছে নানা ধরনের আবর্জনা।
পুলিশের কাছ থেকে ভালো সেবা পেতে হলে সবার আগে তাদের স্বাস্থ্যকর আবাসনসহ মৌলিক সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম সোহাগ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ডিউটির পর ভালো বিশ্রাম না পেলে তার প্রভাব পুলিশের কাজের ওপর আসে। এজন্যই সবার আগে পুলিশের এ সেবাগুলো নিশ্চিত করতে হবে। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা না করে লোকবল বাড়ালে বাহিনীতে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। আবার থানাগুলোয় যানবাহন সংকটের কারণে টহল দিতে পারে না পুলিশ। এ সুযোগে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে।’
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণভাবে একটি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য জনপ্রতি ১০০-৪০০ বর্গফুট জায়গা প্রয়োজন। ক্ষেত্রবিশেষে তা কিছু কমবেশি হতে পারে। তবে তা কোনো অবস্থায়ই ৭০ বর্গফুটের কম নয়। কেননা অনেক বেশি মানুষ কম জায়গায় গাদাগাদি করে থাকলে নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে কোনো স্থানে জনঘনত্ব বেশি হয়ে পড়লে তা ছোঁয়াচে ও দ্রুত সংক্রমণশীল রোগের বিস্তার ঘটানোর জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। পাশাপাশি দীর্ঘ ডিউটির পর গাদাগাদি করে থাকার ফলে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে নানা ধরনের মানসিক অবসাদ দেখা দেয়ারও ঝুঁকি থাকে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কোনো স্থানে ধারণক্ষমতার বেশি মানুষ থাকলে ঘরের ভেতরকার পরিবেশ বিঘ্নিত হয়। অক্সিজেনের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকে না, যার প্রভাব শরীরের ওপর পড়ে। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যও বিঘ্নিত হয়। এছাড়া নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকলে স্ক্যাবিস ও ইউরিনারি ইনফেকশনের মতো রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা বেশি থাকে।’
একজন ব্যক্তির কাজের জায়গাটির পাশাপাশি বসবাসের স্থানও স্বাস্থ্যকর হওয়া জরুরি বলে উল্লেখ করেন এ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ‘কোনো একজন কর্মী যখন থাকার জায়গা থেকেই বিরক্তি নিয়ে আসবে, সেটার প্রভাব তার কাজেও পড়বে। শুধু অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকার কারণে তার সুরক্ষা দেয়ার কাজটিও বিঘ্নিত হবে।’
পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা তৈরি না করেই পুলিশে নিয়োগ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া রাজনৈতিক নেতাদের বিত্তবান হয়ে ওঠার কৌশল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, গত ১৬ বছরে পুলিশে দফায় দফায় নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। কোনো কোনো বছরে দুবারও নিয়োগ দেয়া হয়। ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই বাহিনীর সদস্য সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু সে অনুযায়ী আবাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষার মতো মৌলিক সুবিধাগুলো তৈরি করা হয়নি। আবার পুলিশের দক্ষতাও বাড়ানো হয়নি। যানবাহন সংকটে টহল কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে না অনেক থানা পুলিশ। অথচ তাদের লোকবলের ঘাটতি নেই। ফলে আড়াই লাখ সদস্যের পুলিশ বাহিনী থাকলেও সেবা কার্যক্রম আগের মতোই সীমিত রয়ে গেছে।
পুলিশের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি আবাসনসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ইচ্ছামতো পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। সোয়া লাখ থেকে বর্তমানে আড়াই লাখ সদস্য এ বাহিনীতে। আবার নতুন নতুন ইউনিটও তৈরি করা হয়। সে তুলনায় তাদের আবাসন ব্যবস্থা করা হয়নি। এজন্য দেখবেন অনেকেই ঢাকায় থাকতে চান না। আবাসন ব্যবস্থা নেই। অতিরিক্ত খরচ। যাদের পরিবার আছে, তাদের জন্য খুবই সমস্যা। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে নৈতিক চর্চা প্রতিফলন হওয়া খুবই কঠিন। পুলিশের কাছ থেকে নৈতিক ও পেশাদার সেবা পেতে হলে অবশ্যই তাদের আবাসন সংখ্যা বাড়াতে হবে। তা না হলে এটা বাহিনীর ভারসাম্যের জন্যও ক্ষতিকর হবে।’
পুলিশের আবাসন সংকট দূর করতে বেশকিছু পরিকল্পনা নেয়ার কথা জানিয়েছেন পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন। এ বিষয়ে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পুলিশের আবাসন সংকট দীর্ঘদিনের। এ সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে। এরই মধ্যে বেশকিছু পরিকল্পনাও নেয়া হয়েছে। সরকারও পুলিশের আবাসন সংকট নিরসনে আন্তরিক।’