আলী হোসেন এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ। শরীর আর চলে না। ৮৩ বছরের জীবনের ৬৬ বছরই কবর খুঁড়েছেন। প্রায় পাঁচ হাজার কবর খুঁড়েছেন তিনি।
কবর খোঁড়ার কাজে কখনো কারও কাছ থেকে টাকাপয়সা নেননি। পেশায় গাছ কাটার শ্রমিক ছিলেন। পাশাপাশি কবর খুঁড়েছেন সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে। আট বছর বয়স থেকেই ঘটনাক্রমে কবর খোঁড়া শুরু তার। চার-পাঁচ বছর ধরে কবর খুঁড়তে পারছেন না শারীরিক অক্ষমতার কারণে। এখন শুয়ে-বসেই দিন কাটান আর ভাবেন নিজের কবর নিয়ে। তবে অক্ষম হলেও এখনো প্রতিবেশীদের কবর খোঁড়ার সময় পাশে গিয়ে দাঁড়ান, নির্দেশনা দেন।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দত্তপাড়া ইউনিয়নের পশ্চিম বটতলী গ্রামের প্রয়াত ছেরাজল হকের ছেলে আলী হোসেন। চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন তিনি।
কবর খোঁড়া শুরুর স্মৃতিচারণ করলেন আলী হোসেন, ‘১৯৫৫ সালে বাংলা আশ্বিন মাসের একরাতে এশার ওয়াক্তে পাশের বাড়ির হাশমত উল্যার বাবা হাবিব উল্যা মারা যান। হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল, কেউ কবর খোঁড়ার জন্য রাজি হচ্ছিল না। অনেকেই ভয় পাচ্ছিল। তখন আমি ক্লাস ওয়ানে পড়ি। বয়স সাত-আট বছর। মাথায় চিন্তা এলো— আমি কী করতে পারি? বাড়ির এক ভাতিজা নুর হোসেনকে নিয়ে কবর খুঁড়তে চলে গেলাম। সে আমাকে খুন্তি, কোদাল, ওড়া (টুকরি) এগিয়ে দিয়েছিল। রাত ১২টা থেকে ১টার মধ্যে কবর খোঁড়া শেষ হয়। সেই থেকে ৬৬ বছরে অন্তত পাঁচ হাজার কবর খুঁড়েছি।’
আলী হোসেনকে কবর খুঁড়তে যেখানে ডাকা হয়েছে, ছুটে গেছেন সেখানেই। তিনি কবর খুঁড়েছেন সদর উপজেলার বশিকপুর, উত্তর জয়পুর, রাজাপুর, লক্ষ্মীপুর পৌর শহর, রামগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায়।
১২ থেকে ১৪ বছর আগে কবর খোঁড়ার কাজে তিনি দুজন সহযোগী নেন। এর মধ্যে মহিন উদ্দিন তার ছেলে।
‘এখন আর কবর খোঁড়ার শক্তি-সামর্থ্য নেই। চার-পাঁচ বছর আগে স্ট্রোক করি। এরপর অসুস্থতার কারণে এ কাজ থেকে অবসর নিয়েছি। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে এ কাজ করেছি। তবে আমার দুই সহযোগীকে মৃতের স্বজনরা কিছু টাকা দিতেন’— বললেন আলী হোসেন।
তার বড় ছেলে মো. শাহাব উদ্দিন জানালেন, ‘পরিবার থেকে আমরা বাবাকে সবসময় উৎসাহ দিয়ে এসেছি। খবর পেলে গভীর রাতেও তিনি কবর খোঁড়ার জন্য বের হয়ে যেতেন। এখন ওনার বয়স বেড়েছে। এজন্য এ কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন।’
দত্তপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মামুনুর রশিদ বললেন, ‘আলী হোসেন আমার প্রতিবেশী। ছোটবেলা থেকেই দেখেছি এলাকার কেউ মারা গেলে তিনি কবর খুঁড়েছেন। বছর তিনেক আগে আমার বাবা মারা যান। বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি আমার বাবার কবরটি খুঁড়তে পারেননি। তবে যারা খুঁড়েছেন, কবরস্থানে গিয়ে তাদের সহযোগিতা করেছেন। এ কাজে তিনি কখনো এক পয়সা কারও কাছ থেকে নেননি।’