ভারতের অবৈধ পুশইন চেষ্টাকে কেন্দ্র করে চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের সীমান্ত এলাকাগুলো, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে। দুই দেশের মধ্যে অবৈধ নাগরিক ফেরত পাঠানোর আইনি প্রক্রিয়া বিদ্যমান থাকলেও, তা পাশ কাটিয়ে জোরপূর্বক পুশইনের চেষ্টা চালাচ্ছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)।
ভারতের এমন আগ্রাসী আচরণের প্রতিবাদে এবং প্রচলিত নিয়ম মানতে এরই মধ্যে দিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এক ডজনেরও বেশি চিঠি দিয়েছে ঢাকা। দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি জানিয়েছে, পুশইন ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি সীমান্তে টহল ও নজরদারি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে।
সোমবার মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পুশইনের কথা শোনা যাচ্ছে। বিজিবি কোনো পুশইন করতে দিচ্ছে না। সরকার পুশইন অ্যালাউ (মেনে নেওয়া) করছে না। কারণ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অবৈধ নাগরিক ফেরত আনার একটি ম্যাকানিজম (আইনি প্রক্রিয়া) বিদ্যমান আছে। ভারতকে এ ম্যাকানিজম ফলো করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, এরই মধ্যে পুশইন নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ১২ থেকে ১৩টি চিঠি দিয়েছে ঢাকা। বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে পুশইন বন্ধে দিল্লিকে গুরুত্ব দিতে হবে। অবৈধ নাগরিকদের নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাইয়ে আইনি প্রক্রিয়া মানতে ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, পুশইন বন্ধে দিল্লি কার্যকর ব্যবস্থা নেবে বলে আশা করে ঢাকা। পুশইনের মতো ঘটনা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে পারে।
বাংলাদেশের এমন অবস্থানের পরও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ ধারাবাহিকভাবে সীমান্তে একের পর এক পুশইনের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। গেল এক সপ্তাহে দেশের ১৩ জেলার অর্ধশত স্থান দিয়ে প্রায় ৫ শতাধিক মানুষকে পুশইনের চেষ্টা করেছে তারা। যা নিয়ে ক্ষুব্ধ দেশের সীমান্ত অঞ্চলের মানুষ। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়ন নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তারা। তাদের দাবি-ক্রমাগত পুশইন চেষ্টায় সীমান্তে তৈরি হবে অস্থিরতা। লঙ্ঘন হবে মানবাধিকার।
বিজিবি জানিয়েছে, তারা অবৈধ পুশইন শক্ত হাতে দমন করছে। বাহিনীর পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে সতর্ক অবস্থান। বৃদ্ধি করা হয়েছে টহলকার্যক্রম। তাদের এসব কাজে সহযোগিতা করছেন সীমান্ত অঞ্চলের মানুষ।
এদিকে রোববার বিজেপির একটি প্রশিক্ষণ শিবির উপলক্ষ্যে আয়োজিত প্রস্তুতি সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, রাজ্যের বিভিন্ন সীমান্ত জেলার অস্থায়ী নিবাসকেন্দ্র থেকে এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৮০০ অবৈধ অভিবাসীকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এছাড়া আরও ৮৩৬ জনকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
সীমান্ত নিরাপত্তা ও অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধকে তার সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের আওতায় না থাকা অবৈধ অভিবাসীদের কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সরাসরি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। অতীতে এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি। ফলে বহু অবৈধ অভিবাসী দীর্ঘ সময় বিভিন্ন সরকারি কেন্দ্রে অবস্থান করেছে।
যদিও শুভেন্দু অধিকারীর এমন তথ্য মানতে নারাজ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি। তাদের দাবি, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত দেশের সীমান্ত দিয়ে একজনও পুশইন করাতে পারেনি বিএসএফ। তবে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় প্রায় দুই হাজার ৩০০ জনকে পুশইন করে তারা। এর মধ্যে ১২৬ জন ছিল ভারতীয় নাগরিক। আর ৪০-৫০ জন রোহিঙ্গা। বাকি দুই হাজার ১২৪ জন বাংলাদেশি। পুশইনের পর ১২৬ জন ভারতীয় নাগরিককে যথাযথ প্রক্রিয়া ও আইনের মাধ্যমে ফেরত পাঠিয়েছে বিজিবি।
বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আমাদের (বিজিবি) কাজ হচ্ছে কেউ যদি সীমান্ত দিয়ে আসে, তাহলে আমরা তাদের গ্রেফতার করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পুলিশের হাতে সপর্দ করি। পুলিশ এসব মানুষের পাসপোর্ট, এনআইডি বা জাতীয় সনদ আছে কিনা তা যাচাই-বাছাই করে। যদি তাদের জাতীয় সনদ না থাকে তাহলে তারা আমাদের কাছে আবার ফেরত দিয়ে দেয়। তখন আমরা যথাযথ আইন মেনে তাদের ভারতে ফেরত পাঠিয়ে দিই। কিন্তু তারা যদি বাংলাদেশের নাগরিক হয়, তাহলে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পুলিশ।