Image description

বাংলাদেশে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, যৌন নির্যাতন ও মানসিক নিপীড়নের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে উল্লেখ করে শিশু সুরক্ষা নিয়ে কর্মরত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, শিশু নির্যাতন এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো সামাজিক সমস্যা নয়, এটি জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। গতকাল শনিবার রাজধানীর শাহবাগে আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারের কনফারেন্স কক্ষে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন বৃদ্ধি ও করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ কথা বলেন। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যখাত, গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তারা।

বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণার তথ্য উদ্ধৃত করে বক্তারা বলেন, দেশে প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে প্রায় ৯ জন কোনো না কোনো ধরনের মানসিক বা সহিংস শাসনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়। অন্যদিকে, শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার মধ্যে দণ্ডাদেশের হার মাত্র ২ শতাংশ অর্থাত্ ৯৮ শতাংশ মামলায় অভিযুক্তরা শাস্তি পাচ্ছেন না। এমতবস্থায় শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিপীড়িত নারী ও শিশুদের আইনি ও স্বাস্থ্য সহায়তা সেলের উদ্যোগে আয়োজিত এই বৈঠকে উত্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৪৫ মিলিয়নের বেশি শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংস অভিজ্ঞতার মধ্যে রয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য তুলে ধরে জানানো হয়, ২০২৫ সালে শিশু ধর্ষণের রিপোর্টকৃত ঘটনা প্রায় ৪৫৬টি, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি। একই সময়ে ধর্ষণের চেষ্টার ঘটনাও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এ ছাড়া ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ঘটনায় ৫৬৬টির বেশি মামলা হলেও মাত্র ২ শতাংশ ক্ষেত্রে দণ্ডাদেশ কার্যকর হয়েছে।

আয়োজক সংগঠনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী অধ্যাপক ডা. মো. রফিকুল ইসলাম জানান, ২০২৬ সালের ১৫ মে পর্যন্ত ৯৩৬ জন নারী ও কন্যাশিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৩২ জন শিশু ও ৭৫ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। একই সময়ে ২০৭ জন নারী ও শিশু হত্যার শিকার হয়েছেন।

সভায় আলোচিত শিশু নির্যাতনের শিকার রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বলেন, তিনি শুধু মেয়ের হত্যার ন্যায়বিচার চান না, ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবার যেন এমন শোকের মুখোমুখি না হয়, সেই নিশ্চয়তাও চান। তিনি প্রশ্ন তোলেন, একটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ার দায় পরিবার, সমাজ নাকি রাষ্র্ব—কার?

গোলটেবিলে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার বলেন, ‘শিশু সুরক্ষা কেবল সামাজিক দায়িত্ব নয়, এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।’ তিনি শিশু সুরক্ষায় একটি জাতীয় টাস্কফোর্স এবং ‘ন্যাশনাল কমিশন ফর চাইল্ড প্রোটেকশন’ গঠনের প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি শিশু নির্যাতনকারীদের একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার (চাইল্ড অফেন্ডার রেজিস্ট্রি) তৈরির আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমে আলোচিত কিছু ঘটনার বিচার নিয়ে আলোচনা হলেও অসংখ্য শিশু এখনো ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত। তাই রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে কার্যকর উদ্যোগ বেশি প্রয়োজন।’

সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমীন বলেন, ‘শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; আইন বাস্তবায়ন এবং পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্বশীল ভূমিকা জরুরি। প্রযুক্তির অপব্যবহার, অনলাইন অপরাধ, মাদক ও জুয়ার বিস্তার শিশুদের নতুন ঝুঁকির মুখে ফেলছে।’ তিনি অভিভাবকদের আরো সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।

গোলটেবিল থেকে শিশু সুরক্ষায় ১০ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতিমালা, জেলা ও উপজেলায় চাইল্ড প্রোটেকশন ডেস্ক, দ্রুত তদন্ত ও বিচার, জাতীয় শিশু হেল্পলাইন ১০৯৮-এর সক্ষমতা বৃদ্ধি, শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত জাতীয় ডাটাবেস, শিশু-সংবেদনশীল গণমাধ্যম নীতিমালা, চিকিত্সক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম।

বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির নেত্রী নিপুণ রায় চৌধুরী, করপোরেট ব্যক্তিত্ব রুবাবা দৌলা, বাংলাদেশ অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটির (ওজিএসবি) সভাপতি অধ্যাপক ফিরোজা বেগম, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ড. তৌহিদ ইসলাম, অধ্যাপক ড. শামীমা সুলতানা, অধ্যাপক নাহরীন আই খান, ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন, ডা. মো. নিজাম উদ্দিন, অধ্যাপক ডা. সাইফুন নাহার, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, চলচ্চিত্র অভিনেতা আশরাফ উদ্দীন আহমেদ উজ্জলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রতিনিধিরা।