আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ) থেকে সরকারের নতুন ঋণ নেওয়ার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করেছে। দুপক্ষই নতুন ঋণ চুক্তি করার বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত। তবে ঋণ পেতে আইএমএফ কমপক্ষে ৫টি শর্ত জুড়ে দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-ডলারের বিপরীতে টাকার মান নির্ধারণ পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারের ওপর কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো বা কমানোর পদ্ধতি পুনর্বহাল করতে হবে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে কোনো ভর্তুকি দেওয়া যাবে না। বিভিন্ন খাত থেকে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে। রাজস্ব আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং কমাতে হবে কর ছাড়। শর্ত বাস্তবায়ন হলে একদিকে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাবে। অন্যদিকে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়বে।
এসব শর্তের কিছু বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। পর্যায়ক্রমে অন্য শর্তগুলোও বাস্তবায়ন করার পদক্ষেপ নেওয়া হবে। শর্তের মধ্যে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনার জন্য জুলাইয়ে আইএমএফের একটি মিশন ঢাকায় আসবে। তখন ঋণের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
সূত্র জানায়, নতুন ঋণের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আইএমএফকে চিঠি দেওয়ার পর সংস্থাটির বাংলাদেশ আবাসিক মিশন বেশ সক্রিয় হয়েছে। তারা সরকারের বিভিন্ন সংস্থা থেকে অর্থনীতির হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করছে। এসব তথ্য ঢাকায় আসার জন্য সংস্থাটি যে মিশন প্রস্তুতি নিচ্ছে তাদের পাঠানো হচ্ছে। এসব বিষয় নিয়ে জুলাইয়ে সরকারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করবে।
সূত্র জানায়, ডলারের বিপরীতে টাকার বিনমিয় হার এখনো বাজারভিত্তিক। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ফোন করে বাজারে হস্তক্ষেপ করছে। মাঝে মধ্যে বাজার থেকে ডলার কিনে এর দাম স্থিতিশীল রাখছে। কিন্তু আইএমএফ এটি পছন্দ করছে না। তারা বলছে, ডলারের দাম পুরোপুরি বাজারই নিয়ন্ত্রণ করবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো হস্তক্ষেপ চলবে না। এটি নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে আইএমএফের দেওয়া শর্ত বাস্তবায়ন করতে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ট্রেজারি বিভাগের প্রধানদের (বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা বিভাগ) সঙ্গে একটি বৈঠক করেছেন। গভর্নর বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারের বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ লক্ষ্যে ব্যাংকারদের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ডলারের দাম পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো হস্তক্ষেপ না করলে বাজারে এর দাম বেড়ে যাবে। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক হস্তক্ষেপ না করলেই ব্যাংকগুলো বাড়তি মুনাফার আশায় ডলারের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। ডলারের দাম বেড়ে গেলে অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক চাপ বাড়বে। এর মধ্যে আমদানি ব্যয় যেমন বাড়বে, তেমনি আমদানি ব্যয় জনিত কারণে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপও বাড়বে। টাকার মান কমার কারণেও মূল্যস্ফীতিতে চাপ বাড়বে। যা ভোক্তার ক্রয় ক্ষমতাকে আরও কমিয়ে দেবে। বৈদেশিক দায় দেনার পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।
আইএমএফ বলছে, ডলারের দাম বৃদ্ধি পেলে রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্সে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফলে ডলারের জোগান বাড়বে। একপর্যায়ে যা ডলারের দামকে স্থিতিশীল অবস্থায় নিয়ে আসবে।
আইএমএফের চাপে গত অন্তর্বর্তী সরকার জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয়ের প্রক্রিয়া চালু করেছিল। কিন্তু এতে জ্বালানি তেলের দাম কমানো হলেও বাজারে এর কোনো প্রভাব পড়ত না। আবার বাড়ানো ফলে সঙ্গে সঙ্গে এর প্রভাব পড়ত। বর্তমান সরকার এ প্রক্রিয়া থেকে বিরত থাকে। এখন আইএমএফ সেটি ফের চালু করার শর্ত দিয়েছে।
গ্যাস ও বিদ্যুতে মোটা অঙ্কের ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার। এতে সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ বাড়ছে। রাজস্ব আয় কমায় ঋণের টাকায় এখন ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। আইএমএফ বলছে, এভাবে ভর্তুকি দিলে সরকারের ঋণের বোঝা বাড়বে। মানুষের সেবা নিশ্চিত করতে সরকারের ব্যয় কমবে। সরকার আর্থিক ভাবে দুর্বল হবে। অর্থনীতিতে সংকট বাড়বে। এসব মোকাবিলা করতে এসব খাতে ভর্তুকি শূন্যে নামাতে হবে। এ পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে হলে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম আরও বাড়াতে হবে। এতে করে বেশির ভাগ পণ্যের দাম বাড়বে। মানুষের জীবনযাত্রার খরচ আরও বেড়ে যাবে। বাড়বে মূল্যস্ফীতিতে চাপ।
অন্য খাতে ভর্তুকি কমানো হলেও সংশ্লিস্ট খাতে পণ্য বা সেবার মূল্য বেড়ে গিয়ে মানুষের ভোগান্তি বাড়িয়ে দেবে।
দীর্ঘ অর্থনৈতিক মন্দায় রাজস্ব আয়ে রেকর্ড ঘাটতি হচ্ছে। রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য সংস্থাটি নানামুখী চাপ দিচ্ছে। ফলে সরকার বিভিন্ন খাতে কর আরোপ করার চিন্তা করছে। আগামী বাজেটে এর প্রতিফলন ঘটতে পারে।