দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। বাংকারে বাংকারে দুই দেশের সীমান্তরক্ষীদের সশস্ত্র উপস্থিতি সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করছে।
একদিকে বিএসএফের বাংলাভাষীদের তাঁরকাটার ফাঁক গলিয়ে পুশইনের চেষ্টা অপরদিকে পুশইন রুখে দিতে বিজিবি’র শক্ত অবস্থান সীমান্তবাসীদের ভাবিয়ে তুলছে। মাঠে-ঘাটে কাজ করতে যেতেও ভয় পাচ্ছেন সীমান্তবর্তী গ্রামের লোকজন। অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত জুড়ে বিজিবি’র কঠোর নজরদারি চলছে। এদিকে গত ৭ দিন ধরে যশোরের বেনাপোল পোর্টসংলগ্ন সাদীপুর সীমান্তের নোম্যান্স ল্যান্ডে পুশইনের উদ্দেশ্যে জড়ো করা বেশ কয়েকজন বাংলাভাষাভাষী নারী-পুরুষ ও শিশুদের ফেরত নিতে বাধ্য হয়েছেন বিএসএফ কর্তৃপক্ষ, দাবি যশোর ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খানের। বুধবার সকাল থেকে যশোর, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গা জেলার বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্টে সরজমিন পরিদর্শন এবং স্থানীয় সীমান্তবাসীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
ভারতের পশ্চিবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৫৭০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। যা সাতক্ষীরার বুড়িগোয়ালিনি থেকে শুরু করে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার বাংলাবাজার পর্যন্ত বিস্তৃত। বিশাল এই সীমান্ত অঞ্চলের প্রায় ৮০ শতাংশ অঞ্চল জুড়ে রয়েছে বিএসএফ নির্মিত তাঁরকাটার বেড়া। বাকি কিছু অংশে নদী ও বনজঙ্গল দিয়ে ঘেরা।
সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজিপি) ভূমিধস জয়লাভের পর শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেই বাংলাদেশি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী আখ্যা দিয়ে বাংলাভাষী মুসলমানদের দেশছাড়া করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তারই অংশ হিসেবে এই সীমান্ত অঞ্চলের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে কথিত বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে মুসলমান নর-নারী ও শিশুদের ধরে সীমান্তরক্ষী বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করছে। বিএসএফ এসব বাংলাভাষাভাষী মুসলিম নারী-পুরুষ ও শিশুদের বাংলাদেশে পুশইন করছে।
তারই অংশ হিসেবে কোরবানির ঈদের পরের দিন গভীর রাতে বেনাপোলের সাদীপুর সীমান্তের ওপারে উত্তর ২৪ পরগনার জয়ন্তপুর সীমান্ত দিয়ে ১৫-২০ জন নারী-পুরুষ ও শিশুকে পুশইনের চেষ্টা করে। বিএসএফ সদস্যরা রাতের অন্ধকারে সার্চলাইট বন্ধ করে এসব নারী-পুরুষ ও শিশুকে তাদের সহায়সম্বলসহ তাঁরকাটার ফাঁক দিয়ে ঠেলে দিয়ে সাদীপুরের নোম্যান্স ল্যান্ডে পাঠিয়ে দেয়। খবর পেয়ে স্থানীয়রা বেনোপোল বিজিবি ক্যাম্পে খবর দিলে ভোররাতেই বিজিবি সদস্যরা সশস্ত্র অবস্থা নিয়ে পুশইনের শিকার নারী-পুরুষ ও শিশুদের গতি রোধ করে এবং নোম্যান্স ল্যান্ড অতিক্রমে বাধা হয়ে দাঁড়ান। খবর পেয়ে জয়ন্তাপুর ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্যরা নানা রকমের উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড করতে থাকলেও যশোর ৪৯ বিজিবি’র কমান্ডার লে. কর্র্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খানের নেতৃত্বে বিজিবি কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি তাৎক্ষণিক সাদীপুর সীমান্ত অঞ্চলে বেশ কয়েকটি বাংকার খনন করে সেখানে সশস্ত্র সৈনিকদের চব্বিশ ঘণ্টা পাহারার ব্যবস্থা করেন। ফলে শেষ পর্যন্ত পতাকা বৈঠক আহ্বানে বাধ্য হয় বিএসএফ। গত পরশু অনুষ্ঠিত হয় এই পতাকা বৈঠক। শেষ পর্যন্ত পুশইন ঠেকিয়ে দিলে বিএসএফ ওই সব নারী-পুরুষ ও শিশুদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
এদিকে এই খবর ছড়িয়ে পড়লে এই বিস্তীর্ণ সীমান্ত জুড়ে শুরু হয় নানা আতঙ্ক উদ্বেগ। গতকাল সরজমিন খবর নিয়ে দেখা গেছে, দুই দেশের সীমান্তরক্ষীরা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় সীমান্তে তাদের শক্তি বৃদ্ধি করে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন। যেমন সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার ওপারে ভারতের গ্যাবাডা, গোবিলা, হাকিমপুর,গড়জালা, দোয়ারপাড়, জয়ন্তপুর, বাঁশঘাটা, দোয়ারপাড়, বাজিতপুর, মামা-ভাগ্নে, মশ্মমপুর, জিতপুর, লক্ষ্মীপুর, কাশিপুর, পলিয়ানপুর, হাবাসপুর, শীল বাড়িয়া, মোবারেকপুর, ফাতাপুর, গেঁদে, কুতুবপুর, ঝাঁপাডাঙ্গা, নতুন গ্রাম প্রভৃতি সীমান্ত রুটে বাংলাভাষাভাষী ভারতীয় বা অবৈধভাবে ভারতে বসবাসকারী বাংলাদেশি মুসলমানদের পুশইন করার চেষ্টা করছে বিএসএফ। এসব নারী পুরুষ ও শিশুদের সীমান্তে জড়ো করতে ভারতীয় পুলিশ বাহিনীকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তারা খুঁজে খুঁজে বাংলাদেশি মুসলমান যারা দীর্ঘদিন ভারতে বসবাস করছেন তাদের ধরে নিয়ে বিএসএফ এর হাতে তুলে দিচ্ছে। বিএসএফ সময় সুযোগ বুঝে তাদের সীমান্তের জিরো লাইনে ঠেলে দিচেছ। এই অবস্থায় বাংলাদেশি সীামন্তরক্ষী বিজিবি সদস্যরা এই পুশইন ঠেকাতে তাদের শক্তিবৃদ্ধি করে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। সম্প্রতি এক তথ্যে জানা গেছে, গত বেশ কিছুদিন ধরে এসব সীমান্ত রুট দিয়ে বহুসংখ্যক কথিত বাংলাদেশিকে পুশ ইন করা হয়েছে। তবে সম্প্রতি এই ইস্যুতে বিজিবি সর্বোচচ সতর্কাবস্থা অবলম্বন করায় সেই পরিস্থিতি কিছুটা হলেও উন্নতি হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে যশোর ৪৯ বিজিবি’র কমান্ডার লে. কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম খান মানবজমিনকে বলেন, দুই দেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত কারণে এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের ভাষার মিল থাকায় একসময় সাধারণ মানুষের চলাচল ছিল অবাধ। ভূ-রাজনৈতিক কারণে দুই দেশে বসবাসকারী বাংলাভাষাভাষীদের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক বিদ্যমান। যার কারণে সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সহবস্থান বিদ্যমান। তাছাড়া উভয় দেশের মানুষের চাষাবাদ হচেছ এখনো একই মাঠে। কিন্তু সম্প্রতি বিএসএফ এর নানা অপতৎপরতার কারণে সীমান্তে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে। তারা বাংলাভাষাভাষী মুসলমানদের ধরে ধরে অবৈধভাবে পুশইন করার চেষ্টা করছে। যা কোনোভাবেই মেনে নেয়া হবে না। একই ইস্যুতে চুয়াডাঙ্গায় বিজিবি ৬ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল নাজমুল হাসান এবং সাতক্ষীরার ৩৩ বিজিবি’র কমান্ডার লে. কর্নেল কাজী আশিকুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বলেন, আমরা সতর্কাবস্থায় আছি। তবে এসব সীমান্তে এখনো পর্যন্ত এই ধরনের কোনো পুশইনের চেষ্টা তাদের নজরে আসেনি। সীমান্ত চৌকিগুলোতে শক্তি বৃদ্ধি করা হচ্ছে। একইসঙ্গে সীমান্তের কাছাকাছি বাংলাদেশিদের সতর্ক করা হচ্ছে। যেকোনো পরিস্থিতি যেন তারা সম্মিলিত উদ্যোগে নস্যাৎ করে দিতে পারেন।