Image description

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর সরকার ও সরকারি দল বিএনপি এখন অনেকটাই একাকার। দলের বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ নেতা মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা। তৃণমূলের সামনের সারির নেতারাও এখন স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করছেন। অঙ্গসংগঠনের শীর্ষনেতারাও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপিতে এখন সাংগঠনিক কার্যক্রম আগের চেয়ে অনেক কম। এই অবস্থায় দলের কার্যক্রমে ভারসাম্য আনতে বড় ধরনের সাংগঠনিক পরিবর্তনের পথে হাঁটছে বিএনপি।

নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এখন জোরালোভাবে আলোচনায় মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের দলীয় গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি। এর মধ্য দিয়ে ‘এক নেতা এক পদ’ নীতি কার্যকর করতে চায় দলটির হাইকমান্ড। ফলে জেলা, মহানগর, উপজেলা কিংবা অঙ্গসংগঠনের বহু শীর্ষ নেতা দলীয় পদ হারাতে পারেন। ২০১৬ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে দলটির গঠনতন্ত্রে ‘এক নেতা এক পদ’ নীতি গ্রহণ করা হলেও দীর্ঘ সময়েও তা কার্যকর হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মন্ত্রিসভা, উপদেষ্টা পরিষদ, সংসদীয় কমিটিসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিএনপির নীতিনির্ধারক ও প্রভাবশালী নেতাদের। ফলে তাঁদের বেশির ভাগ সময় কাটছে নিজ নিজ দপ্তরের কাজ সামলাতে। অথচ একটা সময় তাঁদের দিনের বেশির ভাগ সময় দলীয় কার্যালয় ও কর্মসূচি পালনে কাটত। দল সরকারে আসার পর থেকে সেভাবে সাংগঠনিক ব্যস্ততা নেই। সে থেকেই অচেনা দৃশ্য দেখা যাচ্ছে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় নয়াপল্টনে। নেই তেমন দলীয় কর্মসূচি, সাংগঠনিক সভা কিংবা সংবাদ সম্মেলন। নয়াপল্টনের

সরগরম দপ্তরটি এখন প্রায়ই নেতাকর্মীশূন্য দেখা যায়। রোজই নেতা-কর্মীরা মন্ত্রীদের দপ্তর ও সচিবালয়ে ভিড় করছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার পরিচালনায় সফল হতে হলে দল ও সরকারের মধ্যে সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য থাকা অপরিহার্য। মন্ত্রীরা প্রশাসনিক কাজে মনোযোগ দিলে এবং অন্য নেতারা সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয় থাকলে ক্ষমতার অপব্যবহার কমবে এবং জবাবদিহি বাড়বে।  জানা গেছে, সরকারের ভিড়ে ঝিমিয়ে পড়া দল ও অঙ্গসংগঠন চাঙা করতে সম্প্রতি সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ধারণা করা হচ্ছে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে সারা দেশে দলের সর্বস্তরে বড় ধরনের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। এ ছাড়া নতুন করে দলের কাউন্সিল করার চিন্তাও আছে বিএনপির হাইকমান্ডের। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি এমনটাই জানিয়েছেন।

বিএনপির একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, সরকার পরিচালনা ও দলীয় কার্যক্রমকে আলাদা কাঠামোয় পরিচালনার লক্ষ্যে প্রথম ধাপে মন্ত্রী ও এমপিদের জেলা-মহানগর ও অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। পরে ধাপে ধাপে অন্যান্য সাংগঠনিক পদেও পরিবর্তন আনা হবে। দলটির নীতিনির্ধারকদের মতে, একই ব্যক্তি সরকার ও দলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলে কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়। মন্ত্রী-এমপিরা প্রশাসনিক দায়িত্বে ব্যস্ত থাকায় অনেক ক্ষেত্রে দলীয় কর্মকাণ্ডেও সময় দিতে পারছেন না। তাই কেউ কেউ স্বেচ্ছায় সাংগঠনিক পদ ছেড়ে দিয়ে সরকার পরিচালনায় মনোযোগী হওয়ার চিন্তাভাবনাও করছেন। 

এ লক্ষ্যে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক মডেলের বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট নেতাদের ভাষ্য, জিয়াউর রহমান দল ও সরকারকে আলাদা কাঠামোয় পরিচালনার নীতি অনুসরণ করতেন। তাঁর সময়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা নেতারা সাধারণত দলের শীর্ষ সাংগঠনিক পদে থাকতেন না। দল গোছানোর কাজে আলাদা নেতৃত্ব গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্ব দিতেন। দলের সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে কয়েকজন নেতা দলীয় পদ ছেড়েছেন। বিএনপির সিনিয়র নেতারা বলছেন, আগামী কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে জেলা-মহানগর এবং অঙ্গসংগঠনের কমিটিগুলো ঢেলে সাজানো হবে। ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগর বিএনপি, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতা এমপি ও প্রতিমন্ত্রী হওয়ায় তাঁদের পরিবর্তে নতুন নেতৃত্ব আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, ২০১৬ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে দলটির গঠনতন্ত্রের ১৫ ধারায় ‘এক নেতা এক পদ’ নীতি গ্রহণ করা হয়। এতে বলা হয়, কোনো ব্যক্তি একই সঙ্গে দলের কোনো পর্যায়ের কমিটির শীর্ষ দুই পদে থাকতে পারবেন না। 

নতুন নেতৃত্বকে জায়গা করে দিতে দীর্ঘদিন ধরে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এই নীতি কার্যকরের চেষ্টা করছিলেন। দলের নীতিনির্ধারণী পর্ষদ জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও গঠনতন্ত্রের এই ধারা কার্যকর করার নীতিগত সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। তবে এখন পর্যন্ত তা কার্যকর করা যায়নি। তিনি বলেন, দেখা যাক এখন এই নীতি কার্যকর করা যায় কিনা? জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, দল ও সরকার একাকার হয়ে গেলে তা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। তাঁর মতে, সরকারের কাজ সরকার করবে এবং দল দলের দায়িত্ব পালন করবে, এটাই হওয়া উচিত। দলটির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বিএনপির কাউন্সিল এই বছরের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, দলের লোক অনেকে সরকারে গেছেন। সেই জায়গাগুলোতে পূরণ হবে। এটা বিচ্ছিন্ন ব্যাপার নয়। এটা আলাদা করে দেখা যাবে না। সরকার তার কাজ করবে, দল তার কাজ করবে।’