Image description

রাজধানীতে সরকারের ১২৩টি মূল্যবান পরিত্যক্ত বাড়ি দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অবৈধ দখলে রয়েছে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর এসব সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হলেও বর্তমানে রাজনৈতিক প্রভাবশালী, ব্যবসায়ী এবং সরকারি কর্মকর্তাদের একাংশের যোগসাজশে এগুলো বেদখল হয়ে গেছে। হাজার কোটি টাকা মূল্যের এ সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।

জানা যায়, স্বাধীনতা-উত্তরকালে রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে যেসব সম্পত্তিকে ‘পরিত্যক্ত’ ঘোষণা করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত করা হয়েছিল, সেগুলোর একটি বড় অংশই এখন সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। ঢাকার গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, রমনা ও মতিঝিলের মতো অভিজাত এলাকায় অবস্থিত এ বাড়িগুলোর বাণিজ্যিক মূল্য আকাশচুম্বী। বেদখল হওয়া ১২৩টি বাড়ির পেছনে কাজ করছে একটি শক্তিশালী দখলদার সিন্ডিকেট। এ দখলদার সিন্ডিকেট নানা ইস্যুতে আদালতে মামলা এবং রিট করে আটকে রাখে। মামলা ও রিটের কারণে গৃহায়ন মন্ত্রণালয়ের চেষ্টা থাকলেও উদ্ধারে ব্যর্থ হয়। গুলশান, বনানী এবং ধানমন্ডির মতো অভিজাত এলাকায় এ ধরনের বহু আবাসিক বাড়িকে রাতারাতি অবৈধভাবে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এসব দখলদার।

সরেজমিন দেখা গেছে, গুলশান-১ এর ১৩৫ নম্বর রোডের ৪ নম্বর বাড়িটি ১৭ কাঠা জমির ওপর নির্মিত। যদিও এই ১৭ কাঠা জমির ওপর দুটি বাড়ি রয়েছে। প্রতিটি বাড়ি দুই তলাবিশিষ্ট। একটিতে থাকছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হারুনুর রশীদ। অন্যটিতে থাকছেন মহাব্যবস্থাপক মো. আবদুল বারেক। দুটো বাড়ি সাধারণ বীমা করপোরেশনের অবৈধ দখলে রয়েছে। এ ছাড়া গুলশানের ১০৩, ১০৪ নম্বর রোডের ২৭/বি এর দেড় বিঘা জমিতে ২৯ নম্বর বাড়ি দখলে রেখেছেন ব্যবসায়ী ও আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি সালাম মুর্শেদী। বর্তমানে সালাম মুর্শেদীর পরিবার বসবাস করছে বিশাল এ বাড়িটিতে। এ ছাড়াও গুলশান-২ এর ১২৬/১২৭ নম্বর রোডের ১৬ কাঠা জমির ওপর ১৫ নম্বর বাড়িটি দখলে রেখেছে আনসার ক্যাম্প। যদিও আনসার ক্যাম্পটি ব্যক্তি মালিকানা সম্পত্তি হিসেবে রয়েছে। এ জায়গাটির মালিকানা দাবি করছেন মিজান নামে এক ব্যবসায়ী। তিন তলাবিশিষ্ট বিশাল এ বাড়িটিতে ১০ জন আনসার থাকছেন। একই সঙ্গে বাড়িটির তত্ত্বাবধায়কও থাকেন বলে নিশ্চিত করেছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত আনসাররা।

আটক

এ ছাড়াও পুরানা পল্টনের ২১.৬২ কাঠা জমিতে ১৮-তলা ভবন; আর কে মিশন রোডের ২৫-তলা ভবনের ৩ নম্বর বাড়ি; ১৮৯, তেজকুনীপাড়ার প্রায় ৩০ কাঠা জমিতে আট তলা ভবনে ২৮টি ফ্ল্যাট; ৭, ময়মনসিংহ রোডের ২২ কাঠা জমিতে ছয় তলা দুটি ভবনের ৪৫টি ফ্ল্যাট; ৩৩, দিলু রোডের আট কাঠায় আট তলা ভবনের ২১টি ফ্ল্যাট এবং মোহাম্মদপুর বি-ব্লকের হুমায়ুন রোডের সাড়ে সাত কাঠা জমিতে ৫/১৮ নম্বর বাড়িতে থাকছেন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের কর্মচারীরা। ধানমন্ডির ৯/এ নম্বর রোডের ১৩৩ নম্বরে ২০ কাঠা জমিতে দোতলা বাড়ির নিচ তলায় ‘ইন্ডিয়ান স্পাইসি চিকেন’ এবং ‘অহনা ডিনার’ নামে দুটি রেস্টুরেন্ট। পাশেই একটি বড় মোটর গ্যারেজ ও দুটি দোকান। আর দোতলাজুড়ে বিশাল খাবারের দোকান ‘ওজ ক্যাফে রেস্টুরেন্ট’। ধানমন্ডির ২ নম্বর রোডের ১৪ ও ১৪/এ দুটি বাড়ি। ১ বিঘারও বেশি জমিজুড়ে বাড়ি দুটির একটির সম্মুখ অংশ একতলা আর পেছনে তিন তলা। বাড়িটি আদালতে রিট করে ‘মেসার্স অ্যাকম ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’র নামে দখলে রেখেছেন মাজেদুল ইসলাম।

তিনি নির্বিঘ্নে দোকান বানিয়ে ভাড়া দিচ্ছেন। ১৬, নিউ ইস্কাটনের ১ বিঘা জমিতে দোতলা বাড়ির নিচ তলা সার্টিফিকেট মামলা করে দখলে রেখেছেন শহীদ পরিবারের সদস্য ও সাবেক এমপি শমী কায়সার। একইভাবে দোতলা দখলে রেখেছেন আরেক শহীদ পরিবারের সন্তান ডা. মারগুব আরেফ জাহাঙ্গীর। জানতে চাইলে পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা বোর্ডের (এপিএমবি) সভাপতি ও ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের সরকার সব সময় আন্তরিক। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এ নিয়ে কাজ করছে। অনেকগুলো সম্পত্তি নিয়ে মামলা থাকায় দ্রুত সময়ের মধ্যে উচ্ছেদ করা সম্ভব হয় না। তবে বর্তমান সরকার এ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, রাজধানীতে গেজেটভুক্ত পরিত্যক্ত সরকারি বাড়ির সংখ্যা ৬ হাজার ৫৩৮টি। পরিত্যক্ত বাড়িগুলোর মধ্য থেকে সরকার অবমুক্ত করেছে ১ হাজার ১৮টি। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া ও লিজ দেওয়া হয়েছে অন্তত দেড় হাজার বাড়ি। পরিত্যক্ত সম্পত্তি নিয়ে হাই কোর্টে ৪ হাজার ৩৫৮টি মামলা রয়েছে। কোর্ট অব সেটেলমেন্টে ২৫০টি এবং ভাড়া আদায়সংক্রান্ত ৪১২টি মামলা চলমান আছে।