Image description

এক সময়ের দেশের সবচেয়ে লাভজনক, আস্থাশীল এবং তারল্যে উদ্বৃত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি এখন গভীর সংকটে। চেয়ারম্যানের পদত্যাগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) বাধ্যতামূলক ছুটিতে  পাঠানো, পর্ষদে রদবদল, রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ এবং সারা দেশে গ্রাহকদের মানববন্ধন- সবমিলিয়ে ব্যাংকটিতে নতুন করে অস্থিরতা চলছে। ধারাবাহিক ঋণ কেলেঙ্কারি, বেনামি ঋণ বিতরণ, তীব্র তারল্য সংকটে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। প্রতিষ্ঠার পর ব্যাংকটি এখন বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে গত কোরবানি ঈদের আগে পরে তীব্র অর্থ সংকট লক্ষ্য করা গেছে। আমানত উত্তোলনের প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ব্যাংকটির শাখা ও এটিএম বুথ থেকে গ্রাহকদের টাকা উত্তোলন করতে না পারার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

 
 
 
Remaining Time 7:53

এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকটিতে বিতর্কিত চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে গ্রাহকদের অনাস্থা সৃষ্টি হওয়ায় ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নেয়ার হিড়িক পড়েছে। গ্রাহকরা জমার চেয়ে টাকা তুলছেন বেশি। খুরশীদ আলমের নিয়োগ বাতিল করে পুরনো ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ফেরানোর দাবিতে আন্দোলন করছেন ব্যাংকটির গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডারদের একটি অংশ। দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংকের এই অস্থিরতা পুরো আর্থিক খাতে আস্থাহীনতা বাড়াবে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই ব্যাংক যদি ধ্বসে পড়ে তাহলে দেশের গোটা অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহলে ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। ইসলামী ব্যাংককে নিয়ে নানা টানাহেচড়ায় প্রশ্ন উঠেছে ইসলামী ব্যাংক আসলে তুমি কার?

নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ ঘিরে অস্থিরতা: অনেক নাটকীয়তার পর ২৪শে মে রাতে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ড. জোবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেছেন। একইসঙ্গে সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। নিয়োগের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। ঈদের ছুটির মধ্যেই বিভিন্ন জেলায় ‘গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন শুরু হয়।

ঈদের ছুটি শেষে গত সোমবার ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যানের কাজে যোগ দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’ এর ব্যানারে নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে নামে একটি পক্ষ। এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে বলেই মনে করেন ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, ইসলামী ব্যাংক নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার লড়াই চলছে। যদিও ইসলামী ব্যাংক জামায়াত কিংবা কোন দলের প্রতিষ্ঠান নয়। তবে প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে জামায়াতের দু’জন শীর্ষনেতা পরিচালনা পর্ষদে ছিলেন। ওদিকে সচেতন গ্রাহক ফোরামের ব্যানারে আন্দোলনরতরা বলছেন, নতুন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে ব্যাংকটি আবারো একটি বিশেষ গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে, এই শঙ্কা থেকেই আন্দোলনে নেমেছেন তারা।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এস আলম গ্রুপের শেয়ার জব্দ করে ইসলামী ব্যাংকে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন বলা হয়েছিল, বিতর্কিত প্রভাবমুক্ত করে সুশাসন ফিরিয়ে আনা হবে। কিন্তু নতুন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রধান কার্যালয়ের সামনে সাধারণ গ্রাহক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিক্ষোভ এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনা ব্যাংকের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়াকে আরও দীর্ঘায়িত করছে এবং সাধারণ মানুষের আস্থার সংকটকে বাড়িয়ে তুলছে। দেখা দিয়েছে নতুন করে অস্থিরতা।

যে কারণে খুরশীদ আলমের প্রতি অনাস্থা: নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। এ ছাড়া নিয়োগ পাওয়া চেয়ারম্যানের স্ত্রী ঋণখেলাপি হওয়া এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরির সময় শাস্তির মুখে পড়া বিষয়টি এখন নেতিবাচকভাবে আলোচনা হচ্ছে। এ ছাড়া বিদায়ী চেয়ারম্যান অধ্যাপক জোবায়দুর রহমানকে কেন সরানো হলো এই প্রশ্নের উত্তরও কারও কাছে নেই। জোবায়দুর রহমান একজন অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ। বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে তার কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। দায়িত্ব নেয়ার পর তার নেতৃত্বে ব্যাংকে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল। এই অবস্থায় কেন তাকে সরিয়ে দেয়া হলো এই প্রশ্নও তুলছেন ব্যাংকের গ্রাহক এবং শেয়ারহোল্ডাররা।
আন্দোলনকারী গ্রাহক ও কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, অতীতে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে যে বিতর্ক ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল, নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে তার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। মো. খুরশীদ আলম বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ-এর ঘনিষ্ঠ বা তাদের স্বার্থ রক্ষাকারী ব্যক্তি।

তার মতো কারও নেতৃত্ব ব্যাংকটিকে আবারো নতুন করে আর্থিক ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। গ্রাহকদের একটি অংশ মনে করছেন, তাদের আমানতের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এই আশঙ্কা থেকেই অনেকে ডিপিএস, ফিক্সড ডিপোজিট এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি আমানত ভেঙে টাকা তুলে নিচ্ছেন। খুরশীদ আলম বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে কর্মকর্তাদের তীব্র আন্দোলনের মুখে যে কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন, খুরশীদ আলম ছিলেন তাদের অন্যতম। গ্রাহকদের দাবি, যাকে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল, তাকেই আবার ইসলামী ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে বসানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এমডিকে ঘিরে উত্তেজনা: সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. ওমর ফারুক খানকে সম্প্রতি দীর্ঘ ছুটিতে পাঠানো হয়। যদিও তিনি মূলত ১৫ দিনের ছুটি চেয়েছিলেন, পরিচালনা পর্ষদ তা বাড়িয়ে প্রায় দেড় মাসে উন্নীত করে। বিষয়টি ব্যাংকের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এর মধ্যে তিনি প্রধান কার্যালয়ে গেলে বিক্ষোভকারীদের একাংশ তাকে পদত্যাগ না করার অনুরোধ জানান এবং ‘ব্যাংক বাঁচাও’ স্লোগান দেন। পরে তিনি চেয়ারম্যান বরাবর পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে কার্যালয় ত্যাগ করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান: ইসলামী ব্যাংকের আন্দোলনরত গ্রাহকরা সাত দফা দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, দাবি না মানা পর্যন্ত কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন। যদিও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। তবে বুধবার আরিফ হোসেন খান বলেছেন, ইসলামী ব্যাংকে চেয়ারম্যান নিয়োগ ক্ষতিকর হলে ভেবে দেখবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ইসলামী ব্যাংকের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমের স্ত্রী ঋণখেলাপি। তবে স্ত্রী ঋণখেলাপি হলেও তা বাধা নয় ব্যাংক চেয়ারম্যান হওয়ার ক্ষেত্রে।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করা ব্যক্তিকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়ার বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরির সুযোগ রয়েছে কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে মি. খান বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক এমনটি মনে করে না।

পর্ষদে রদবদল ও জামায়াতের নিন্দা: ব্যাংক সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক সংকটের পেছনে মূল কারণ পরিচালনা পর্ষদের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন। ইসলামী ব্যাংকে সরকারের ‘অযাচিত হস্তক্ষেপের’ অভিযোগ তুলে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ২৫শে মে এক বিবৃতিতে এ অভিযোগ করেন। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ব্যাংক খাতে লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো বিতর্কিত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হচ্ছে। তিনি বর্তমান গভর্নরের অপসারণ, লুণ্ঠিত অর্থ ফেরত আনা এবং যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড পুনর্গঠনের দাবি জানান।

সারা দেশে মানববন্ধন: ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে উত্তেজনার জেরে রোববার দেশের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ, জলকামান, টিয়ারগ্যাস এবং সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়। বিক্ষোভকারীদের দাবির মধ্যে ছিল-এমডি ওমর ফারুক খানকে পুনর্বহাল, ব্যাংকের উপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ, এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা, গ্রাহকদের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের আহ্বায়ক অধ্যাপক নুর নবী মানিক অভিযোগ করে বলেন, সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে গ্রাহক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, দাবিগুলো বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ না নেয়া হলে ভবিষ্যতে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে।

বিশ্লেষকদের বক্তব্য: ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসলামী ব্যাংকের এই বিপর্যয়ের সূচনা হয় ২০১৭ সালে। ওই বছর রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ জবরদস্তিমূলকভাবে নিজেদের হাতে নেয়। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এস আলম গ্রুপ ও তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা ঋণ তুলে নিয়েছে। যা আদায়ের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, দেশের অন্যান্য সব দুর্দশাগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একমাত্র ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা ফিরে আসছিল। প্রতিষ্ঠানটা তো একটু ঘুরে দাঁড়ানোর পথে হাঁটছিল। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়ার কারণে একটা হযবরল পরিস্থিতি তৈরি হয়ে গেল। এটা তো প্রত্যাশা ছিল না কারও।

এখন আবার পুনর্নিয়োগ দিতে গেলেও তাদেরকে (বাংলাদেশ ব্যাংক) একটা লজ্জার মধ্যে পড়তে হচ্ছে যে, আগের নিয়োগটা তো ভুল ছিল। তাই প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা ও কর্মচারীদের স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

ব্যাংক খাতের চলমান সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, দেশের ব্যাংক খাতে এখনো কাঙ্ক্ষিত শৃঙ্খলা ফেরেনি। ফলে ব্যাংকগুলোর উপর সাধারণ গ্রাহকের আস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। নতুন সরকারকে ব্যাংক খাতে দ্রুত শৃঙ্খলা ও সুশাসন ফেরানোর বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

আমানত উত্তোলন আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে: কথা হয় ইসলামী ব্যাংকের একজন পুরাতন গ্রাহক খালিদ সাইফুল্লাহর সঙ্গে। তিনি জানান, পাঁচ বছর মেয়াদি মাসিক ১০ হাজার টাকা কিস্তিতে একটি ডিপিএস (ডিপোজিট পেনশন স্কিম) খুলেছিলাম। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে ভুল হয়েছে। মেয়াদ পূর্ণ হলে যে মুনাফা পাবো তার তো নিশ্চয়তা নেই। তাই ভেঙে ফেলতে বাধ্য হচ্ছি। তার উদ্বেগের মূল ইস্যু ছিল নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগ। তিনি বলেন, খুরশীদ আলম অতীতে এস আলম গ্রুপের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের ঘটনাকে ঘিরে যে বিতর্ক ও শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো মানুষের মনে আছে।

শুধু খালিদ নয়, তার মতো অনেক গ্রাহক টাকা তুলছেন। আরেক গ্রাহক আকুল আকন্দ বলেন, ব্যাংক ঘিরে সাম্প্রতিক অস্থিরতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে তিনিও টাকা তুলে নিয়েছেন। খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যান করার ঘোষণার পর আবারো সেই পুরনো প্রভাব ফিরে আসতে পারে। আমি ঝুঁকি নিতে চাইনি, তাই টাকা তুলে নিয়েছি।
ব্যাংক সূত্র মতে, গত এক মাসে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার উপরে তুলে নিয়েছেন গ্রাহকরা। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের আমানতের পরিমাণ ১ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকার নিচে নেমেছে। এটি মে মাসের শুরুতে ছিল ১ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকার ঘরে।

ইসলামী ব্যাংকের শুরু যেভাবে: সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে বাংলাদেশে বেসরকারি ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া শুরু হয়। ১৯৮২ ও ১৯৮৩ সালে আটটি বেসরকারি ব্যাংক যাত্রা শুরু করে, যার একটি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড (১৯৮৩)। ব্যাংকটির বার্ষিক প্রতিবেদনে নিজেদের দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সত্তর ও আশির দশকে মুসলিমপ্রধান দেশগুলোয় ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রবণতা শুরু হয়। এর পেছনে ছিল ইসলামী দেশগুলোর সংগঠন ওআইসি। ১৯৭৩ সালে সৌদি আরবের জেদ্দায় ওআইসি’র মন্ত্রিপর্যায়ের সম্মেলনে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৭৫ সালে যাত্রা শুরু করে আইডিবি। এরপর দেশে দেশে ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামী ব্যাংক।
ইসলামী ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন-২০১৫ অনুযায়ী, তখন ব্যাংকটিতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীদের ৬৩.১৮ শতাংশ শেয়ার ছিল। বাকিটা ছিল দেশীয় বিনিয়োগকারীদের। দেশীয় উদ্যোক্তাদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা ছিলেন। তাদের দু’জন মীর কাসেম আলী ও আবু নাসের মুহাম্মাদ আবদুজ জাহের জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলেন।

ইসলামী ব্যাংকে জামায়াতে ইসলামীর সংশ্লিষ্টতা এবং চাকরিতে জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের বিশেষ অগ্রাধিকারের বিষয়টি সব সময় আলোচনায় ছিল।

শেয়ার ছাড়েন বিদেশিরা: এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর ধীরে ধীরে শেয়ার ছেড়ে দেয় আইডিবি, দুবাই ইসলামী ব্যাংক, ইসলামিক ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড করপোরেশন দোহা, ইসলামিক ব্যাংকিং সিস্টেম ইন্টারন্যাশনাল হোল্ডিং লুক্সেমবার্গ, শেখ আহমেদ সালেহ জামজুম, শেখ ফুয়াদ আবদুল হামিদ আল-খতিব, আল-রাজি গ্রুপ, কুয়েতের সরকারি ব্যাংক কুয়েত ফাইন্যান্স হাউজ, সৌদি কোম্পানি আরবসাস ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিস্ট এজেন্সিসহ বেশির ভাগ বিদেশি উদ্যোক্তা ও সাধারণ শেয়ারধারী প্রতিষ্ঠান। স্থানীয় উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান বায়তুল শরফ ফাউন্ডেশন, ইবনে সিনা ট্রাস্ট, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার ও ইসলামিক ইকোনমিক রিসার্চ ব্যুরোও শেয়ার ছেড়ে দেয়।

ব্যাংকের আর্থিক হালচাল: বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ইসলামী ব্যাংকের মুনাফা ছিল প্রায় ৪৪৭ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা নেমেছে ১৩৭ কোটি টাকায়। তখন খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪.২৫ শতাংশ, যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯ শতাংশে। ব্যাংকটির ৯২ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ এখন খেলাপি।
ব্যাংকটির শেয়ার মালিকানায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হিস্যা ৬৩ শতাংশ থেকে কমে ১৭.৯১ শতাংশে (মার্চ, ২০২৬) নেমেছে। অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রায় ৮২ শতাংশ শেয়ারের সঙ্গে এস আলমের সংশ্লিষ্টতা থাকায় তা জব্দ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

জানা গেছে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) ইসলামী ব্যাংক ২৮৮ কোটি টাকা নিট লোকসান গুনেছে। অথচ এক দশক আগেও প্রতি বছর ব্যাংকটি হাজার কোটি টাকার উপর নিট মুনাফা করতো এবং শেয়ারহোল্ডারদের ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত লভ্যাংশ (ডিভিডেন্ড) দিতো। বিগত দুই বছর ধরে ব্যাংকটি শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারছে না।