Image description
সুখবর এক্সপ্লেইনার

দেশের প্রশাসনিক কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়। এখান থেকেই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সেই সচিবালয়ের অভ্যন্তরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের রেড টেলিফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এবং পরে তদন্তে মূল্যবান কপার ক্যাবল কাটা বা উধাও হওয়ার তথ্য সামনে আসা নিঃসন্দেহে একটি উদ্বেগজনক ঘটনা। বিষয়টি শুধু একটি টেলিফোন লাইন বিকল হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।

দৈনিক আমার দেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঈদুল আজহার ছুটির পর ১ জুন সকালে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় কার্যালয়ে কর্মরত কর্মকর্তারা দেখতে পান যে প্রধানমন্ত্রীর রেড টেলিফোনে কোনো সংযোগ নেই। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে বিটিসিএলকে জানানো হলে তাদের একটি দল প্রায় সাত ঘণ্টার প্রচেষ্টার পর সংযোগ পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়। পরে অনুসন্ধানে দেখা যায়, সচিবালয়ের পুরোনো ২ নম্বর ভবন থেকে নতুন ১ নম্বর ভবন পর্যন্ত বিস্তৃত গুরুত্বপূর্ণ কপার ক্যাবলের বিভিন্ন অংশ কাটা হয়েছে অথবা সম্পূর্ণ উধাও হয়ে গেছে।

দেশের সরকারি যোগাযোগ ব্যবস্থায় ‘রেড টেলিফোন’ শব্দটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এটি সাধারণ টেলিফোন নয়; বরং উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত একটি নিরাপদ ও সংরক্ষিত ব্যবস্থা। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তা কিংবা অন্যান্য সাংবিধানিক ও নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে জরুরি যোগাযোগের ক্ষেত্রে এ ধরনের লাইনের গুরুত্ব অপরিসীম। ফলে এ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া কেবল একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ও বটে।

ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি সচিবালয়ের মতো উচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় ঘটেছে। সাধারণত সচিবালয়ে প্রবেশের ক্ষেত্রে পরিচয় যাচাই, পাস ব্যবস্থাপনা, সিসিটিভি নজরদারি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক স্তরের নিরাপত্তা বলয় কার্যকর থাকার কথা। এমন একটি স্থানে কেউ যদি দিনের পর দিন বা রাতের আঁধারে গুরুত্বপূর্ণ কপার ক্যাবল কেটে নিয়ে যেতে পারে, তাহলে তা নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ধরনের ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কপার তার চুরি দেশে নতুন কোনো ঘটনা নয়। বিদ্যুৎ, রেলওয়ে, টেলিযোগাযোগ এবং শিল্পকারখানার বিভিন্ন স্থাপনা থেকে প্রায়ই কপার চুরির ঘটনা ঘটে থাকে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে কপারের মূল্য তুলনামূলক বেশি। তবে সচিবালয়ের মতো এলাকায় এমন ঘটনা সাধারণ চোরচক্রের কাজ বলে ধরে নেওয়া কঠিন। কারণ সেখানে প্রবেশ, অবস্থান এবং দীর্ঘ সময় ধরে তার কাটার মতো কার্যক্রম পরিচালনা করা সাধারণ অপরাধীদের পক্ষে সহজ নয়।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, তদন্তে দুটি বিষয় বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত, এটি কি শুধুই কপার চুরির উদ্দেশ্যে সংঘটিত অপরাধ? দ্বিতীয়ত, নাকি রাষ্ট্রীয় যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সাময়িকভাবে অকার্যকর করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত নাশকতা? কারণ তার চুরি যদি মূল উদ্দেশ্যও হয়ে থাকে, তবুও অপরাধীরা জানত কি না যে তারা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ ব্যবস্থাকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর সাইবার এবং ফিজিক্যাল হামলার ঝুঁকি বেড়েছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র, টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক, বিমানবন্দর কিংবা সরকারি ভবনের যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। দেশেও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামো সুরক্ষার বিষয়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সচিবালয়ের অভ্যন্তরে এমন একটি ঘটনা প্রমাণ করে যে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি শারীরিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছুটির সময় সচিবালয়ে নিয়মিত নজরদারি ছিল না বা তা যথেষ্ট কার্যকর ছিল না। দীর্ঘ ছুটির সময় সরকারি স্থাপনাগুলোতে সাধারণত নিরাপত্তা জোরদার করার কথা। কারণ এ সময় কর্মচারীদের উপস্থিতি কম থাকায় নাশকতা বা চুরির ঝুঁকি বাড়ে। যদি কয়েকদিন ধরে কপার ক্যাবল কাটা হয়ে থাকে, তাহলে তা নজরে না আসা নিরাপত্তা তদারকির ঘাটতিরই প্রমাণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের কয়েক গবেষক অতীতে বিভিন্ন গবেষণায় দেখিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা ব্যর্থতার পেছনে শুধু প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা নয়, মানবিক অবহেলাও বড় কারণ হিসেবে কাজ করে। পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকা, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের শৈথিল্য, সিসিটিভি মনিটরিংয়ের দুর্বলতা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এ ধরনের ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

সচিবালয়ের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন নতুন নয়। গত কয়েক বছরে বিভিন্ন আন্দোলনকারী গোষ্ঠীর সচিবালয়ে প্রবেশ, সরকারি ভবনের সামনে বিক্ষোভ এবং নিরাপত্তা বলয় ভেঙে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলনকারীদের সচিবালয়ে ঢুকে পড়ার ঘটনাও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। ফলে সাম্প্রতিক এই ঘটনা সেই পুরোনো উদ্বেগকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, তদন্তে শুধু তার চোরদের শনাক্ত করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। বরং কেন এমন ঘটনা ঘটল, নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোন স্তরে ব্যর্থতা ছিল, সিসিটিভি ফুটেজে কী পাওয়া গেছে, নিরাপত্তা কর্মীদের দায়িত্ব পালনে কোনো গাফিলতি ছিল কি না—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে জন্য অবকাঠামোগত সংস্কার জরুরি।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় এখনো অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো কপার-নির্ভর অবকাঠামো ব্যবহৃত হচ্ছে। ধীরে ধীরে এসব সংযোগকে ফাইবার অপটিক এবং বিকল্প নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থায় রূপান্তর করা প্রয়োজন। কারণ কপার শুধু চুরির ঝুঁকিতেই নয়, প্রযুক্তিগতভাবে অনেক ক্ষেত্রেই আধুনিক নিরাপত্তা মানদণ্ডের তুলনায় দুর্বল।

প্রধানমন্ত্রীর রেড টেলিফোন সাত ঘণ্টা অচল থাকার ঘটনা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে কোনো বড় ক্ষতির কারণ হয়নি—এটি স্বস্তির বিষয়। কিন্তু ঘটনাটি একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা উচিত। রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ভবনের অভ্যন্তরে যদি এমন ঘটনা ঘটতে পারে, তাহলে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

অতএব, এই ঘটনাকে সাধারণ চুরির মামলা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি দেশের প্রশাসনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি পরীক্ষাও বটে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, দায়ীদের শনাক্তকরণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো দ্রুত সংশোধন করা না গেলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সচিবালয়ের মতো রাষ্ট্রের স্নায়ুকেন্দ্রে নিরাপত্তার কোনো বিকল্প নেই। প্রধানমন্ত্রীর রেড টেলিফোনের তার চুরির ঘটনা সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিল।