ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও উপকূলীয় দুর্যোগের সময় যেমন সুন্দরবন প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে, তেমনি চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপকূলকে রক্ষা করে গহিরা প্যারাবন। অথচ সেই সংরক্ষিত বনাঞ্চল এখন মাটিখেকোদের থাবায় বিপন্ন। বন বিভাগের সংরক্ষিত এলাকা ও তার আশপাশ থেকে মাটি কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পরিবেশবিদ ও স্থানীয়দের মতে, এটি উপকূলীয় পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার উপকূলীয় রায়পুর ইউনিয়নের শঙ্খ নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় গড়ে ওঠা সংরক্ষিত গহিরা প্যারাবন এখন অস্তিত্ব সংকটে। এক সময়ের সবুজ বেষ্টনী হিসেবে পরিচিত এই বনাঞ্চল দখল, গাছ নিধন ও মাটি কাটার কারণে ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। উপকূলীয় দুর্যোগ থেকে আনোয়ারাকে সুরক্ষা দেওয়া এই বন এখন নিজেই হুমকির মুখে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রায় ১৫ একর বনভূমি উজাড় করা হয়েছে। বর্তমানেও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীরা প্যারাবনের মাটি কেটে বিক্রি করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আনোয়ারার গহিরা বেড়িবাঁধ নির্মাণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) একটি প্রকল্পের কাজ চলছে। এ প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স শেখ এমদাদুল হক মামুন। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করা কয়েকজন বিএনপি-সমর্থিত ব্যক্তি বন বিভাগের সংরক্ষিত এলাকা থেকে মাটি কেটে বেড়িবাঁধ নির্মাণে ব্যবহার করছেন। এতে বন উজাড়ের পাশাপাশি পরিবেশের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বনাঞ্চল সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে মাটি কেটে নেওয়া হয়েছে। সেই মাটি ব্যবহার করা হয়েছে চলমান বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজে। প্যারাবনের পাশ থেকে মাটি কেটে নেওয়ায় স্থানটি এখন অনেকটা মৎস্য প্রকল্পে রূপ নিয়েছে।
এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে বজলুল করিম চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি জায়গাটি নিজের দাবি করে সাইনবোর্ড টানিয়েছেন। তবে স্থানীয়দের দাবি, অতীতে এই এলাকা বন বিভাগের আওতাভুক্ত ছিল।
মাটি কাটার বিষয়ে জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স শেখ এমদাদুল হক মামুনের এক কর্মকর্তাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে শহীদ বলেন, আমরা প্রকল্পের কাজ তদারকি করি। মাটি কোথা থেকে আনা হচ্ছে, সে বিষয়ে সব সময় অবগত থাকি না। স্থানীয়ভাবে পাশের এলাকা থেকে মাটি না নেওয়ার জন্য আমরা দূরবর্তী স্থান থেকে মাটি সরবরাহের নির্দেশনা দিয়ে থাকি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক মনিরা পারভীন বলেন, উপকূলীয় এলাকা থেকে মাটি কেটে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। জায়গা বন বিভাগের হোক বা ব্যক্তিমালিকানাধীন আইন অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া মাটি কাটা যাবে না। প্যারাবন উপকূলীয় এলাকার প্রাকৃতিক সুরক্ষা দেয়। বন রক্ষা ও এর টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য মানুষকে সচেতন হতে হবে এবং প্রশাসনকে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৫ আগস্টের আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আমিন শরীফের নেতৃত্বে জকু মাঝি নামে এক ব্যক্তি বনাঞ্চলের একটি বড় অংশ কেটে মাছের ঘের নির্মাণ করেন। উপকূল রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই বন ধ্বংস করে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে একাধিক মাছের ঘের।
অভিযোগ রয়েছে, প্যারাবনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে বন বিভাগের চিহ্নিত গাছ ঘিরে মাটির বাঁধ দিয়ে মাছের ঘের তৈরি করা হয়েছিল।
বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের নীরবতায় প্রভাবশালীরা দীর্ঘদিন ধরে বন ধ্বংস করে অবৈধভাবে মাছের ঘের পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের দাবি, প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কোন সময়।
স্থানীয়রা জানান, কয়েক বছর ধরে গহিরা প্যারাবনে ধাপে ধাপে শত শত গাছ কেটে বন উজাড় করা হচ্ছে। এসব স্থানে গড়ে তোলা হচ্ছে মাছের ঘের। বন বিভাগের নিষ্ক্রিয়তার কারণে বনটি এখন মারাত্মক হুমকির মুখে।
বন আইন অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া বনভূমি দখল বা বন উজাড় করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রায় চার বছর ধরে চলমান এই বন ধ্বংসের ফলে বনের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এতে জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।
স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে উপকূলীয় এলাকা রক্ষার জন্য চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের উদ্যোগে গহিরা প্যারাবন গড়ে তোলা হয়। প্রায় ২৫০ একর আয়তনের এই বনাঞ্চলে ১৯৯১-৯২ সালের জলোচ্ছ্বাসের পর বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ১০ হাজার গাছ রোপণ করা হয়। পরবর্তীতে বন সম্প্রসারণ করা হয়। বর্তমানে সেখানে কেওড়া, গেওয়া, বাইনসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রয়েছে।
বর্ষাকালে মাছ চাষ ও শুকনো মৌসুমে মাটি কাটার মাধ্যমে বন ধ্বংসের বিষয়ে বন বিভাগের কোন কর্মকর্তা এবিষয়ে কোন সদুত্তর দিতে পারেনি।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে বন কেটে মাছের ঘের তৈরি ও মাটি বিক্রি করা হলেও বন বিভাগ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, ম্যানগ্রোভ বা প্যারাবন উপকূলীয় এলাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের বন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ঢেউয়ের গতি কমায় এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মাছ চাষের নামে বন ধ্বংস করা, মাটি কেটে নেওয়া পরিবেশের জন্য বড় হুমকি। এখন যদি মাটি কেটে পুরো বনাঞ্চলকে খালে পরিণত করা হয়, তাহলে সমুদ্রের ঢেউয়ের আঘাতে বনাঞ্চল বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। এতে দীর্ঘমেয়াদে উপকূল আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বাঁশখালী রেঞ্জের ডেপুটি রেঞ্জার ও রেঞ্জ কর্মকর্তা খায়রুল আলম বলেন, আমি নতুন দায়িত্বে এসেছি। মাটি কাটার বিষয়টি শুনে একবার পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। তবে বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত অবগত নই।
চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এম. এ. হাসান বলেন, “বিষয়টি আমার বিস্তারিত জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখছি। আমাদের জায়গা থেকে মাটি কাটা বা বন উজাড়ের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মহিন উদ্দিনের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।