Image description

কানাডা, বহুসংস্কৃতি আর অভিবাসীদের জন্য বিশ্বের বুকে এক স্বপ্নের দেশ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই কানাডাতেই অভিবাসীদের আগমন এবং স্থানীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধন নিয়ে তুষের আগুনের মতো জ্বলতে থাকা ক্ষোভ এবার প্রকাশ্য রূপ নিল নেটদুনিয়ায়। কানাডার টরন্টো শহরের একটি উন্মুক্ত রাস্তায় ভারতীয় প্রবাসী সম্প্রদায়ের শত শত মানুষের ঐতিহ্যবাহী নাচ এবং উৎসবের একটি ভাইরাল ভিডিও ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে এক আইনি ও মানসিক যুদ্ধ।

ভিডিওতে দেখা যায়, টরন্টোর একটি পাবলিক প্লেসে প্রবাসী ভারতীয়রা দেশীয় পোশাক পরে, স্টল বসিয়ে গান-বাজনা ও নাচ-গানের মাধ্যমে একটি উৎসব উদযাপন করছেন। আপাতদৃষ্টে এটি একটি সাধারণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মনে হলেও, এক্স হ্যান্ডেলে এক ব্যবহারকারী ভিডিওটি শেয়ার করে ক্যাপশনে লেখেন, ‘কানাডা এখন পুরোপুরি একটি ভারতীয় কলোনিতে পরিণত হয়েছে... আমাদের নিজেদের দেশে আমরা এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারি না।’

ব্যস! এই একটি লাইনের পোস্ট মুহূর্তের মধ্যে পশ্চিমা নেটিজেনদের একাংশের মনে ‘সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব হারানোর ভয়’ জাগিয়ে তোলে। শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। উগ্র ডানপন্থী ও রক্ষণশীল সমালোচকরা ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলতে থাকেন— অভিবাসীরা কেন কানাডায় এসে কানাডিয়ান সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ না খাইয়ে নিজেদের দেশের সংস্কৃতি জোর করে চাপিয়ে দিচ্ছে? অনেকে তো এই ধরণের উৎসবের ওপর পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা জারিরও দাবি তোলেন।



তবে সমালোচকদের এই জেনোফোবিয়া বা বিদেশি-বিদ্বেষী আক্রমণের মুখে চুপ করে থাকেনি প্রবাসী ও উদারপন্থী কানাডিয়ানরা। লাখো আন্তর্জাতিক ব্যবহারকারী এই বর্ণবাদী মানসিকতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তারা মনে করিয়ে দেন যে, কানাডার মূল ইতিহাসটাই দাঁড়িয়ে আছে অভিবাসীদের ওপর।



অভিবাসীদের পক্ষে যুক্তি দিয়ে নেটিজেনরা বলেছেন, এই কঠোর পরিশ্রমী মানুষরা কানাডাকে বিপুল পরিমাণ ট্যাক্স বা রাজস্ব দেন এবং দেশের সবচেয়ে কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ শ্রম খাতের শূন্যতা পূরণ করে অর্থনীতি সচল রাখছেন। কেউ কেউ আবার অত্যন্ত সহজ ভাষায় প্রশ্ন তোলেন, ‘কয়েকজন মানুষ রাস্তায় একটু আনন্দ-ফুর্তি করছে, খাবার খাচ্ছে— এর মধ্যে এত হিংসা আর ঘৃণা ছড়ানোর কী আছে?’

 

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই ধরণের ভাইরাল বিতর্ক আসলে বর্তমান কানাডার একটি গভীর সামাজিক সংকটেরই বহিঃপ্রকাশ। সাম্প্রতিক সময়ে উন্নত দেশগুলোয় আবাসন সংকট, মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেওয়ায় স্থানীয় নাগরিকদের একটি বড় অংশ এর জন্য পরোক্ষভাবে অভিবাসীদের দায়ী করছেন। আর সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই বিস্ফোরণ ঘটছে এই ধরণের ছোটখাটো সাংস্কৃতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে।



কানাডা সরকার বরাবরই ‘মাল্টিকালচারালিজম’ বা বহু সংস্কৃতির মিলনমেলার পক্ষে কথা বললেও, টরন্টোর এই ভাইরাল নাচ প্রমাণ করে দিল যে— পর্দার আড়ালে দৃশ্যমান সংখ্যালঘু বা এশিয়ান কমিউনিটির প্রতি এক ধরণের গোপন বৈরিতা ও বর্ণবাদের চোরাস্রোত দিন দিন তীব্র হচ্ছে।