Image description
সুখবর এক্সপ্লেইনার

আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশত্যাগী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ প্রশ্নটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রায় দুই বছর ধরে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা এই বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর এক বক্তব্যে। তিনি দাবি করেছেন, দেশ ছাড়ার আগে শেখ হাসিনা তিন পৃষ্ঠার একটি পদত্যাগপত্র লিখেছিলেন এবং সেই পদত্যাগপত্র তিনি নিজের ভ্যানিটি ব্যাগে করে সঙ্গে নিয়ে গেছেন।

আজ রোববার ইউটিউবভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য পোস্ট’-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মতিউর রহমান চৌধুরী এই তথ্য প্রকাশ করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। তিনি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নিজের সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করে একটি দীর্ঘ চিঠি লিখেছিলেন। তবে গণভবনের বাইরে দ্রুত পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে টাইপ করা বা রাষ্ট্রপতির কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত খসড়া বা হস্তলিখিত সেই চিঠি তার ব্যক্তিগত ব্যাগেই থেকে যায়।

দেশের সাংবাদিকতায় মতিউর রহমান চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির অন্তরালের নানা তথ্য তুলে ধরার জন্য পরিচিত। ক্ষমতার পালাবদল, সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা এবং রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের নেপথ্য কাহিনি অনুসন্ধানে তার অভিজ্ঞতা ও সূত্রভিত্তিক প্রতিবেদনের একটি আলাদা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। ফলে তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গন এবং গণমাধ্যমে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে একই সঙ্গে প্রশ্নও উঠেছে—এই তথ্যের উৎস কী, এবং এর স্বাধীনভাবে যাচাই কতটা সম্ভব?

কারণ, মতিউর রহমান চৌধুরী তার বক্তব্যে তথ্যের উৎস প্রকাশ করেননি। তিনি ঘটনাটি বর্ণনা করলেও কোথা থেকে এই তথ্য পেয়েছেন বা সংশ্লিষ্ট কোনো প্রত্যক্ষদর্শী কিংবা সরকারি সূত্রের বরাত দেননি। ফলে এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলেও সাংবাদিকতার প্রচলিত মানদণ্ড অনুযায়ী এখনো তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

তবে এই বক্তব্য সম্পূর্ণ নতুন কোনো বিতর্ক তৈরি করেনি; বরং পুরোনো একটি সাংবিধানিক প্রশ্নকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। প্রশ্নটি হলো—শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেছিলেন কি না।

২০২৪ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, তিনি শুনেছেন শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন, কিন্তু তার কাছে কোনো পদত্যাগপত্র বা দালিলিক প্রমাণ নেই। রাষ্ট্রপতির ভাষ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বঙ্গভবনে জানানো হয়েছিল যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসবেন। পরে জানানো হয় তিনি আর আসছেন না। এরপর নানা সূত্রে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর পাওয়া যায়।

রাষ্ট্রপতি বলেন, তিনি সেনাপ্রধানের কাছেও জানতে চেয়েছিলেন পদত্যাগের বিষয়টি। সেখান থেকেও তিনি শুনেছিলেন যে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন, তবে কোনো আনুষ্ঠানিক কপি তার হাতে পৌঁছেনি।

রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্য প্রকাশের পর দেশে ব্যাপক রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। কারণ, সংবিধানের ৫৭(১)(ক) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা আছে, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির নিকট পদত্যাগপত্র প্রদান করলে তার পদ শূন্য হবে। অর্থাৎ কেবল পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ বা মৌখিক ঘোষণা নয়, রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র প্রদানই সাংবিধানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এখানেই মতিউর রহমান চৌধুরীর সাম্প্রতিক বক্তব্য নতুন তাৎপর্য সৃষ্টি করেছে। যদি সত্যিই শেখ হাসিনা একটি পদত্যাগপত্র লিখে থাকেন এবং সেটি তার ব্যক্তিগত ব্যাগে থেকে গিয়ে থাকে, তাহলে রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র না পৌঁছানোর ব্যাখ্যা আংশিকভাবে পাওয়া যায়। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতির পূর্ববর্তী বক্তব্যের সঙ্গেও একটি যৌক্তিক সংযোগ তৈরি হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে বিষয়টি আইনগতভাবে নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। কারণ সংবিধানের দৃষ্টিকোণ থেকে মূল প্রশ্ন থেকে যায়—রাষ্ট্রপতির নিকট পদত্যাগপত্র প্রদান করা হয়েছিল কি না।

অবশ্য আইন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ শুরু থেকেই বলে আসছেন, ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহকে শুধু সংবিধানের সাধারণ রাজনৈতিক রূপান্তরের কাঠামোর মধ্যে ব্যাখ্যা করা কঠিন। কারণ সেটি ছিল একটি অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সংকট। লাখো মানুষের অংশগ্রহণে সংঘটিত অভ্যুত্থান, প্রশাসনিক কাঠামোর দ্রুত পরিবর্তন এবং সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ হারানোর প্রেক্ষাপটে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল।

সেই কারণেই রাষ্ট্রপতি পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত নেন। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ মত দেন যে সাংবিধানিক শূন্যতা এড়াতে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা যেতে পারে এবং রাষ্ট্রপতি সেই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টাদের শপথ গ্রহণ করাতে পারেন। এই মতামতের ভিত্তিতেই পরবর্তীতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ভিত্তি তৈরি হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিতর্কের দুটি আলাদা মাত্রা রয়েছে। প্রথমটি রাজনৈতিক এবং দ্বিতীয়টি আইনি। রাজনৈতিকভাবে শেখ হাসিনা যে চব্বিশের ৫ আগস্ট ক্ষমতা ছেড়েছেন এবং দেশত্যাগ করেছেন, সে বিষয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু আইনি ও সাংবিধানিকভাবে পদত্যাগের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছিল কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের সাবেক একাধিক শিক্ষক অতীতে গণমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে বলেছেন, সাংবিধানিক পদত্যাগ এবং বাস্তব রাজনৈতিক ক্ষমতা ত্যাগ সবসময় একই বিষয় নয়। কোনো রাষ্ট্রনায়ক বাস্তবে ক্ষমতা হারাতে পারেন, কিন্তু সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রশ্নটি আলাদা থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ২০২৪ সালের আগস্টের ঘটনাবলি এই জটিল বাস্তবতারই একটি উদাহরণ।

তবে মতিউর রহমান চৌধুরীর আজকের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ঘটনাটির মানবিক ও নাটকীয় উপস্থাপন। তার বর্ণনা অনুযায়ী, গণভবনের পরিস্থিতি এতটাই দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছিল যে নিরাপত্তা কর্মকর্তারা শেখ হাসিনাকে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই স্থান ত্যাগের নির্দেশ দেন। সেই তাড়াহুড়োর মধ্যে তিনি নিজের ব্যাগও ফেলে গিয়েছিলেন এবং পরে একজন সেনা কর্মকর্তাকে সেটি এনে দিতে বলেন। এই বর্ণনা যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে সেটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতার স্বার্থে এটিও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে এখন পর্যন্ত শেখ হাসিনা নিজে, তার পরিবারের সদস্যরা, সাবেক মন্ত্রিসভার কোনো সদস্য, সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তা কিংবা রাষ্ট্রীয় কোনো প্রতিষ্ঠান এই পদত্যাগপত্রের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি। ফলে বিষয়টি এখনো মূলত একটি সূত্রনির্ভর দাবি হিসেবেই রয়ে গেছে।

দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে গবেষণা, অনুসন্ধান এবং তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের কাজ এখনো চলমান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন দলিল, সাক্ষ্য কিংবা প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ সামনে আসতে পারে। তখন হয়তো শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র সংক্রান্ত রহস্যের আরও নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে।

কিন্তু আপাতত বলা যায়, মতিউর রহমান চৌধুরীর নতুন বক্তব্য বহুদিনের একটি বিতর্ককে আবারও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। রাষ্ট্রপতির পূর্ববর্তী বক্তব্য, সংবিধানের বিধান এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে বিষয়টি নিছক রাজনৈতিক গুঞ্জন নয়; বরং দেশের সাংবিধানিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনিষ্পন্ন অধ্যায়। আর সেই অধ্যায়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি প্রশ্ন—শেখ হাসিনা কি সত্যিই তিন পৃষ্ঠার পদত্যাগপত্র লিখেছিলেন, এবং সেটি কি তার ভ্যানিটি ব্যাগেই দেশ ছাড়ে?