Image description

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা থাকাকালে কুমিল্লা জেলা পরিষদ থেকে ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন পরিষদের বর্তমান প্রশাসক মো. মোস্তাক মিয়া। একইসঙ্গে এনসিপি’র দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ নিয়েছেন বলে দাবি করেছেন তিনি। শনিবার কুমিল্লা শিল্পকলা একাডেমিতে বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা ও মহানগর বিএনপি এই কর্মসূচির আয়োজন করে। মোস্তাক মিয়া বিএনপি’র কুমিল্লা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিকের পদে রয়েছেন। জেলা পরিষদের প্রশাসকের এই বক্তব্যের পর এনসিপি’র দুই নেতার নামে এই অর্থ বরাদ্দ দিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যদিও এই দুই নেতা দাবি করেছে নিয়ম অনুযায়ী বরাদ্দ নিয়েছেন। যা এলাকার উন্নয়ন কাজে ব্যয় হয়েছে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জেলা পরিষদ প্রশাসক মোস্তাক মিয়া বলেন, আমার জেলা পরিষদ থেকে মুরাদনগরের আসিফ মাহমুদ ১৫ কোটি টাকা নিয়ে গেছেন। তিনি আমাদের নিজস্ব রাজস্বের টাকা ১৫ কোটি টাকা নিয়ে গেছেন। আরেকজন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি নিয়ে গেছেন ১০ কোটি টাকা। এটা হলো সমন্বয়কের অবস্থা। তারা চেয়েছিলেন যে, বাংলাদেশে বৈষম্যবিরোধী একটা সমন্বয়ের রাজনীতি, কিন্তু তাদের মধ্যে সেটা ছিল না।

তিনি বলেন, আজ বাংলাদেশ সরকার আপনাদের ভোটে নির্বাচিত। জনগণের ভোটে নির্বাচিত আমাদের প্রিয় নেতা তারেক রহমান আজ প্রধানমন্ত্রী, তিনি এই সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ধ্বংস হওয়া অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের জন্য আমাদের প্রিয় নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কাজ করছেন। তার কাঁধে দায়িত্বে পড়েছে- যেই অর্থনীতি ধ্বংস করেছিল, এটাকে পুনরুদ্ধারের জন্য।

এ বিষয়ে মোস্তাক মিয়া গণমাধ্যমকে বলেছেন, আমি বলছি না ওই টাকা তারা ব্যক্তিগতভাবে নিয়েছেন। তারা দু’জনই নিজেদের উপজেলায় বিশেষ বরাদ্দ বা উন্নয়ন বরাদ্দের নামে বিপুল পরিমাণ ওই টাকা নিয়ে অন্যান্য উপজেলাগুলোকে বঞ্চিত করেছে; আমি সেটি বোঝাতে চেয়েছি। কারণ আসিফ মাহমুদ আর হাসনাত আবদুল্লাহ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন করেছিলেন। কিন্তু তারাই অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিশেষ বরাদ্দ নিয়ে বাকি উপজেলাগুলোকে বঞ্চিত করেছে। এই কারণে অন্যান্য উপজেলাগুলো বৈষম্যের শিকার হয়েছে। ওই অর্থবছরে জেলার বাকি উপজেলাগুলো সেই অর্থে কোনো বরাদ্দই পাইনি। আমি এই বিষয়টি বোঝাতে চেয়েছিলাম।

জেলা পরিষদের হিসাব বিভাগ সূত্র জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিশেষ বরাদ্দে ওই টাকা গেছে মুরাদনগর ও দেবীদ্বার উপজেলায়। এই দুই উপজেলার মধ্যে মুরাদনগর আসিফ মাহমুদের বাড়ি এবং দেবীদ্বার হাসনাত আবদুল্লাহর বাড়ি। একই অর্থবছরে মুরাদনগর ও দেবীদ্বার উপজেলার বাইরে এক কোটি টাকার মতো বরাদ্দ পেয়েছিল চৌদ্দগ্রাম উপজেলা। জেলার ১৭টি উপজেলার মধ্যে অন্যান্য উপজেলাগুলো ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেভাবে তেমন বরাদ্দ পায়নি।
তবে অভিযোগটি প্রত্যাখ্যান করেছেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, দেবীদ্বার উপজেলায় উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ওই অর্থ বরাদ্দ ছিল। জেলা পরিষদের প্রশাসক যে টাকার কথা বলেছেন, তা ওই উপজেলার বাজেট বরাদ্দ ছিল। এটি স্থানীয় সরকার বিভাগের বিশেষ বরাদ্দ, যা জেলা পরিষদের মাধ্যমে ব্যয় করা হয়েছে। এটি আমাকে ব্যক্তিগতভাবে দেয়া হয়নি।

হাসনাত আবদুল্লাহ আরও বলেন, কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসক তার বক্তব্য পরিবর্তন করেছেন। ‘হাসনাত ব্যক্তিগতভাবে টাকা নিয়েছেন’- এমন কথা বলেননি বলে জানিয়েছেন। এদিকে হাসনাত আবদুল্লাহর সঙ্গে এক ফোনালাপে মোস্তাক মিয়াকে বলতে শোনা যায়, জেলা পরিষদের মাধ্যমে ওই টাকা আপনার এলাকার উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করা হয়েছে। মোস্তাক মিয়া বলেন, না, না, রাজস্ব তহবিল থেকে নয়, সব তহবিল মিলিয়ে টাকাটা আমার জেলা পরিষদের মাধ্যমে আপনাদের এলাকায় গেছে। আমি বলতে চেয়েছি, আপনারা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন করেছেন। এখন আপনার উপজেলায় গেছে ১০ কোটি। আর ওইখানে গেছে ১৫ কোটি। আপনি টাকা খাইছেন এটা আমি বলি নাই। আমি বলেছি, আপনারা (হাসনাত ও আসিফ) দুই উপজেলায় উন্নয়ন কাজের জন্য ২৫ কোটি টাকা নিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, আমার বক্তব্যের পুরো অংশ হয়তো গণমাধ্যমে আসেনি।

মোস্তাক আবারো বলেন, আমি আপনার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তুলিনি। আমি বলিনি আপনি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। আমি বলেছি, আপনার এলাকায় কাজের জন্য আপনি নিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, দেবীদ্বারে ৪২টি উন্নয়ন কাজের জন্য ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। এই টাকা এডিপি প্রকল্পের মাধ্যমে দেয়া হয়েছে। এর সঙ্গে জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিলের কোনো সম্পর্ক নেই। রাজস্ব তহবিল ও বিশেষ বরাদ্দের পার্থক্য বুঝলে জেলা পরিষদের প্রশাসক এমন মন্তব্য করতেন না। তিনি এমনভাবে কথা বলেছেন যেন আমরা নিজেরাই টাকা আত্মসাৎ করেছি। বাস্তবে দেবিদ্বারের বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। এনসিপি’র এই নেতা বলেন, এই অভিযোগ বিভ্রান্তিকর এবং জনসাধারণের অর্থ ব্যবহারের বিষয়ে ভুল ধারণা তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, অর্থটি প্রকল্পভিত্তিক ছিল এবং জেলা পরিষদের সরকারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যয় করা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করা হয়নি।
অন্যদিকে এ বিষয়ে শনিবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড পেজে লাইভে এসে ব্যাখ্যা দিয়েছেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।

তিনি বলেন, একটা বিষয় হয়তো আপনারা সবাই শিরোনামে দেখছেন যে, ২৫ কোটি টাকা নিয়ে গেছেন আসিফ মাহমুদ এবং হাসনাত আবদুল্লাহ। এর মধ্যে ১৫ কোটি নিয়ে গেছেন আসিফ মাহমুদ আর ১০ কোটি নিয়ে গেছেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তো শিরোনাম দেখে আবার সবাই একটু প্যারা খেতে পারেন। যেমন- ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছেন তারেক রহমান। এটা অনেকটা এ রকমই, আগামী দিনে আমরা শুনছি যে বাজেট ধরা হবে বা প্রস্তাবিত বাজেটটা আসবে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার। এটা তো সরকার বরাদ্দ করছে যে, এক বছরে এই বাজেট তারা নির্দিষ্ট কিছু খাতে খরচ করবে। সেটা যদি এখন আমি বলি যে, ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছেন তারেক রহমান, এমনভাবে বলা যে তার মানে পকেটে করে নিয়ে যাচ্ছেন, তাহলে এটা যেমন হাস্যকর এবং মানহানিকর শোনাবে, ঠিক একই রকম একটা স্টেটমেন্ট আজকে কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসকের পক্ষ থেকে এসেছে।

এনসিপি’র এই নেতা বলেন, কুমিল্লার প্রশাসক প্রথমত একেবারেই কাঁচা একটা মিথ্যা কথা বলেছেন। সেটি হচ্ছে রাজস্ব খাত। রাজস্ব খাত থেকে কারও এলাকায় কোনো ধরনের বরাদ্দ নিয়ে যাওয়ার কারও কোনো সুযোগ নেই। রাজস্ব খাতের বাজেট বছরের শুরুতেই জেলা পরিষদ ঠিক করে যে, তারা কোথায় কতোটুকু খরচ করবে। এটা মূলত এডিপি’র বিশেষ বরাদ্দ। তো উনি এটাকে রাজস্ব খাতের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছেন। এই বিশেষ বরাদ্দটা সাধারণত ১০০ থেকে ১২৫ কোটি টাকার মতো হয়। এই বরাদ্দ দেয়ার এখতিয়ারটা মন্ত্রী বা উপদেষ্টার হাতে থাকে। আমি যখন দায়িত্বে ছিলাম, স্বাভাবিকভাবেই আমি সারা দেশে এটা দিয়েছি। এটার চর্চা হচ্ছে অনুরোধ বা আবেদনের ভিত্তিতে। আপনারা অনেকেই অনেক আবেদন করেন যে আমাদের গ্রামের এই রাস্তাটা করা খুব প্রয়োজন। সেই আবেদনগুলো উপজেলা বা ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে আসে। মন্ত্রণালয় এগুলো আর্কাইভ করে এবং উপদেষ্টা বা মন্ত্রী সেই আর্কাইভ থেকে বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেন। বরাদ্দ দেয়া মানেই শেষ না। বরাদ্দ দেয়ার পরও ওই জেলার প্রশাসক বা চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে একটি কমিটি বসে ঠিক করে যে এই টাকাটা কোন কোন খাতে খরচ করা হবে।

এনসিপি’র মুখপাত্র আরও বলেন, বাজেট বরাদ্দ দেয়াকে যদি নিয়ে যাওয়া বলা হয়, তবে এটা খুবই ইন্টারেস্টিং। বিএনপি’র একজন প্রশাসক আসলে নিয়ে যাওয়া এবং বরাদ্দ দেয়ার মধ্যে পার্থক্য বোঝেন না। এসএসসি পাস কাউকেও যদি এই দায়িত্ব দেয়া হয়, তিনিও বুঝবেন রাজস্ব খাত আর বিশেষ বরাদ্দ খাতের পার্থক্য কী। এই খরচের প্রক্রিয়ার সঙ্গে উপদেষ্টা হিসেবে আমার বা হাসনাত আবদুল্লাহর সংশ্লিষ্টতার কোনো সুযোগ নেই। এটা জেলা পরিষদ ডিসি’র সভাপতিত্বে সভায় সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং ই-টেন্ডারের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
আসিফ মাহমুদ বলেন, এটা এক ধরনের হ্যারাসমেন্ট এবং মানহানি। আমি আশা করবো কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসক তার বক্তব্য পরিষ্কার করবেন। অন্যথায় আইনি ব্যবস্থার দিকে যেতে হবে।

শনিবার নিজের ফেসবুকে বিএনপি নেতা মুহাম্মদ রাশেদ খান বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ নিজ উপজেলা মুরাদনগরের উন্নয়নে (৪৫৩ কোটি টাকা) বরাদ্দ নেন এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ নেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ। তার উপজেলা দেবীদ্বারে সর্বোচ্চ (৩৩৮ কোটি টাকা) বরাদ্দ হয়। আজকে তথ্য পাওয়া গেল জেলা পরিষদের মাধ্যমে নিজ উপজেলায় আসিফ মাহমুদ বরাদ্দ নেন ১৫ কোটি আর হাসনাত আবদুল্লাহ বরাদ্দ নেন ১০ কোটি!

হাসনাত আবদুল্লাহ তো সরকারে ছিল না উল্লেখ করে তিনি বলেন, কিন্তু এত বরাদ্দ কীভাবে পেলো? অন্য কোনো দলের নেতা কি এমন বরাদ্দ পেয়েছিল? না, পায়নি। এক্ষেত্রে সরকার ঘনিষ্ঠ হওয়ায় হাসনাত আবদুল্লাহর মতো এনসিপি’র শীর্ষ নেতারাও নিজ নিজ এলাকায় বরাদ্দ নেন। অন্য এলাকার মানুষকে উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত করে ইলেকশন ক্যাম্পেইনের জন্য শুধুমাত্র নিজ এলাকায় এমন বরাদ্দ নেয়া নৈতিক অধঃপতন নয় বরং বড় ধরনের অপরাধ। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন করেও আসিফ মাহমুদ ও হাসনাত আবদুল্লাহরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে এমন বৈষম্য করেছে। ভোট করার জন্য অন্য এলাকায় উন্নয়নের চিন্তা করেনি, তাকিয়েছে শুধুমাত্র নিজেদের দিকে। এটাই বড় ধরনের লুটপাট ও দুর্নীতি।