Image description

প্রায় সাতশ’ কেজি ওজনের অ্যালবিনো প্রজাতির মহিষটি ঘিরে ঈদুল আজহার আগে থেকেই আলোচনা। আলোচনার কেন্দ্রে ছিল এর ‘নাম’। গায়ের রং, চোখ, মাথার পশম যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের অবয়বের সঙ্গে সদৃশ হওয়ায় মহিষটির নাম দেয়া হয় ‘ডনাল্ড ট্রাম্প’। এরপর এটি বিক্রিও হয় কোরবানির জন্য। মহিষটিকে নিয়ে দেশীয় গণমাধ্যমে আসার খবর ছড়ায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও। বিষয়টি কূটনৈতিক দুনিয়ায় দৃষ্টিকটু হওয়ায় মহিষটিকে কোরবানি দেয়ার আগেই উদ্যোগী হয় সরকার। বিরল প্রজাতির উল্লেখ করে মহিষটি জব্দ করে প্রথমে নেয়া হয় থানায়। এরপর এর ঠিকানা হয় জাতীয় চিড়িয়াখানায়। কূটনীতির জটিল অঙ্ক এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারতো।

কিন্তু তা আরও দীর্ঘ করলো জাতীয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। মহিষটিকে সেখানে নেয়ার পর তার পরিচিতি বোর্ডে ‘সাদা মহিষ’ এর নিচে জুড়ে দেয়া হয় ‘ডোনাল্ড ট্টাম্প’ শব্দ। ট এর নিচে ট যুক্ত এই বানান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় নতুন করে হইচই। শুধু কি বানান? একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানে রাখা একটি পশুর নাম কোনো দেশের প্রেসিডেন্টের নাম বোর্ডে লাগানো নিয়েও কেউ কেউ সমালোচনা করেন। এই লঙ্কাকাণ্ডের জের ধরে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে জাতীয় চিড়িয়াখানার কিউরেটরকে।

চার বছর বয়সী মহিষটি গোলাপি সাদা রঙ। মাথার সামনের চুল সোনালি। মহিষটি বেড়ে উঠেছে নারায়ণগঞ্জ শহরের পাইকপাড়া জিয়াউদ্দিন মৃধার রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্মে। খামারিরা মহিষটির অসাধারণ চুল দেখে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নাম অনুসারে এর নাম রাখেন। পরে ঈদুল আজহাকে ঘিরে ভাইরাল হয় মহিষটি। প্রাণীটির ভিডিও ও ছবি বিভিন্ন মাধ্যমে দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পায়। জিয়াউদ্দিন মহিষটি বিক্রি করেছিলেন কেরানীগঞ্জের জিনজিরার মনিরুজ্জামানের কাছে।

গত সোমবার তিনি খামার থেকে মহিষটিকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। সে সময় খামারে লালগালিচা বিছিয়ে, রঙিন ধোঁয়া উড়িয়ে ও রাজকীয় সাজ-সজ্জায় মাহিষটিকে বিদায় জানানো হয়। বুধবার রাতে সরকারের সিদ্ধান্তে মহিষটিকে জাতীয় চিড়িয়াখানায় স্থানান্তর করা হয়। এরপর থেকে দূর-দূরান্ত থেকে আসা দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীদের ছিল আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। ‘এল-০৭’ নম্বর ব্লকে রাখা হয় তাকে। চিড়িয়াখানায় প্রদর্শনের সময় পরিচিতি ফলকে ‘ডনাল্ড ট্রাম্প’ এর পরিবর্তে ‘ডোনাল্ড ট্টাম্প’ লেখা হলে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়। আবারো ভাইরাল হয় মহিষটি। সমালোচনার মুখে পড়ে ফলক পরিবর্তন করা হয় এবং মহিষটির নাম ‘সাদা মহিষ’ হিসেবে প্রদর্শন শুরু হয়। নাম প্রদর্শনসহ বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং পরে সরকারের উচ্চপর্যায় পর্যন্ত গড়ায়। শুধু বানান ভুল নয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নামে একটি মহিষের নাম সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রদর্শনী বোর্ডে বহাল রাখা নিয়েও আপত্তি ওঠে।

সাময়িক বরখাস্ত চিড়িয়াখানার কিউরেটর: জাতীয় চিড়িয়াখানায় রাখা সেই আলোচিত মহিষ ‘ডনাল্ড ট্রাম্প’ এর নাম প্রদর্শন এবং পরে সেই নামের বানান ভুল লেখার ঘটনায় একইসঙ্গে বিসিএস (পশুপালন) ক্যাডারের কর্মকর্তা ও জাতীয় চিড়িয়াখানার কিউরেটর ডা. মো. আতিকুর রহমানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। শনিবার বিকালে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বিসিএস (পশুপালন) ক্যাডারের কর্মকর্তা ও জাতীয় চিড়িয়াখানার কিউরেটর ডা. মো. আতিকুর রহমানের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এবং সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্তকালীন সময়ে তিনি বিধি অনুযায়ী খোরপোষ ভাতা পাবেন। তবে প্রজ্ঞাপনে অভিযোগের প্রকৃতি উল্লেখ করা হয়নি।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পৃথক এক প্রজ্ঞাপনে ডা. মো. আতিকুর রহমানকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (সমমান) পদে বদলি করা হয়। তাকে লিভ, ডেপুটেশন অ্যান্ড ট্রেনিং রিজার্ভে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। একই প্রজ্ঞাপনে ডা. মো. হাবিবুর রহমানকে জাতীয় চিড়িয়াখানার নতুন কিউরেটর হিসেবে পদায়ন করা হয়।

মহিষটিকে জাতীয় চিড়িয়াখানায় হস্তান্তরের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেসসচিব কে এম নাজমুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, এই মহিষটি নিয়ে মানুষের মনে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছিল। এ ছাড়া এটি একটি ‘রেয়ার ব্রিড’ হওয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে সংরক্ষণের বিষয়টিতে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, পশুটি কিনে নেয়া হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু প্রাণীটির যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিচর্যার বিষয়টি দেখভালের জন্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এক বিবৃতিতে বলেন, অ্যালবিনো মহিষটি বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের ইতিহাসে ব্যতিক্রমধর্মী হওয়ায় সংরক্ষণের জন্য জাতীয় চিড়িয়াখানায় নেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মহিষটিকে প্রদর্শনীর জন্য নয়, বরং গবেষণার জন্যই চিড়িয়াখানায় সংরক্ষণ করা হয়েছে। এই মহিষের যে ক্যারেক্টারগুলো, তা আমরা স্টাডি করে দেখতে চাই। এ ছাড়া এই মহিষের মধ্যে কোনো অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আছে কি না, যেটি কাজে লাগিয়ে মহিষের জাত উন্নয়নে কোনো গবেষণা করা যায় কি না সেটি দেখাও আমাদের একটি উদ্দেশ্য।’

প্রাণিসম্পদ গবেষণা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে অ্যালবিনো মহিষ খুব বেশি দেখা যায় না। কেবল ব্যক্তিগত কিছু খামারেই অ্যালবিনো মহিষ লালন-পালন করা হয়।

রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্মের কর্মচারী মাসুদুর রহমান বিবিসি বাংলাকে জানান, ‘ডনাল্ড ট্রাম্প’ নামে পরিচিতি পাওয়া এই মহিষটিসহ ছয়টি অ্যালবিনো মহিষ ছিল তাদের কাছে। ঈদের আগে সবকটিই বিক্রি হয়ে গেছে। তিনি জানান, তারা রাজশাহীর সিটি হাট থেকে এই মহিষগুলো কিনেছিলেন, এগুলোর অরিজিন সম্পর্কে, অর্থাৎ কোথায় জন্ম বা কোন জায়গা থেকে এসেছে সে ব্যাপারে তাদের কোনো ধারণা নেই।