Image description
চামড়ার বাজারে ধস

পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছরের মতো এবারও কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করেছে সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন কওমি, হাফেজিয়া ও এতিমখানা মাদ্রাসা। কিন্তু চামড়া সংগ্রহের পর এবার চরম নিয়ে বিপাকে পড়েছেন এসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলরা। বাজারে চামড়ার দাম কমে যাওয়া, সংরক্ষণ ব্যয় বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট এবং ক্রেতার অভাবে তারা চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।

অনেক মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ বলছেন, এতিম ও অসহায় শিক্ষার্থীদের সহযোগিতার আশায় চামড়া সংগ্রহ করলেও এখন সেই চামড়াই তাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিক্রি করতে না পারলে চামড়াগুলো পচে যাওয়ার শঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে চামড়া সংগ্রহ করতে পরিবহন, শ্রমিক ও লবণ বাবদ প্রতি পিস চামড়ায় ১৩০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। অথচ বর্তমানে বাজারে অনেক জায়গায় সেই চামড়ার দাম খরচের সমান কিংবা তার চেয়েও কম পাওয়া যাচ্ছে। ফলে চামড়া বিক্রি নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছে মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো।

ইসলামিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার সিনিয়র মুহাদ্দিস মাওলানা জসিম উদ্দিন আমার দেশকে বলেন, আমরা সীতাকুণ্ড পৌরসভা ও বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে প্রায় ১ হাজার চামড়া সংগ্রহ করেছি। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে প্রতি পিস ২০০ টাকা করে বিক্রি করেছি।

তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম শহরের কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো সাড়া পাইনি। পরে পন্থিছিলা এলাকার চামড়া ব্যবসায়ী রমজানের কাছে চামড়াগুলো কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হই। এই আয় আমাদের এতিম শিক্ষার্থীদের লিল্লাহ ফান্ডে ব্যয় করা হয়।

সীতাকুণ্ড পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের তাহফিজুল কোরআন মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রিন্সিপাল ইলিয়াস হুজুর আমার দেশকে বলেন, প্রতি পিস চামড়া সংগ্রহে প্রায় ১৩০ টাকা খরচ হয়। এরপর লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করতে প্রতিটি চামড়ার পেছনে ২ শত টাকা খরচ হয়। সর্বমোট প্রায় সাড়ে ৩ শত টাকা পর্যন্ত ব্যয় পড়ে যায়।

তিনি আরও বলেন, আমরা ৪ শত চামড়া সংগ্রহ করেছি। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুই টন লবণ দেওয়া হলেও জনবল সংকটের কারণে সব চামড়ায় লবণ দেওয়া সম্ভব হয়নি। রাত ৯টা পর্যন্ত বাজারে বসে থেকেও কোনো ক্রেতা পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত আমরা উল্টো বিপদে পড়ে গেছি।

ফকিরহাট পূর্ব মুরাদপুর এলাকার মহিউস সুন্নাহ মডেল মাদ্রাসা ও এতিমখানার শিক্ষক মাওলানা মো. আনোয়ার হোসাইন আমার দেশকে বলেন, আমরা ৭০টি চামড়া সংগ্রহ করেছি। কিন্তু এখন বিক্রি করতে না পেরে চরম দুশ্চিন্তায় আছি। আসলে চামড়াগুলো নিয়ে আমরা উল্টো বিপদে পড়েছি।

সীতাকুণ্ড উপজেলা প্রশাসনের একাউন্ট্যান্ট সাঈদ ভূঁইয়া আমার দেশকে বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পৌরসভার তিনটি এবং বাঁশবাড়িয়া বোয়ালিয়াকুল মাদ্রাসাসহ মোট চারটি মাদ্রাসায় ২৫ টন লবণ বিতরণ করা হয়েছে। বোয়ালিয়াকুল মাদ্রাসায় ২ শতাধিক এবং তাহফিজুল কোরআন মাদ্রাসা ও এতিমখানায় প্রায় ৪ শতাধিক চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে। এছাড়া মদিনাতুল উলুমসহ আরও একটি মাদ্রাসায় প্রায় ১ হাজার ৬০০ চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিবছর কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রির অর্থ কওমি মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক উৎস। এই অর্থ দিয়ে এতিম ও অসহায় শিক্ষার্থীদের খাবার, পোশাক ও শিক্ষার ব্যয় নির্বাহ করা হয়। কিন্তু কয়েক বছর ধরে চামড়া শিল্পের অস্থিরতা, বাজারে ক্রেতা সংকট এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো কাঙ্ক্ষিত মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

মাদ্রাসার শিক্ষকেরা আমার দেশকে বলেন, শুধু লবণ সহায়তা নয়, সরকারিভাবে দ্রুত চামড়া সংগ্রহ, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং ট্যানারিগুলোর সঙ্গে সরাসরি সমন্বয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি। তা না হলে ভবিষ্যতে চামড়া সংগ্রহে আগ্রহ হারাবে মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো।