Image description
ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়

ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে নাড়ির টানে ঢাকা ছাড়ছে মানুষজন। বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট, রেলওয়ে স্টেশনসহ ঢাকার প্রবেশমুখগুলোতে বেড়েছে যাত্রীদের চাপ। কোথাও কোথাও দেখা গেছে উপচে পড়া ভিড়। হঠাৎ বৃষ্টি, যানজট আর ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি। ঢাকার প্রবেশমুখে গাজীপুরের ৪০ শতাংশ শিল্পকারখানা ছুটি ঘোষণা করে সোমবার। ফলে গাজীপুরের চন্দ্রা এলাকায় মানুষের ঢল নামে। এতে গাজীপুরের ঢাকা-টাঙ্গাইল ও চন্দ্রা-নবীনগর মহাসড়কে তৈরি হয় ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট।

বাস টার্মিনালে বেড়েছে যাত্রীদের চাপ
এদিকে গতকাল সকালের আবহাওয়া ভালো থাকলেও দুপুরের বৃষ্টি ঈদযাত্রায় বিড়ম্বনা তৈরি করেছে। দুপুরে যাদের ঢাকা ছাড়ার কথা ছিল বৃষ্টি তাদের যাত্রার শুরুতেই বিলম্ব ঘটায়। বাস টার্মিনালগুলো থেকে নির্দিষ্ট সময়ে বাস ছেড়ে যেতে পারেনি। আবার বাস ভাড়াও নিচ্ছে বেশি। সকাল থেকে বাস টার্মিনালে যাত্রীর তেমন চাপ না থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীদের ভিড় বাড়তে থাকে। মহাখালী বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায়, ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর, নেত্রকোনা ও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে যাত্রীদের দীর্ঘ লাইন। কাউন্টারগুলোর সামনে উপচে পড়া ভিড় থাকলেও তুলনামূলকভাবে বাসের সংখ্যা কম। একটি বাস ছাড়ার পর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে পরবর্তী বাসের জন্য।

এদিকে যাত্রাবাড়ী ও সায়েদাবাদে দক্ষিণাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলগামী পরিবহনে যাত্রীচাপ তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কাঙ্ক্ষিত বাসে উঠতে পারছেন না অনেকে। এদিকে অতিরিক্ত যাত্রীর সুযোগ নিয়ে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের বিরুদ্ধে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। সায়েদাবাদ এলাকায় বরিশালগামী এক যাত্রী বলেন, সাধারণ সময়ে যেখানে ভাড়া ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, সেখানে এখন ৭০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত নেয়া হচ্ছে। বেশির ভাগ বাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।

গাজীপুরের দুই মহাসড়কে ভোগান্তি
এদিকে গাজীপুরের ৪০ শতাংশ শিল্প কারখানা ছুটি ঘোষণা করায় ঘরমুখী মানুষের ঢল নেমেছে গাজীপুরের চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায়। এতে গাজীপুরের ঢাকা-টাঙ্গাইল ও চন্দ্রা-নবীনগর মহাসড়কে দেখা দিয়েছে ১৫ কিলোমিটার যানজট। এদিকে থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে দুর্ভোগ বেড়েছে আরও কয়েকগুণ। বিকাল ৪টায় সরজমিন ঘুরে দেখা যায়, চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকাকে কেন্দ্র করে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের সফিপুর থেকে চন্দ্রা উড়াল সড়ক এবং চন্দ্রা-নবীনগর সড়কের কবিরপুর থেকে চন্দ্রা ত্রিমোড় পর্যন্ত উত্তরবঙ্গগামী লেনে যানজট দেখা গেছে। তবে, এই যানজট নিরসনে হাইওয়ে ও ট্রাফিক পুলিশের শতাধিক পুলিশ সদস্যকে টহল দিতে দেখা গেছে। যানজটের তীব্রতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাওয়ার চিত্রটি দেখা যাচ্ছে। যানজটের কবলে থাকা পরিবহন ও যাত্রীরা থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে আরও দুর্ভোগে পড়েছে।

কমলাপুরে ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়
সোমবার সকালে সরজমিন কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, শুরুতে বাঁশের তৈরি বিশেষ চেকিং এলাকা পার হতে হচ্ছে। পরে প্ল্যাটফরমে প্রবেশের আগে আবারো টিকিট পরীক্ষা করছেন টিটিরা। প্ল্যাটফরমে তিনটি ট্রেন যাত্রীদের জন্য অপেক্ষা করছে। এরমধ্যে রয়েছে, রংপুরগামী রংপুর এক্সপ্রেস, কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াগামী তিতাস কমিউটার। যাত্রীরা ট্রেনে উঠার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তবে অনেক যাত্রীই আগে আগে স্টেশনে পৌঁছে গেছেন। এ ছাড়া পরবর্তী ট্রেনগুলোর জন্য নির্দিষ্ট সময়ের আগেই যাত্রীরা প্ল্যাটফরমে অপেক্ষা করছিলেন। প্ল্যাটফরমে থাকা ট্রেনগুলো চলে গেলে স্টেশন কিছুটা ফাঁকা হয়ে যায়। তবে, সোমবার সকাল থেকে ৫টি ট্রেনে শিডিউল বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটে। ফলে ভোগান্তিতে পড়ে যান ওইসব ট্রেনের যাত্রীরা।

সকাল ৬টার ধূমকেতু এক্সপ্রেস আধা ঘণ্টা পিছিয়ে সকাল সাড়ে ৬টায়; সকাল ৬টা ৪৫ মিনিটের নীলসাগর এক্সপ্রেস দীর্ঘ বিলম্বের পর সকাল ৮টা ১০ মিনিটে কমলাপুর রেলস্টেশন ছেড়ে যায়। অন্যদিকে, রংপুর এক্সপ্রেস সকাল ৯টা ১০ মিনিটে ছাড়ার কথা থাকলেও সেটির সম্ভাব্য সময় বেঁধে দেয়া হয় সকাল ১০টা ৪৫ মিনিট। ব্রাহ্মণবাড়িয়াগামী তিতাস কমিউটার ট্রেন ৯টা ৪৫ মিনিটে ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও সেটির বিলম্বিত শিডিউল দেয়া হয়েছে সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে। এ ছাড়া সকাল ১০টা ১৫ মিনিটের একতা এক্সপ্রেস ট্রেনটি সকাল সাড়ে ১০টা পার হয়ে গেলেও তখন পর্যন্ত প্ল্যাটফরমেই পৌঁছায়নি।

রংপুর এক্সপ্রেসের যাত্রী মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, স্ত্রী-সন্তানদের আগেই পাঠিয়ে দিয়েছি। গতকাল অফিস শেষ করেই চলে যেতাম। কিন্তু সময় মেলেনি। আজ ১ ঘণ্টা আগে স্টেশনে এসেছি। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও ট্রেনের দেখা পাচ্ছি না। জয়ন্তিকা এক্সপ্রেসের যাত্রী সিহাব বলেন, ঢাকা শহরের রাস্তাঘাটের বিশ্বাস নেই। তাই নির্দিষ্ট সময় থেকে ৩ ঘণ্টা বাড়তি সময় হাতে নিয়েই বাসা থেকে বের হয়েছি। ১১টা ১৫ মিনিটে ট্রেন ছাড়বে। অন্য ট্রেন ছাড়তে বিলম্ব করেছে। এজন্য শঙ্কায় আছি।

ওদিকে, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বৃষ্টি শুরু হলে বিপাকে পড়ে যান স্টেশনে আসা যাত্রীরা। স্টেশনে অপেক্ষা করলে দেখা যায়, নির্দিষ্ট সময়ের আগেই যারা চলে এসেছেন, তারা প্ল্যাটফর্ম ও অপেক্ষাগারে অপেক্ষা করতে পারলেও বৃষ্টির সময় অনেক যাত্রীই পড়ে যান বিপাকে। স্টেশনের ভেতরে নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মের বাইরে খোলা জায়গাগুলোর বিভিন্ন স্থানে পানি জমতে শুরু করে। কমলাপুর রেলস্টেশনের সামনে পুরোটাই পানিতে ডুবে যায়। মেট্রোরেলের নির্মাণ এলাকায় কাদা-পানিতে স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে যায়। বৃষ্টির সময় বেশির ভাগ যাত্রীই কাদা আর বৃষ্টি মাথায় নিয়েই আসেন স্টেশনে। অন্তত দেড় থেকে ২ ঘণ্টা স্থায়ী হয় বৃষ্টি। সমগ্র রাজধানীজুড়েই একই চিত্র। টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। অনেক সড়কে পানি জমে যান চলাচল ধীর হয়ে পড়ে। নিচু এলাকার বিভিন্ন সড়কে হাঁটুসমান পানি জমে যায়।

প্রবল বৃষ্টিতে সিএনজি থেকে নামছেন সরকারি চাকুরে নাসিম। সঙ্গে দুই সন্তান ও স্ত্রী। তিনি কালনী এক্সপ্রেসের যাত্রী। নাসিম বলেন, মোহাম্মদপুর থেকে আসছি। শুরুতে কালো মেঘ ছিল। ভাবলাম বৃষ্টির আগেই পৌঁছাতে পারবো। কিন্তু গাড়িতে উঠার আধাঘণ্টার মধ্যেই প্রবল বর্ষণ শুরু হয়। কিছুক্ষণ বৃষ্টি হওয়ার সঙ্গেই আসার পথের অনেক জায়গায় পানি উঠে যায়। সিএনজি নিলেও রাস্তায় পানি আর যানজটে মিলিয়ে নাকাল পরিস্থিতিতে পড়ে গেলাম। ধুমকেতু এক্সপ্রেসের যাত্রী সাইফুল বলেন, আমি বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগেই স্টেশনে পৌঁছে গেছি। তবে, প্রবল বৃষ্টিতে শংকায় আছি, ট্রেন আদৌ কী নির্দিষ্ট সময়ে ছাড়বে কি না। আজিমপুর থেকে আসা নাসিরুদ্দিন নামের আরেক যাত্রী বলেন, এমনিতেই পুরো পথে ভিজে যবুথবু অবস্থা। তার উপর স্টেশন এলাকাকায় এসে জুতা-মোজা সব ভিজে গেছে। এখন সারা শরীরই ভেজা। ট্রেন ছাড়তে অন্তত ১ ঘণ্টা বাকি। এই সময়ের মধ্যে শুকানোর চেষ্টা করবো।

সোমবার সকাল ১১টার দিকে কমলাপুর রেলস্টেশনের স্টেশন ম্যানেজার মো. কবীর উদ্দীন বলেন, আজ সকাল থেকে এই পর্যন্ত (বেলা ১১টা) ১৫টা আন্তঃনগর ট্রেন স্টেশন ছেড়ে গেছে। তার মধ্যে একাধিক ট্রেন বিলম্বে গেছে। এরমধ্যে নীলসাগর এক্সপ্রেস ৪০ মিনিট বিলম্বে স্টেশন ছেড়েছে। ওই ট্রেন বিলম্বেই এসেছে। রংপুর এক্সপ্রেস ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট বিলম্বে ছেড়েছে। কমলাপুর থেকে আজ ৪৩টি আন্তঃনগর ট্রেন ছেড়ে যাবে। ২৩টি কমিউটার ট্রেন ছেড়ে যাবে এবং একটা ঈদ স্পেশাল ট্রেন ছেড়ে গেছে ঢাকা থেকে দেওয়ানগঞ্জ পর্যন্ত। মোট ৬৭টি ট্রেন কমলাপুর স্টেশন থেকে ছেড়ে যাবে আজ। ট্রেনের সিডিউল বিলম্ব হওয়ার কারণ জানিয়ে কবীর উদ্দীন বলেন, রেললাইনের ওপরে যে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা আছে, যেমন খড় থাকে বা মানুষের বিভিন্ন জিনিসপত্র পড়ে থাকে। ফলে সেকশনাল স্পিড ধরে রাখতে সমস্যা হচ্ছে। এজন্য ট্রেন পৌঁছাতে বিলম্ব হয়েছে। আশা করি আগামীকাল থেকে এটা ঠিক হয়ে যাবে।

নারীদের জন্য ট্রেনে যুক্ত হলো বিশেষ কোচ
কোরবানির ঈদ উপলক্ষে ট্রেনে নারী যাত্রীদের জন্য বিশেষ কোচ যুক্ত করেছে রেলওয়ে। সোমবার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে ছেড়ে যাওয়া জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ট্রেনে বিশেষ কোচ যুক্ত করার মাধ্যমে নারী যাত্রীদের জন্য এই সেবা চালু হয়। সেবাটি উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন। ঢাকা-সিলেট-ঢাকা রুটে চলাচলকারী জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে ননস্টপ চলাচলকারী সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ট্রেনে নারী যাত্রীদের জন্য বিশেষ কোচ সংযুক্ত করা হয়। সোমবার থেকে ঈদের পূর্বের তিন দিন, অর্থাৎ আগামীকাল বুধবার পর্যন্ত এ সার্ভিস চালু থাকবে। তবে, পরে সব আন্তঃনগর ট্রেনে নারীদের জন্য একটি করে কোচ সংরক্ষণের বিষয়ে কাজ করা হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক, রেল এবং নৌমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।