দেশের অন্যতম বৃহৎ শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি আবারও তীব্র অস্থিরতার মুখে পড়েছে। চেয়ারম্যানের পদত্যাগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো, পর্ষদে রদবদল, রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ এবং সারা দেশে গ্রাহকদের মানববন্ধন—সব মিলিয়ে ব্যাংকটি এখন নতুন এক সংকটের কেন্দ্রে।
রবিবার (২৪ মে) সকালে ঢাকার মতিঝিলে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’। একই দিনে বগুড়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, ময়মনসিংহ, সাতক্ষীরা, কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লা, কুড়িগ্রাম, মানিকগঞ্জ, বাগেরহাট, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় একই ধরনের কর্মসূচি পালিত হয়। বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন—ব্যাংকটিকে আবারও ‘অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র’ চলছে।
এমডিকে ঘিরে উত্তেজনা
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. ওমর ফারুক খানকে সম্প্রতি দীর্ঘ ছুটিতে পাঠানো হয়। যদিও তিনি মূলত ১৫ দিনের ছুটি চেয়েছিলেন, পরিচালনা পর্ষদ তা বাড়িয়ে প্রায় দেড় মাসে উন্নীত করে। বিষয়টি ব্যাংকের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
রবিবার সকালে তিনি প্রধান কার্যালয়ে গেলে বিক্ষোভকারীদের একাংশ তাকে ঘিরে ধরে। তারা তাকে পদত্যাগ না করার অনুরোধ জানান এবং ‘ব্যাংক বাঁচাও’ স্লোগান দেন। পরে তিনি চেয়ারম্যান বরাবর পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে কার্যালয় ত্যাগ করেন।
ওমর ফারুক খান গণমাধ্যমকে বলেন, চেয়ারম্যানের চাপের মুখেই তিনি পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। তবে পরিচালনা পর্ষদের সভা শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত না হওয়ায় সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়নি।
চেয়ারম্যানের পদত্যাগ, নতুন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলম
দিনভর নাটকীয়তার পর রাতে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ড. জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেছেন। একইসঙ্গে সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-২’ থেকে জারি করা চিঠিতে বলা হয়, ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১-এর ৪৫ ধারা ও ৪৭(৩) ধারার ক্ষমতাবলে এ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ড. জুবায়দুর রহমান ২০২৫ সালে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে ব্যাংকের পর্ষদে যোগ দেন এবং পরে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
পর্ষদে রদবদল ঘিরে নতুন প্রশ্ন
ব্যাংক সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক সংকটের পেছনে মূল কারণ পরিচালনা পর্ষদের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন। সম্প্রতি পর্ষদ থেকে জামায়াতপন্থি হিসেবে পরিচিত একজন পরিচালককে সরিয়ে নতুন সদস্য যুক্ত করা হয়েছে। এসব নতুন সদস্যের কয়েকজনকে এস আলম গ্রুপের ঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল ব্যক্তি-পরিবর্তন নয়, বরং ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করছে। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শীর্ষ ব্যবস্থাপনায়।
‘ছুটি’ নাকি কৌশলগত সরানো?
ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞদের ভাষ্য, কোনও এমডিকে দীর্ঘ সময়ের জন্য ছুটিতে পাঠানো সাধারণত ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তনের পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচিত হয়।
তাদের মতে, ওমর ফারুক খানকে দীর্ঘ ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত এবং পর্ষদে রদবদল—দুটি ঘটনাই একই সূত্রে গাঁথা। অর্থাৎ, ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ কাঠামো পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সারা দেশে মানববন্ধন, নানা দাবি
ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে উত্তেজনার জেরে রবিবার দেশের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভকারীদের দাবির মধ্যে ছিল—এমডি ওমর ফারুক খানকে পুনর্বহাল, ব্যাংকের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ, এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা, গ্রাহকদের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ব্যাংক রেজুলেশন আইনের কিছু ধারা বাতিল।
পাবনা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, সাতক্ষীরা ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলার কর্মসূচিতে বক্তারা অভিযোগ করেন, অতীতে যেভাবে ব্যাংকটি ‘দখল ও লুটপাটের’ শিকার হয়েছিল, এখন আবারও সেই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অপরদিকে কয়েকটি স্থানে বক্তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ’ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
কেন আবার সামনে এলো এস আলম প্রসঙ্গ
২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ইসলামী ব্যাংক নানা বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ অনিয়ম, অর্থপাচার এবং রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে। তখন বলা হয়েছিল, বিতর্কিত প্রভাবমুক্ত করে সুশাসন ফিরিয়ে আনা হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে আবারও এস আলম গ্রুপের প্রভাব ফিরে আসছে কিনা—সেই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে।
দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে সরকারের ‘অযাচিত হস্তক্ষেপের’ অভিযোগ তুলে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সোমবার (২৫ মে) এক বিবৃতিতে এ অভিযোগ করেন।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘‘সরকারের একের পর এক হঠকারী সিদ্ধান্ত দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।’’ ইসলামী ব্যাংকের এমডিকে পদত্যাগে বাধ্য করা এবং চেয়ারম্যানকে অপসারণের ঘটনায় গ্রাহক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের সমালোচনা করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘‘ব্যাংক খাতে লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো বিতর্কিত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হচ্ছে।’’ তিনি বর্তমান গভর্নরের অপসারণ, লুণ্ঠিত অর্থ ফেরত আনা এবং যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড পুনর্গঠনের দাবি জানান।
ব্যাংকের ভেতরে ভীতি ও বিভক্তি
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ব্যাংকের অভ্যন্তরেও এখন স্পষ্ট বিভক্তি দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত কিছু কর্মকর্তা নিজেদের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। আবার ২০১৭ সালের পর নিয়োগ পাওয়া একটি অংশ বর্তমান পরিবর্তনে সন্তুষ্ট বলেও জানা গেছে।
একইসঙ্গে ব্যাংকের গোপন তথ্য বাইরে ফাঁস হওয়ার অভিযোগও উঠেছে। বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ নথি ও কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের মতে, “এ ধরনের পরিস্থিতি শুধু প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নয়, আমানতকারীদের আস্থাকেও বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলে।”
কার নিয়ন্ত্রণে যাবে ইসলামী ব্যাংক?
বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত কার হাতে থাকবে? পর্ষদে রদবদল, চেয়ারম্যান পরিবর্তন, এমডির পদত্যাগপত্র, গ্রাহকদের আন্দোলন এবং রাজনৈতিক গুঞ্জন—সব মিলিয়ে ইসলামী ব্যাংক এখন এক নতুন ক্ষমতার লড়াইয়ের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি এখনও পরিবর্তনশীল। তবে দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে না পারলে দেশের ব্যাংকিং খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে কোটি কোটি আমানতকারী ও সাধারণ গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।