রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার তদন্ত শেষ। প্রস্তুত করা হয়েছে অভিযোগপত্র। আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আজই আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হতে পারে। এ ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে হত্যার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
গতকাল মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা চার্জশিট প্রস্তুত করছি। আগামীকালই (আজ রোববার) আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়া হবে।’
মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ঘটনার পরপরই বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ এবং জড়িত দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, অভিযোগপত্রে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ ও সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা উল্লেখ করা হয়েছে। আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার পর মামলার বিচারিক কার্যক্রম দ্রুত শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে মামলার বাদী শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান বলেন, ‘আমি চাই এ হত্যার সুষ্ঠু বিচার হোক; যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে এমন মর্মান্তিক ঘটনার শিকার হতে না হয়।’
এ ছাড়া রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় ডিএনএ ও কেমিক্যাল পরীক্ষার প্রতিবেদন গতকালই তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পল্লবী থানার ওসি হাসান বাসির। তিনি বলেন, ডিএনএ ও কেমিক্যাল পরীক্ষার প্রতিবেদন তদন্ত কর্মকর্তার কাছে পৌঁছেছে। তিনি চার্জশিট দাখিলের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এক মাসের মধ্যে রামিসার হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে: প্রধানমন্ত্রী
রামিসা হত্যার ঘটনায় দায়ী ব্যক্তির সর্বোচ্চ শাস্তি আগামী এক মাসের মধ্যে নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গতকাল ময়মনসিংহের ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকার মিরপুরের মতো এ ধরনের শিশু বা নারী নির্যাতন বর্তমান সরকার কোনোভাবেই মেনে নেবে না। বর্তমান সরকার শিশুটির হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি আগামী এক মাসের মধ্যে নিশ্চিত করবে এবং সেই সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড, যাতে করে ভবিষ্যতে আর কোনো ব্যক্তি বা মানুষ এভাবে শিশু বা নারী নির্যাতন করার সাহস না পায়।
পল্লবীতে শিশু হত্যা মামলার বিচার দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানও। গতকাল রাজধানীর মহাখালীতে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘ঈদ উপলক্ষে সরকারি ছুটি শুরুর আগেই যদি ডিএনএ রিপোর্ট পাওয়া যায় এবং চার্জশিট দাখিল করা সম্ভব হয়, তাহলে ঈদের পরপরই বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হবে। এ মামলা যত দ্রুত শেষ করা সম্ভব, আমরা সে সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন করব।’
বিচারের বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, মাগুরার আছিয়া হত্যা মামলায় চার্জশিট দাখিলের পর বিচার শেষ করতে এক মাস সময় লেগেছিল। এ ছাড়া ১৯৪৮ সালের মুলুক চাঁদ মামলার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘সে মামলায় এক দিনেই বিচারকাজ সম্পন্ন হয়েছিল।’
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, এই নৃশংস ঘটনায় গোটা জাতি স্তম্ভিত। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই অপরাধীকে সাজার আওতায় আনতে সরকার সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে।
গতকাল রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ফাউন্ডেশনের অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি এসব কথা বলেন।
শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার নিন্দা-প্রতিবাদ জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সংগঠনের আমির শাহ মুহিববুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব শায়েখ সাজিদুর রহমান গতকাল এক বিবৃতিতে বলেন, এমন পাশবিক, নৃশংস ও মানবতাবিরোধী ঘটনা শুধু একটি পরিবারকে নয়, সমগ্র জাতির বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবনের এমন মর্মান্তিক পরিণতি সভ্য সমাজের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক ও উদ্বেগজনক।
এদিকে রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনায় আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলুকে বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) নিয়োগ দিয়েছে সরকার। গতকাল আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হয়েছে।
রামিসাদের মুন্সীগঞ্জের বাড়িতে ভিড়: গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর পল্লবীতে রামিসাদের বাড়িতে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর পরই তাদের মুন্সীগঞ্জের বাড়িতে রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ভিড় বেড়েছে। অনেকেই ব্যক্তিগত ফটোগ্রাফার নিয়ে গিয়ে সেখানে ছবি তুলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করছেন। এতে রামিসার পরিবারের সদস্যদের স্বাভাবিক পারিবারিক ও সামাজিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরিবারের একাধিক সদস্য।
পরিবারের সদস্যরা বলছেন, আমরা বিচার চাই। আমাদের কষ্টটা বুঝুক সবাই। শুধু ছবি তুলে বা ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে চলে গেলে তো হবে না। গতকাল রামিসার কবর জিয়ারত করেন কয়েকজন সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা। তারা পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে দ্রুত বিচারের দাবি জানান।
রামিসার জন্য লালমাইয়ে একক নীরব পদযাত্রা: রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় জড়িতদের ফাঁসির দাবিতে গতকাল কুমিল্লার লালমাই উপজেলায় ব্যতিক্রমধর্মী এক প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন সমাজকর্মী মো. কামাল হোসেন। কোনো সংগঠনের ব্যানার কিংবা বিশাল জনসমাগম নয়; হাতে একটি ফেস্টুন নিয়ে একাই প্রায় দুই কিলোমিটার পথ হেঁটে নীরব প্রতিবাদ জানান তিনি।
সারা দেশে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ: রামিসা হত্যার ঘটনায় অব্যাহতভাবে সারা দেশে মানববন্ধন করে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক সংগঠন ও সাধারণ নাগরিকরা।
বগুড়া শহরের সাতমাথায় মানববন্ধনে অংশ নিয়ে বক্তারা বলেন, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। তারা রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। কর্মসূচিতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষ অংশ নেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে প্রেস ক্লাবের সামনে নারী-শিশু নির্যাতন বন্ধ ও ধর্ষকদের শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সুরক্ষা, কন্যা, এইচআরডিএসসহ বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে এ ধরনের অপরাধ কমবে না। দ্রুত বিচার ও কঠোর আইন প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সুনামগঞ্জে সংঘাত নয়, শান্তি ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ি স্লোগানে মানববন্ধন ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শহরের আলফাত স্কয়ার এলাকায় পিস ফ্যাসিলিটেটর গ্রুপ (পিএফজি) সদর ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) জেলা কমিটির যৌথ উদ্যোগে এ কর্মসূচি পালিত হয়।