বাংলা-ইংরেজি দেখে পড়া (রিডিং) কিংবা সহজ যোগ-বিয়োগ করতে পারে না দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর বেশিরভাগ শিক্ষার্থী। খোদ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ইউনিটের পরিদর্শনে উঠে এসেছে এমন উদ্বেগজনক চিত্র। শিক্ষা খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, এটা প্রাথমিক শিক্ষার জন্য ‘রেড অ্যালার্ট’। এর থেকে উত্তরণের জন্য দ্রুততম সময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
সাভারের সম্ভার গুচ্ছগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সম্প্রতি পরিদর্শনে যান বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ইউনিটের এক কর্মকর্তা। তিনি বিদ্যালয়টির তৃতীয় শ্রেণির পাঁচ শিক্ষার্থীকে বাংলা রিডিং পড়তে বললে একজন শিক্ষার্থীও রিডিং পড়তে পারেনি। একইভাবে চতুর্থ শ্রেণির পাঁচ শিক্ষার্থীকে গণিতের যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ করতে বললে মাত্র একজন শিক্ষার্থী তা করতে পারে। আর পঞ্চম শ্রেণির চার শিক্ষার্থীকে ইংরেজি বই থেকে রিডিং পড়তে বললে তা পারে মাত্র একজন। বিদ্যালয়টির গড় শিখন দক্ষতা মাত্র ১৫ শতাংশ বলে উল্লেখ করেছেন ওই কর্মকর্তা। একইভাবে এ উপজেলার গাজীবাড়ি পূর্বপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনে যান আরেক কর্মকর্তা। তিনি বিদ্যালয়টির তৃতীয় শ্রেণির চার শিক্ষার্থীকে বাংলা রিডিং পড়তে বললে তা পারে মাত্র দুজন। চতুর্থ শ্রেণির ৯ শিক্ষার্থীকে গণিত থেকে প্রশ্ন করলে জবাব দিতে পারে মাত্র একজন, আর পঞ্চম শ্রেণির আটজনকে ইংরেজি থেকে প্রশ্ন করলে পারে মাত্র একজন। এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গড় শিখন দক্ষতা মাত্র ২৪ শতাংশ।
প্রাথমিক শিক্ষার এ চিত্র সারা দেশেই। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন ইউনিট সারা দেশে ৪ হাজার ৬১০টি স্কুল পরিদর্শনের পর শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের জরিপে শিক্ষার্থীদের শিখন দক্ষতার জন্য এ গ্রেড পেয়েছে মাত্র ১৩৩টি প্রতিষ্ঠান। ১ হাজার ৩৪৩টি প্রতিষ্ঠান বি গ্রেড এবং ৩ হাজার ১৩৪টি প্রতিষ্ঠান পেয়েছে সি গ্রেড।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের শিশুদের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে প্রাথমিক শিক্ষার সমান সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দিতে ১৯৯০ সালে যাত্রা করে ‘বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ইউনিট’। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা ইউনিটটি দেশের নিবন্ধিত প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো দেখভাল, নানা জরিপ কাজ পরিচালনা ও শিশুদের স্কুলমুখী করতে অভিভাবকদের নিয়ে নানা জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করত। কিন্তু ২০১৩ সালে দেশের সব নিবন্ধিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারীকরণ করা হলে বিলুপ্ত হয় বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম। এরপর দীর্ঘদিন এ প্রতিষ্ঠানের কোনো কাজ ছিল না। তবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বর্তমান সচিব মো. সাখাওয়াৎ হোসেন অতিরিক্ত সচিব থাকাকালে এ ইউনিটকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেন। তিনি দেশের বিদ্যালয়গুলো পরিদর্শন করার নির্দেশ দেন বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ইউনিটকে। এরপর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এ ইউনিট সারা দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন কাজ শুরু করে। ইউনিট থেকে ত্রৈমাসিক রিপোর্ট প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়। এ সময় তারা মাঠের চিত্র দেখে নানা সুপারিশও জমা দেন।
যেভাবে বিদ্যালয়গুলোর গ্রেডিং করা হয়
ইউনিটের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে এই ইউনিটের ২০ থেকে ২৫ জন কর্মকর্তা প্রতিদিনই দেশের বিদ্যালয়গুলো পরিদর্শনে যান। আগাম বার্তা না দিয়ে একেকজন কর্মকর্তা প্রতিদিন ১০টি করে বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন। তারা তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শিখন দক্ষতা সম্পর্কে জানতে চান। এর মধ্যে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা রিডিং পড়তে বলা হয়। চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের গণিতের যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ করতে দেওয়া হয়। আর পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বলা হয় ইংরেজি রিডিং পড়তে। এরপর শিক্ষার্থীদের শিখন দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে স্কুলগুলোকে একটি নম্বর দেওয়া হয়। এর মধ্যে যেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা শূন্য থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত শিখন দক্ষতা অর্জন করে, তাদের সি গ্রেড, ৬১ থেকে ৭৯ পর্যন্ত শিখন দক্ষতা অর্জন করলে বি গ্রেড আর ৮০ থেকে ১০০ পর্যন্ত শিখন দক্ষতা অর্জন করলে এ গ্রেড দেওয়া হয়।
বিদ্যালয়গুলোর বাস্তব চিত্র
নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার ১২৫টি বিদ্যালয় পরিদর্শন করে একটি বিদ্যালয়কেও এ গ্রেডে রাখতে পারেনি পরিবীক্ষণ টিম। চট্টগ্রামের মীরসরাই, সীতাকুণ্ড, রাঙ্গুনিয়ার ৩৭১টি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেও দেখা গেছে এ চিত্র।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ইউনিট দেশের ৮২টি উপজেলার যে ৪ হাজার ৬১০টি বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছে, এর মধ্যে ঢাকা মহানগরের রমনা, ধানমন্ডি, ডেমরা, সূত্রাপুর, মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান, টংগীবাড়ি, শ্রীনগর, গজারিয়া, লৌহজং, শিবালয়, কুমিল্লার আদর্শ সদর, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার, কিশোরগঞ্জের সদর ও করিমগঞ্জ, নোয়াখালীর সদর ও বেগমগঞ্জ, বরিশালের আগৈলঝড়া, উজিরপুর, বাবুগঞ্জ, গৌরনদী, লালমনিরহাটের কালিগঞ্জ, নেত্রকোনার পূর্বধলা, মদন, পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ, আটোওয়ারী, সাতক্ষীরার কলারোয়া, শ্যামনগর, তালা, ঠাকরুগাঁও সদর উপজেলাসহ ২৪টি উপজেলার ১ হাজার ৩শ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিখন দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে এ গ্রেড দেওয়া যায়নি।
কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর চিত্র খুবই ভয়াবহ। অধিকাংশ বিদ্যালয়েই শিক্ষক পর্যন্ত নেই। আবার কোনো কোনো স্কুলে খাতা-কলমে শিক্ষার্থী থাকলেও উপস্থিতি থাকে খুবই কম। বিদ্যালয়ও থাকে অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন অবস্থায়। অধিকাংশ শিক্ষার্থীই ইংরেজি, গণিত দূরে থাক, বাংলা রিডিংও পড়তে পারে না। শিক্ষকদেরও পড়াশোনার প্রতি কোনো মন নেই। তারা শিক্ষার্থীদের আন্তরিকভাবে পাঠদান করান না।
তারা আরও বলেন, সি গ্রেডভুক্ত যে ৩ হাজার ১৩৪টি প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়েছে, তার মধ্যে অন্তত ২ হাজার প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের শিখন দক্ষতা ২৫ শতাংশের নিচে। আর যে ১৩৩টি প্রতিষ্ঠানকে এ গ্রেডভুক্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, সেই বিদ্যালয়গুলোর বেশিরভাগই উপজেলা সদরের মডেল বিদ্যালয় এবং রাজধানীসহ বড় শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
এক পরিদর্শক বলেন, আমি চট্টগ্রামের একটি স্কুলে ১১টার দিকে গিয়ে দেখি কোনো শিক্ষক-শিক্ষার্থী নেই। বিদ্যালয় তালা দেওয়া। পরে শিক্ষকদের ফোন করলে তারা বলেন, ওইদিন বৃষ্টির জন্য আসেননি। পড়াশোনার মান খারাপ হওয়ায় এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমছে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
তবে পরিদর্শন শুরু হওয়ার পর শিক্ষকদের মধ্যে একটি আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, পরিদর্শন শুরু হওয়ায় শিক্ষকরা ক্লাসে পড়াশোনায় কিছুটা মনোযোগী হয়েছেন, যার প্রমাণ মিলছে পরিদর্শনকৃত প্রতিষ্ঠানগুলো রিভিউ করতে গিয়ে। এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা মুন্সীগঞ্জ যখন প্রথমবার পরিদর্শনে যাই, তখন জেলাটির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে গড়ে ৩০ শতাংশ মার্ক দিয়েছিলাম। পরে যখন রিভিউ করেছি, তখন মার্ক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ শতাংশে। ছয় মাসের ব্যবধানেই এ ২০ শতাংশ মার্ক বেড়েছে।
বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ইউনিটের মহাপরিচালক তসলিমা আক্তার বলেন, আমরা একে একে দেশের সব বিদ্যালয় পরিদর্শন করব। এতে শিক্ষার বাস্তব চিত্র উঠে আসবে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী বলেন, আমরা এ পরিদর্শনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। আমাদের অধিদপ্তর থেকেও নিয়মিত পরিদর্শনে যাচ্ছেন কর্মকর্তা। শিক্ষার মানোন্নয়নে আমরা একটি মাস্টারপ্ল্যান করছি। শিক্ষকদের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নানা প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করতে নানা প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। আমাদের অনেক নীতিমালায়ও পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা যা বলছেন
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ কালবেলাকে বলেন, এই চিত্র শুধু এ জরিপে নয়, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার জরিপেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে গঠিত প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষায় মানোন্নয়নে গঠিত পরামর্শক কমিটির পক্ষ থেকে আমরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় পরিদর্শনে গিয়েও এ চিত্র দেখে এসেছি। আমরা বাংলা, গণিত নিয়ে প্রশ্ন করেছি; কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষার্থীই পারেনি। এ সংকট দূর করতে খণ্ডিতভাবে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে তা কাজে আসছে না। তাই এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য যথেষ্ট শিক্ষক নিয়োগ, তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে হবে। একসঙ্গে সারা দেশে টিচিং লার্নিং ইনপ্রুভমেন্টের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গণসাক্ষতরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, এর মূল কারণ বের করে আনতে হবে। অনেক বিদ্যালয়েই প্রধান শিক্ষক নেই। প্রধান শিক্ষক না থাকলে বিদ্যালয় চলবে কীভাবে? আবার অনেক শিক্ষক শ্রেণিকক্ষের ভেতরে পঠন-পাঠনের বাইরে অনেক বেশি মনোযোগী। তারা তাদের বেতন-ভাতা, মর্যাদার বিষয়ে নিয়মিত আলাপ করেন। আবার অধিকাংশ শিক্ষকই মনে করেন, তাদের মর্যাদা সবার নিচে। সবশেষে শ্রেণিকক্ষে পঠন-পাঠন নিশ্চিত করতে শিক্ষা প্রশাসনকে আরও মনোযোগী হতে হবে। এ বিষয়গুলোর সমাধান করলেই শিক্ষার মান বাড়বে।
অবস্থা আসলেই খারাপ, বললেন প্রতিমন্ত্রী
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ কালবেলাকে বলেন, এ চিত্র আসলেই বাস্তব চিত্র। আমাদের অবস্থা আসলেই খুবই খারাপ। এ চিত্র প্রমাণ করে বিগত দিনগুলোতে প্রাথমিক শিক্ষার প্রতি কী অন্যায় হয়েছে। তবে আমাদের কাজ হলো আগামীদিনগুলোতে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন করা। শিক্ষার মনোন্নয়নেই আমরা প্রতিটি প্রদক্ষেপ নিচ্ছি।