Image description

সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণার আট বছর পর বিশ্বের এই বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনে আবার ফিরে এসেছে ডাকাতিসহ সশস্ত্র অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি, চাঁদাবাজি ও বনজীবী মানুষের ওপর নির্যাতনের এই পুনরাবৃত্তি উপকূলীয় এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে।

জেলে এবং বনকর্মীরা জানিয়েছেন, বেশ কয়েক বছর এলাকাটি তুলনামূলকভাবে শান্ত থাকার পর এখন পরিস্থিতি আবার বিপজ্জনক রূপ নিয়েছে।

তবে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর দস্যুদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া থমকে যায় বলে জানা গেছে। স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করা অনেক প্রাক্তন দস্যু আবার নতুন করে আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়েন। তাদের দাবি, তারা সাজানো মামলার শিকার হয়েছেন, পুরোনো আইনি লড়াই চালাতে গিয়ে চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন।

হতাশা ও ক্ষোভের কারণে তাদের মধ্যে অনেকেই আবার অপরাধের জীবনে ফিরে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

বাগেরহাটের সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, তারা এখন অত্যন্ত উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যে আছেন। গত কয়েক মাস ধরে দস্যুরা বনের বিভিন্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, ডাকাতির আতঙ্কে বন বিভাগ থেকে জেলেদের পাস বা অনুমতিপত্র দেওয়ার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।

তিনি আরও বলেন, গত বছর যেখানে ৩০০টি অনুমতিপত্র দেওয়া হয়েছিল, সেখানে এই বছর সেই সংখ্যা কমে মাত্র ১০০টিতে নেমে এসেছে। যারা ঝুঁকি নিয়ে বনে যাচ্ছেন, তাদের অনেকেই দস্যুদের টার্গেট হচ্ছেন। এর ফলে চরম কষ্টের মধ্যে পড়েছেন জেলেরা, সরকারের রাজস্ব আয়ও ব্যাপকভাবে কমে যাচ্ছে।

পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সশস্ত্র হামলার আশঙ্কায় বন বিভাগের কর্মীরা অন্ধকার হওয়ার পর বনে গভীর টহল দেওয়া এড়িয়ে চলছেন। বন কর্মকর্তা জানান, দস্যুদের সংখ্যা অনেক বেশি এবং তারা ভারী অস্ত্রে সজ্জিত।

এদিকে কোস্ট গার্ডের একজন কর্মকর্তা জানান, দস্যু দলগুলোর বিরুদ্ধে তাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত ১৭ মে দুইজন, ১৫ মে তিন জন এবং ১২ মে একজন সন্দেহভাজন দস্যুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, গত ১৩ মে দস্যুদের সাথে বন্দুকযুদ্ধের পর চারজন জেলেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া ২২ মে র‍্যাবের সাথে একটি যৌথ অভিযানের সময় আরও ২১ জন জেলেকে উদ্ধার করা হয়।

বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, বিভিন্ন কারণে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বাড়ছে। তবে দস্যুদের তৎপরতা দমন করতে সরকারের একাধিক সংস্থা সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। সরকারের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম ইতিমধ্যে এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

একের পর এক অপহরণ

সুন্দরবনে একের পর এক অপহরণের ঘটনা ঘটে চলেছে, যা বনের বুকে দস্যুতার এক ভয়াবহ প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মে থেকে ৫ মে-র মধ্যে সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকে ২২ জন বনজীবীকে অপহরণ করা হয়, যাদের মধ্যে পাঁচজন মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পান।

কর্তৃপক্ষ এই ম্যানগ্রোভ বনে হামলার দ্রুত বৃদ্ধির বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছে। ১৪ মে-র মধ্যে সাতক্ষীরা থেকে আরও আটজন বনকর্মী, ১৫ এপ্রিল মোংলা থেকে ১০ জন জেলে, গত মঙ্গলবার লাংসের খাল থেকে ১৭ জন এবং শরণখোলা রেঞ্জ থেকে ছয়জনকে অপহরণ করা হয়।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই গত এক শুক্রবার অভিযানের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ২১ জন জেলেকে উদ্ধার ও কিছু অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধার করে।

তবে বিপদের ঝুঁকি এখনও কাটেনি। অপহৃতদের স্বজনরা জানান, দস্যুরা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে মুক্তিপণ দাবি করছে। টাকা না দিলে জিম্মিদের হত্যা করার হুমকি দিচ্ছে। বেঁচে ফেরা জেলেরা অভিযোগ করেন, জলদস্যুরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা মানুষের ঘরের কাছ থেকেও অপহরণ করছে, তাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালাচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে উপকূলীয় অঞ্চলে বিরাজ করছে চরম উদ্বেগ। বন্দুকের মুখে জিম্মি করা, ডিজিটাল মাধ্যমে চাঁদা আদায় এবং দস্যুদের আধুনিক ট্র্যাকিং কৌশল ব্যবহারের কারণে স্থানীয় মানুষ আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সুন্দরবন আবার তার সবচেয়ে অন্ধকার যুগে ফিরে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

দস্যুদের এই ফিরে আসা একটি সুসংগঠিত অপরাধমূলক অর্থনীতি তৈরি করেছে। স্থানীয় জেলে ও বনজীবীদের অর্থায়নকারী দাদনদাররা জানান, বিকাশের মাধ্যমে মুক্তিপণের টাকা লেনদেন করা হচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, দস্যু দলগুলো এখন মধু আহরণের মওশুম শুরু হওয়ার আগেই মৌয়ালদের কাছ থেকে ‘অগ্রিম মুক্তিপণ’ বা চাঁদা দাবি করছে। এই অগ্রিম টাকা না দিলে ভুক্তভোগীদের বনে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।

দাদনদারদের হিসাব অনুযায়ী, জলদস্যু দলগুলো গত মাত্র ছয় থেকে সাত মাসেই প্রায় ৫০ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করেছে।

বনে ঢোকার জন্য দস্যুদের ‘টোকেন’

সরকারি অনুমতিপত্রের পাশাপাশি সশস্ত্র দস্যু দলগুলো এখন জেলে এবং মৌয়ালদের বনে নিরাপদে প্রবেশের জন্য তাদের নিজস্ব ‘টোকেন’ বা রসিদ বহন করতে বাধ্য করছে।

এমনই একটি টোকেন পাওয়া গেছে, যা মূলত একটি ১০ টাকার ব্যাংক নোট। সেই নোটের ওপর হাতে লেখা রয়েছে: “সোহেল, চরপাটা”।

অভিযোগ রয়েছে, সুন্দরবনের পূর্ব প্রান্তে বাগেরহাট এলাকায় সক্রিয় দস্যু সিন্ডিকেটগুলো এই টোকেন বিতরণ করছে।

স্থানীয় বনকর্মীদের মতে, যারা অগ্রিম চাঁদা বা মুক্তিপণ পরিশোধ করে, তারা বনে কোনো ঝামেলা ছাড়া কাজ করার জন্য পাস হিসেবে এই টোকেন পায়।

জলদস্যুদের দেওয়া এই ভাউচার বা টোকেন না থাকলে, সরকারের বৈধ অনুমতিপত্র থাকার পরেও বনকর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয়। তাদের নির্মমভাবে মারধর ও অপহরণ করা হয়।

আত্মসমর্পণকারী দস্যুদের প্রত্যাবর্তন

এর আগে পুনর্বাসিত হওয়া অপরাধীরা আবার সুন্দরবনে ফিরে আসছে। গত ২১ মে ‘ছোট সুমন বাহিনী’র সদস্যরা আবার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িয়ে পড়ে। যদিও তারা ২০১৯ সালের ৩০ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেছিল।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র জানায়, বর্তমানে বনের সবচেয়ে বড় দস্যু দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে ‘জাহাঙ্গীর বাহিনী’। এই দলে রয়েছে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত প্রায় ৫০ জন সদস্য।

এই দস্যু দলের নেতা জাহাঙ্গীর শেখ, তার সাথে আছে মো. জয়নাল আবেদিন (ওরফে দাদা ভাই) ও  মনজুর সর্দার। তারা সবাই আগে আলাদা আলাদা দস্যু দল পরিচালনা করতেন।

জাহাঙ্গীর শেখ মূলত ২০১৮ সালে র‍্যাবের একটি উদ্যোগের মাধ্যমে নয়জন সদস্যসহ আত্মসমর্পণ করেছিলেন। তবে সূত্রগুলো বলছে, পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুত সুযোগ-সুবিধা না পাওয়া এবং প্রশাসনিকভাবে নানা হয়রানির শিকার হওয়ার পর তিনি আবার জলদস্যুতায় ফিরে যান।

একইভাবে দাদা ভাই ২০১৮ সালে ১১ জন লোক নিয়ে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। তিনি চট্টগ্রামে একটি চাকরি নিয়ে স্বাভাবিক জীবন গড়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পরে র‍্যাব-৬ তাকে ডেকে পাঠিয়ে তাদের আওতাধীন এলাকার মধ্যে থাকার নির্দেশ দেয়, যা তার স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।

এই পুরোনো দস্যু দলগুলোর পাশাপাশি নতুন নতুন অপরাধী চক্রও দ্রুত গড়ে উঠছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, রাজনৈতিক হয়রানি, স্থানীয় আধিপত্যের লড়াই, অমীমাংসিত মামলার জট এবং চরম দারিদ্র্যের কারণে মানুষ আবার নতুন করে দস্যু দলে যোগ দিচ্ছে।

কমপক্ষে ২০টি সক্রিয় দল

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বনকর্মী এবং স্থানীয় দাদনদারদের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের ভেতরে বর্তমানে কাজ করছে অন্তত ২০টি সক্রিয় দস্যু দল।

কিছু দল সুনির্দিষ্টভাবে জেলেদের লক্ষ্য করে ডাকাতি করে, আবার অন্য দলগুলো চাঁদাবাজির জন্য বাওয়ালি (কাঠুরে) এবং মৌয়ালসহ (মধু সংগ্রহকারী) বনকর্মীদের অপহরণের দিকে মনোযোগ দেয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে নিজেদের এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন দল আলাদা পোশাক ও ছদ্মবেশ ব্যবহার করে থাকে।

গত ১৮ মে অঞ্চলের উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়, যখন সুন্দরবনের পশ্চিম অঞ্চলে কাঁকড়া ধরা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির জেরে বন বিভাগের একজন কর্মচারী গুলি করে এক জেলেকে হত্যা করেন।

এই হত্যাকাণ্ডের পর শতাধিক ক্ষুব্ধ জেলে এবং স্থানীয় বাসিন্দা বুড়িগোয়ালিনী বন স্টেশনে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। তখন থেকেই উপকূলীয় অঞ্চল জুড়ে অশান্তি ছড়িয়ে পড়েছে।

সূত্রগুলো জানায়, অন্তত চারটি দস্যু দল কেবল পশ্চিম অঞ্চলের এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে। এর ফলে আতঙ্কিত স্থানীয় বাসিন্দারা বনে যাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছেন।

বনকর্মী হতাহতের পাশাপাশি সুন্দরবনের পূর্ব বন বিভাগের কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী সতর্ক করে বলেন, জলদস্যুতার এই পুনরুত্থান বনের পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি আশঙ্কার কথা জানিয়ে বলেন, অতীত ইতিহাস থেকে দেখা গেছে এই দস্যুরা যখন বনের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তখন তারা খাবারের জন্য বন্যপ্রাণী শিকার করে। বনে তাদের অবাধ উপস্থিতির কারণে এখন বাঘ শিকারের বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।