Image description
ককরোচ : ব্যাঙ্গ থেকে বিপদ। বন্ধ হলো ককরোচ জনতা পার্টির ওয়েবসাইট, বিজেপিকে স্বৈরাচার বললেন অভিজিৎ কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে ৬ লাখ ককরোচের সই যমুনা দূষণ রোধে মথুরা পৌরসভায় নেচে-গেয়ে এক তেলাপোকার বিক্ষোভ বাংলাদেশ-নেপালের মতো গণবিক্ষোভের আকার ধারন করতে পারে ককরোচ।

তেলাপোকার ঝাঁকে তোলপাড় ভারত। মাত্র কদিনেই দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে জেন-জি সমর্থিত ‘ককরোচ বা তেলাপোকা জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। মাঠে নেমেই (১৬ মে) প্রশ্নপত্র ফাঁসকাণ্ডে পদত্যাগের দাবি তুলেছিল কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের। শনিবার পর্যন্ত পদত্যাগের সে পিটিশনে সই করেছেন ৬ লাখ তেলাপোকার এক বিরাট দল। দেশের বিভিন্ন জনপদে ছোট ছোট দলের ঝাঁক বেঁধে যা তার বড় আন্দোলন যাবে ভবিষ্যতে, তার আরেক পূর্বাভাস মিলেছে মথুরায়ও। শুক্রবার ওই অঞ্চলের পৌরসভায় ঢুকে যমুনা দূষণ রোধে নেচে-গেয়ে প্রতিবাদ করেন দলীয় পোশাকধারী এক কর্মী।

বসে নেই বিজেপিও। ককরোচ জনতা পার্টির ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। ভারতে আর খোলা যাচ্ছে না প্ল্যাটফর্মটি। বন্ধ হয়ে যাওয়া নিয়ে শনিবার দুপুরে সামাজিক মাধ্যম এক্সে মুখ খোলেন প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপক। লেখেন, ‘আমাদের আইকনিক ওয়েবসাইট cockroachjantaparty.org বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। ১০ লাখ ককরোচ আমাদের ওয়েবসাইট থেকে সদস্যপদ গ্রহণ করেছিলেন। আরশোলায় এত ভয় কেন সরকারের? এই স্বৈরাচারী আচরণ যুবসমাজের চোখ খুলে দিচ্ছে। আমাদের একটাই অপরাধ যে আমরা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ চাইছি। এভাবে আমাদের দমিয়ে রাখতে পারবে না। আমরা নতুন ঠিকানা নিয়ে কাজ করছি। আরশোলা মরে না।’ বুধবার রাতেও আচমকা ইনস্টাগ্রামে সিজেপির অ্যাকাউন্ট খুঁজে পেতে সমস্যা হয়। ইনস্টাগ্রামে অ্যাকাউন্টটি দেখাই যাচ্ছিল না। লাফিয়ে লাফিয়ে ফলোয়ার বাড়তে থাকায় অ্যাকাউন্ট সাসপেন্ড করা হয়েছে, নাকি হ্যাক— প্রশ্ন ওঠে তা নিয়েও। পরে অবশ্য দেখা যেতে শুরু করে ইনস্টাগ্রামে। তারপর আরও দ্রুতগতিতে বাড়তে শুরু করে ফলোয়ার।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মাত্র এক সপ্তাহেই ফলোয়ার ধামাকা লুফে নিয়েছে ককরোচ । দৃষ্টি আকর্ষণেও সক্ষম হয়েছে মূলধারার গণমাধ্যমের। আর এতেই নড়েচড়ে বসেছেন দেশটির প্রবীণ রাজনীতিবিদরাও।

বিতর্কের শুরু হয় ১৫ মে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যে। জাল ডিগ্রি ও বেকারত্ব প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি কিছু যুবককে ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’ বলে উল্লেখ করেন। বিচারপতির এই তীর্যক মন্তব্যে অপমানিত হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেন অভিজিৎ। বলেছিলেন, ‘যদি সব তেলাপোকা একসঙ্গে হয়, তাহলে কী হবে?’ ব্যাস, এই এক ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’।

পরদিনই এক্স ও ইনস্টাগ্রামে খোলেন তেলাপোকা অ্যাকাউন্ট। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে মানুষ ও তেলাপোকার মিশ্রিত আকার দিয়ে আরও তৈরি করেছেন পার্টির লোগো, নানান ছবি, ওয়েবসাইট আর পার্টিতে যোগদান করার মেম্বারশিপ সিস্টেম। এর পরপরই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভ ও আলোচনা শুরু । অনেক তরুণ ব্যঙ্গাত্মকভাবে নিজেদের ‘তেলাপোকা’ পরিচয়ে একত্রিত হতে থাকেন আর সেখান থেকেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে এ অনলাইন ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম। মাত্র কদিনেই নথিভুক্ত হয়েছে ১০ লাখ সমর্থক। আর ফলোয়ারে করেছে বিশ্বরেকর্ড। পাঁচ দিনেই ছাড়িয়ে গেছেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিজেপিকে। পেছনে ফেলেছে দেশের সবচেয়ে পুরনো দল (১৪১ বছর) কংগ্রেসকেও। বিজেপির অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার ৯০ লাখের নিচে। সেখানে ৭ দিনেই সিজেপির ফলোয়ার ছুঁয়েছে ২ কোটি ২২ লাখ। গুগল ফর্মের মাধ্যমে এর মধ্যেই ৪ লাখের বেশি তরুণ এই দলের সদস্য হওয়ার নিবন্ধন করেছেন, যাদের ৭০ শতাংশেরই বয়স ১৯ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে।

তেলাপোকার ৫ ইশতেহার

প্যারোডি বা মজার ছলে তৈরি হলেও সিজেপির পাঁচ দফা ইশতেহারে লুকিয়ে আছে ভারতের গভীর রাজনৈতিক সংকট ও দাবি। দুর্নীতি দমন, ঘন ঘন দলবদল ঠেকানো, নির্বাচনী স্বচ্ছতা, সংবাদ মাধ্যমের সংস্কার এবং ভারতের পার্লামেন্ট ও মন্ত্রিসভায় নারীদের জন্য ৫০ শতাংশ আসন সংরক্ষণ। সেইসঙ্গে সাম্প্রতিক ২৩ লাখ শিক্ষার্থীর জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা মেডিকেল পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস নিয়েও সরব তারা।

সিজেপি কোনো দল নয়

সিজেপি বিষয়টি এখন নতুন চাপের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে নরেন্দ্র মোদির সরকার ও বিজেপির। সিজেপি মূলত ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নামের ব্যঙ্গাত্মক অনুকরণ। সিজেপি কোনো বাস্তব রাজনৈতিক দল নয়। রাজনৈতিক ব্যঙ্গ ও হাস্যরসের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি অনলাইন আন্দোলন। হাস্যরসের ভাষায় তুলে ধরেছে তরুণদের হতাশা, বেকারত্ব ও রাজনৈতিক অসন্তোষ। এর মজার সদস্যপদ শর্তের মধ্যে রয়েছে বেকার হওয়া, অলস হওয়া, ২৪ ঘণ্টা অনলাইনে অ্যাকটিভ এবং ক্ষোভ প্রকাশে পারদর্শী। দলের সদর দপ্তর ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানেই ওয়াই-ফাই পাওয়া যাবে, সেখানেই।

কে এই অভিজিৎ

অন্যদিকে বাবা ভাগবান দিপক জানান, অভিজিতের বোন আগে থেকেই বিদেশে থাকায় তিনিও সাংবাদিকতা পড়ার জন্য দেশের বাইরে যান। তার আশা ছিল অভিজিৎ পুনে বা দিল্লিতে সাধারণ কোনও চাকরি করবেন।

বয়স ৩০ বছর । ছত্রপতি সম্ভাজিনগরে পড়াশোনার পর উচ্চশিক্ষার জন্য পুনেতে যান। সেখানে ইঞ্জিনিয়ারিং কঠিন মনে হওয়ায় গণমাধ্যমে স্থানান্তরিত হন। স্নাতক শেষ করেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে জনসংযোগ বিষয়ে স্নাতকোত্তর করছেন। ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আম আদমি পার্টির (এএপি) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ।

ককরোচকে সমর্থন জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় কয়েকজন নেতাও। বুধবার শীর্ষ বিরোধী নেতা অখিলেশ যাদব এক্স পোস্টে লেখেন, বিজেপি বনাম সিজেপি। তৃণমূল কংগ্রেসের মহুয়া মৈত্র, শশী থারুররাও ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র হয়ে মুখ খুলেছেন। এক্সে কৃষ্ণনগরের তৃণমূল সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র লেখেন, দেশের সরকার যুবসমাজকে এতটাই ভয় পায় যে একটি অনলাইন আন্দোলনকেও সহ্য করতে পারছে না। তার মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিরোধী দলগুলোর কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। মহুয়া মৈত্র নিজেও সিজেপির একজন ফলোয়ার। একই ধরনের মন্তব্য করেছেন তৃণমূলের আরেক নেতা শশী পাঁজা। সমালোচকদের দাবি, সিজেপি মূলত বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি অনলাইন প্রচারণা। প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে এএপির অতীতের সম্পর্ক তুলে ধরে জানান, এটি স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের চেয়ে বেশি পরিকল্পিত ডিজিটাল রাজনৈতিক উদ্যোগ। সাম্প্রতিক একটি জরিপে দেখা গেছে, ২৯ শতাংশ তরুণ কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন না এবং মাত্র ১১ শতাংশ কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য। বিশ্লেষকরা বলছেন, ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-নেপালের মতো গণবিক্ষোভেরও জন্ম দিতে পারে ককরোচ।