Image description

গাজীপুরের টঙ্গী পূর্ব থানার তুরাগ নদের তীরঘেঁষা হাজি মাজার বস্তি বাইরে থেকে সাধারণ মনে হলেও ভিতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে ভিন্ন দৃশ্য। সরু গলিজুড়ে প্রকাশ্যে চলে মাদক বিক্রি, সেবন ও জুয়ার আসর। অভিযানের খবর আগেভাগেই পৌঁছে যায় কারবারিদের কাছে। আর সেই সুযোগে বারবার ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে হোতারা। নিউজ টোয়েন্টিফোরের দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমনই ভয়াবহ চিত্র। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বর্তমানে এটি গাজীপুরের সবচেয়ে বড় মাদকের হটস্পটে পরিণত হয়েছে।

অনুসন্ধানকালে হাজি মাজার বস্তির ভিতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে এক মধ্যবয়সি নারী প্রকাশ্যেই মাদক বিক্রি করছেন। দরদাম শেষে টাকা বাড়িয়ে দিতেই কোনো কথা না বলে তিনি ইয়াবা তুলে দেন ক্রেতার হাতে। এতে শুরুতেই এলাকায় মাদকের সহজলভ্যতার প্রমাণ পাওয়া যায়। পরে বস্তির বিভিন্ন চায়ের দোকানে বসে তরুণদের প্রকাশ্যে মাদক সেবন করতে দেখা যায়। তাদের কেউ আবার নেশায় বুঁদ হয়ে আছেন। মাজার ও একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশের গাছতলায় কয়েকজনকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

স্থানীয় শরবত বিক্রেতা রতন জানান, এখানে টাকা দিলেই মাদক পাওয়া যায়। তার ভাষ্য, দিনরাত ২৪ ঘণ্টাই চলে মাদক সেবন ও বিক্রি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের বিষয়ে স্থানীয়দের ভাষ্য আরও উদ্বেগজনক। জিমি ও মাহিন নামে দুই মাদকসেবী জানান, কোনো অভিযান হওয়ার অন্তত ১০ মিনিট আগেই খবর পৌঁছে যায়। ফলে দ্রুত মাদক ও সরঞ্জাম সরিয়ে ফেলা সম্ভব হয়। তাদের দাবি, অভিযানের সময় দোকানপাট ও আড্ডাস্থল সাময়িক বন্ধ থাকে। তবে কিছুক্ষণ পর আবার আগের মতো কার্যক্রম শুরু হয়। অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, বস্তিতে মাদক বিক্রির জন্য নির্দিষ্ট ‘কাউন্টার’ রয়েছে। বাইরে বসে থাকা বিক্রেতাদের কাছে টাকা দিলে ভিতর থেকে ইয়াবা ও গাঁজা সরবরাহ করা হয়। এমনকি নির্দিষ্ট কক্ষে বসে মাদক সেবনের ব্যবস্থাও রয়েছে। সেখানে জনপ্রতি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা নিয়ে কক্ষ ভাড়া দেওয়া হয়। নারী বিক্রেতাদের সক্রিয় উপস্থিতিও দেখা মেলে এসব আসরে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত বছর গাজীপুরে ১ হাজার ৩৫১টি অভিযানে জব্দ করা হয়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৬৪৫ পিস ইয়াবা, ৩০৫ কেজি গাঁজা, ১৬৫ কেজি চোলাই মদ ও ১০৬ বোতল ফেনসিডিল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, জব্দ মাদকের বড় অংশই এসেছে মাজার বস্তি থেকে।

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, বস্তির মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করেন বাবু ও লাইলী। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, তাদের ছত্রছায়াতেই বছরের পর বছর ধরে চলছে মাদকের অবৈধ কারবার। সেখানে কথিত এক লাইনম্যানের সঙ্গে গাজীপুর জেলা ডিবি পুলিশের এসআই ওয়ালীউল্লাহর মাসোহারা ব্যাপার রয়েছে। এ-সংক্রান্ত মোবাইল ফোনের কথোপকথনের একটি রেকর্ডে উঠে এসেছে। ফোনালাপে মাসিক ৪০ হাজার টাকা নিয়ে দর কষাকষি এবং টাকা না পেলে মামলা দেওয়ার হুমকির কথাও শোনা যায়। তবে ফোনালাপের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে গত ২১ মে আবারও বড় ধরনের অভিযান চালায় পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। তবে বস্তিজুড়ে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরা ও প্রবেশমুখের পাহারাদারদের কারণে অভিযানের খবর আগেই ছড়িয়ে পড়ে। ফলে হোতারা পালিয়ে যায়। ওই অভিযানে ১০ জনকে আটক করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই মাজার বস্তিতে মাদক ও জুয়ার বিস্তার ঘটলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তাদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে নয়, নিয়মিত নজরদারি, বস্তি উচ্ছেদ এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমেই মাদক ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।