Image description

মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে অতীতের সরকারগুলো। বিভিন্ন সময়ে হয়েছে মাদকবিরোধী বড় অভিযান। বর্তমান সরকারও একই নীতিতে বিশ্বাসী হয়ে চালাচ্ছে বিশেষ অভিযান। কিন্তু বন্ধ হচ্ছে না মাদকের বিস্তার। দেশজুড়ে এর জাল দিনদিন আরও শক্তিশালী হচ্ছে। শহর থেকে গ্রাম-কোথাও নিস্তার নেই।

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ২৫ কারণে লাগামহীন মাদক সিন্ডিকেট। এগুলোর মধ্যে আছে ভৌগোলিক অবস্থান, সীমান্ত গলদ, গডফাদারদের প্রভাব, আইনের ফাঁকফোকর, আকাশচুম্বী মুনাফা, ব্যাপক চাহিদা, পুনর্বাসন ও সচেতনতার অভাব, মানসিক হতাশা, নতুন মাদকের আবির্ভাব, রুটের পরিবর্তন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আসাধু সদস্যের যোগসাজশ, কিশোর গ্যাং, রাজনৈতিক ছত্রছায়া প্রভৃতি। আরও যেসব কারণ বেরিয়ে এসেছে তার মধ্যে রয়েছে-কারাগারে মাদকের অনুকূল পরিবেশ, সুস্থ বিনোদন ও কর্মসংস্থানের অভাব, ডোপ টেস্টের কার্যকারিতা না থাকা, পারিবারিক ও সামাজিক উদাসীনতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার, ডার্ক ওয়েব, রোহিঙ্গা ক্যাম্প, বাহকদের কৌশল পরিবর্তন, কৌতূহল এবং হিরোইজম ফ্যান্টাসি।

মাদকের বিস্তার রোধ এবং মাদকসেবীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে কাজ করছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) মোহাম্মদপুর বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) জুয়েল রানা। তিনি যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার রোধ করার সবচেয়ে প্রধান উপায় হলো এর প্রবেশ বন্ধ করা। কারণ, দেশে কোনো মাদক তৈরি হয় না। এগুলো বাইরে থেকে দেশে ঢুকানো হয়। তাই ভেতরের মাদকসেবী বা খুচরা বিক্রেতাদের ধরার চেয়ে সীমান্ত বা প্রবেশপথে মাদক আসা বন্ধ করা বেশি জরুরি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রতিবেশী দুটি দেশের সীমান্তের বহু পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিন দেশে ঢুকছে ইয়াবা, আইস, ফেনসিডিল ও হেরোইন। এসব মাদকের পেছনে রয়েছে অত্যন্ত প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। চুনোপুঁটি বা খুচরা বিক্রেতারা প্রায়ই ধরা পড়ে। কিন্তু নেপথ্যে থাকা মূল হোতা বা ‘গডফাদার’রা থেকে যায় পর্দার আড়ালে। তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব এতই বেশি যে, তাদের গায়ে আইনের আঁচড় সহজে লাগে না। মাঝেমধ্যে দুই-একজন গ্রেফতার হলেও জামিনে বেরিয়ে আসেন আইনের ফাঁক গলে। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণেও মাদক ব্যবসায়ীদের মনে শাস্তির ভয় কমে গেছে।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মাদক নির্মূলের দায়িত্বে থাকা কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও সদস্য এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। রক্ষক যখন ভক্ষক হয়, তখন মাদক রোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনেক সময় অভিযানের তথ্য আগেই পাচার হয়ে যায়। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানিয়েছে, বিগত বছরগুলোয় মাদক ব্যবসা, মাদকসেবন, অপরাধীদের আশ্রয় দেওয়া এবং মাদক দিয়ে সাধারণ মানুষকে ফাঁসানোর অভিযোগে কয়েক হাজার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ২০২০ সাল থেকে মাদকাসক্ত পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করতে ডোপ টেস্ট কার্যক্রম জোরালোভাবে শুরু হয়। ওই সময় কেবল ডিএমপিতেই শতাধিক পুলিশ সদস্যের ডোপ টেস্ট পজিটিভ আসে। পুলিশবাহিনীতে মাদকের ব্যাপারে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে মাদকের বিশাল অর্থনৈতিক লোভের কারণে এই প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না।

সূত্র জানায়, অল্প পুঁজিতে রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার নেশায় অনেকেই এই মরণ ব্যবসায় নেমেছে। বেকার যুবকদের টাকার লোভ দেখিয়ে মাদকের বাহক হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বেকারত্ব, পারিবারিক অশান্তি, প্রেমঘটিত ব্যর্থতা ও একাকিত্বের কারণে তরুণ প্রজন্মের অনেকে মাদকের দিকে ঝুঁকছে। কৌতূহল থেকে শুরু করে অনেকেই নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। পরে চড়া দামে মাদক কিনতে বাধ্য হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাদকাসক্তদের সুস্থধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য পর্যাপ্ত এবং মানসম্মত সরকারি নিরাময় কেন্দ্রের অভাব রয়েছে। বেসরকারি কেন্দ্রগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল। অনেক ক্ষেত্রে সেখানে অমানবিক আচরণ করা হয়। ফলে একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি সুস্থ হয়ে সমাজে ফেরার সহজ পথ পায় না। ইয়াবা ও ফেনসিডিলের পাশাপাশি বাজারে এসেছে ‘আইস’ (ক্রিস্টাল মেথ) এবং ‘এলএসডি’র মতো ভয়ংকর মাদক। এগুলো ওজনে হালকা এবং বহনে সহজ। মিয়ানমার ও ভারত সীমান্ত ছাড়াও এখন আকাশপথ এবং আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে নতুন প্রযুক্তির মাদক দেশে ঢুকছে।

মাদক ক্রেতা ও বিক্রেতারা যোগাযোগের জন্য ডার্ক ওয়েব, সিগন্যাল বা টেলিগ্রাম ব্যবহার করছে। এতে মাদক অপরাধীদের অবস্থান শনাক্ত করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো এখন মাদক চোরাচালানের অন্যতম বড় ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। মাদক বহনের ক্ষেত্রেও সিন্ডিকেটগুলো নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করছে। নারীদের গর্ভবতী সাজিয়ে, শিশুদের স্কুলব্যাগে, এমনকি পেটের ভেতরে ক্যাপসুল আকারে মাদক বহন করা হচ্ছে।

কারাগারের ভেতরের চিত্র আরও আশঙ্কাজনক। মাদক মামলায় যারা কারাগারে যাচ্ছে, তারা সেখানে গিয়ে বড় গডফাদারদের সংস্পর্শে আসছে। এ কারণে কারাগারগুলো এক প্রকার ‘মাদক ব্যবসার নেটওয়ার্কিং হাব’-এ পরিণত হয়েছে।

অনুসন্ধান বলছে, তরুণ প্রজন্মের বড় একটা অংশ আজ দিশেহারা। পাড়া-মহল্লায় খেলার মাঠ নেই। সুস্থ সাংস্কৃতিকচর্চার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষিত বেকারত্বের অভিশাপ। হতাশা থেকে তরুণরা মাদকের দিকে ঝুঁকছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয়ও নিয়মিত ডোপ টেস্টের ব্যবস্থা নেই। এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সিনিয়র বা অন্য সদস্যরা যখন মাদক গ্রহণ করে, তখন নতুন সদস্যদেরও তা গ্রহণের জন্য চাপ দেওয়া হয়। মাদক না নিলে তাকে ‘কাপুরুষ’ বা ‘দুর্বল’ বলে উপহাস করা হয়। মা-বাবার ডিভোর্স বা প্রতিনিয়ত পারিবারিক অশান্তির শিকার কিশোর-কিশোরীরা মানসিক ট্রমা থেকে বাঁচতে বা বাস্তবতাকে ভুলে থাকার মাধ্যম হিসাবে মাদককে বেছে নিচ্ছে বলে ওই পুলিশ কর্মকর্তা জানান।