দরজায় কড়া নাড়ছে ঈদুল আজহা। এই ঈদ ঘিরে এখন চাঙ্গা উৎসবের অর্থনীতি।
জানা যায়, বরাবরের মতো এবারও ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতিতে শুরু হয়েছে বিশাল এক মৌসুমি অর্থচক্র। কোরবানির পশু পালন, হাট ব্যবস্থাপনা, পরিবহন, পশুখাদ্য, চামড়াশিল্প, অনলাইন বেচাকেনা, মোবাইল ব্যাংকিং থেকে শুরু করে মসলা ও রান্নাবান্নার উপকরণ—সব মিলিয়ে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয় এই উৎসব ঘিরে।
অর্থনীতিবিদদের ধারণা, প্রতিবছর কোরবানিকে কেন্দ্র করে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়। পশু পালন, হাট ব্যবস্থাপনা, পরিবহন, পশুখাদ্য, অনলাইন বেচাকেনা, মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), জবাইসেবা, হিমায়িত সংরক্ষণ ব্যবস্থা, চামড়া সংগ্রহ ও গৃহস্থালি ভোগ—সব মিলিয়ে এটি দেশের অন্যতম বড় মৌসুমি অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়ী ও গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর এক কোটির বেশি গবাদি পশু কোরবানি করা হয়। এর বড় অংশই আসে দেশীয় খামারিদের কাছ থেকে। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে সরাসরি নগদ অর্থের প্রবাহ তৈরি হয়।
খামারিরা জানান, কয়েক বছর আগেও কোরবানির পশুর বাজারে ভারতীয় গরুর প্রভাব ছিল বেশি। কিন্তু বর্তমানে দেশীয় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে স্থানীয় খামারিরা উৎসাহিত হচ্ছেন। অনেক তরুণ উদ্যোক্তাও এখন বাণিজ্যিকভাবে গরু ও ছাগল পালন করছেন।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন পশুর হাট ঘিরে কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই জমে ওঠে ব্যবসা। হাট ইজারা, পরিবহন, অস্থায়ী দোকান, খাবারের স্টল, শ্রমিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা—সব মিলিয়ে বিশাল অঙ্কের অর্থনৈতিক কার্যক্রম তৈরি হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শুধু পশুর হাট থেকেই সরকারের রাজস্ব আয় হয় কয়েক শ কোটি টাকা।
এই প্রসঙ্গে উৎসবের অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ মামুন রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ঈদুল আজহা এখন শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং একটি বৃহৎ অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চক্রে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর কোরবানি ঘিরে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হয় বলে ধারণা করা হয়। এই বিশাল অর্থপ্রবাহ পশু পালন, হাট ব্যবস্থাপনা, পরিবহন, পশুখাদ্য, অনলাইন বেচাকেনা, মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস, জবাইসেবা, হিমায়িত সংরক্ষণ ব্যবস্থা, চামড়া সংগ্রহ, গৃহস্থালি ভোগসহ বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত। সব মিলিয়ে এটি দেশের অন্যতম প্রধান মৌসুমি অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।
চামড়াশিল্পে অপূর্ণ সম্ভাবনা
কোরবানির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সম্পৃক্ত খাতগুলোর একটি হচ্ছে চামড়াশিল্প। বছরের মোট কাঁচা চামড়ার বড় অংশ আসে ঈদুল আজহার সময়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এই খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ আরো বাড়তে পারে। তবে প্রতিবছরই চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, সংরক্ষণ সংকট এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়ে অভিযোগ ওঠে।
চামড়াশিল্পকে বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি খাত হিসেবে উল্লেখ করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বাংলাদেশের চামড়াশিল্পে ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) একাধিক নেতা জানান, দেশে প্রতিবছর এক কোটি থেকে এক কোটি ২০ লাখ পশু কোরবানি করা হয়। ঈদুল আজহায় দেশের মোট কাঁচা চামড়ার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ সংগ্রহ করা হয়।
বিটিএর সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাখাওয়াত উল্ল্যাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের উল্লেখযোগ্য চাহিদা থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় পর্যায়ে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে খাতটি এখনো তার পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছে না।
তিনি বলেন, ‘চামড়া খাত এখনো অপূর্ণ সম্ভাবনার একটি বড় ক্ষেত্র। একসময় চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি আয় এক বিলিয়ন ডলার ছাড়ালেও বর্তমানে তা কমে ৮০ থেকে ৯০ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। দুর্বল সংরক্ষণ ব্যবস্থা, অকার্যকর সাপ্লাই চেইন এবং পরিবেশসম্মত ট্যানারি ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এ খাতের প্রবৃদ্ধিকে সীমিত করে রেখেছে।’
তাঁর মতে, সংরক্ষণ সংকট, অকার্যকর সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ট্যানারি খাতে পরিবেশগত ঘাটতি—সব মিলিয়ে এই শিল্পের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধান করা গেলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক চামড়া বাজারে আরো শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
অনলাইনে কোরবানির পশু বিক্রির প্রসার
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোরবানির পশু বিক্রিতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শহুরে ক্রেতাদের মধ্যে অনলাইনে পশু কেনাবেচা ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অনলাইনে প্রায় ৮৫ হাজার ৬২৬টি কোরবানির পশু বিক্রি হয়েছে, যার মোট লেনদেনের পরিমাণ প্রায় পাঁচ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা। মোট কোরবানির পশুর বাজারের প্রায় ০.৯৪ শতাংশ এখন অনলাইনের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে।
বিক্রয় ডটকম প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অনেক খামারি ও ব্যবসায়ী এখন অনলাইনে কোরবানির পশু বিক্রি করছেন। এর মধ্যে অন্যতম অ্যাশিউর্যান্স ফার্মস। প্রতিষ্ঠানটির খামার ময়মনসিংহের ভালুকায় হলেও তারা ঢাকায় ডেইরি পণ্য সরবরাহের পাশাপাশি অনলাইনে কোরবানির পশুও বিক্রি করছে।
প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র এক্সিকিউটিভ (অপারেশন) রাকিবুল ইসলাম জানান, ২০২৪ সাল থেকে তারা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পশু বিক্রি শুরু করেন। এ বছর তাঁদের স্টকে ২৫০টি গরু রয়েছে, এরই মধ্যে ১০০টির বেশি বিক্রিও হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘অনেক ক্রেতা আগে গরু কিনতে চান না, কারণ তখন লালন-পালনের ঝামেলা থাকে। তাই আমরা অনলাইনে বুকিং নিয়ে ঈদ পর্যন্ত গরুগুলো নিজেদের তত্ত্বাবধানে পালন করি। পরে ঈদের দিন বা আগের দিন ঢাকায় বিনামূল্যে ডেলিভারি দিই। এতে ক্রেতাদের হাটে যাওয়ার ঝামেলাও থাকে না। বিশেষ করে গুলশান, বনানী ও বারিধারা এলাকায় ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।’
ঢাকার বিভিন্ন খামারভিত্তিক প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, গুলশান, বনানী ও বারিধারা এলাকায় অনলাইন পশু বিক্রির চাহিদা তুলনামূলকভাবে বেশি। এই পরিবর্তন বাজার ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং ক্রেতাদের জন্য হাটে গিয়ে পশু কেনার ঝামেলা কমিয়েছে।
ঈদে বাড়ে মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন
কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে মোবাইল ব্যাংকিংয়েও ব্যাপক লেনদেন বৃদ্ধি পায়। বিকাশ, নগদ, রকেটসহ বিভিন্ন মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে পশু কেনাবেচা, অগ্রিম বুকিং, পরিবহনভাড়া ও শ্রমিক মজুরি পরিশোধ করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুতে দেশে মাসিক মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে লেনদেন দাঁড়ায় প্রায় এক লাখ ৭১ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা। ঈদ মৌসুমে এই লেনদেন আরো কয়েক হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পায় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার প্রসারের ফলে কোরবানির পশু কেনাবেচায় স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা বেড়েছে। একই সঙ্গে নগদ অর্থ বহনের ঝুঁকিও কমেছে।
পশু পরিবহনে বাড়তি ব্যয়
বাংলাদেশে কোরবানির পশু পরিবহন খরচ প্রতিবছরই বড় একটি অর্থনৈতিক খাত তৈরি করে। খামার থেকে হাট এবং হাট থেকে শহরে পশু আনতে ট্রাক, পিকআপ, ট্রেন ও নৌপথ ব্যবহার করা হয়। ২০২৬ সালে জ্বালানি ও ভাড়া বৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয় আরো বেড়েছে বলে জানিয়েছেন খামারিরা।
সাধারণভাবে জেলা থেকে ঢাকায় একটি গরু আনতে পরিবহন খরচ পড়ে তিন হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। দূরত্ব, ট্রাকের আকার এবং পশুর সংখ্যার ওপর এই ব্যয় নির্ভর করে। ছোট পিকআপের ভাড়া ঢাকার মধ্যে দু-এক হাজার টাকার মধ্যে হলেও দূরপাল্লায় বড় ট্রাকের ভাড়া কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোরবানির মৌসুমে পশু পরিবহন খাতেই কয়েক শ কোটি টাকার লেনদেন হয়। এতে ট্রাকচালক, হেল্পার, লোড-আনলোড শ্রমিক এবং অস্থায়ী পরিবহনকর্মীদের ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি হয়।
মৌসুমি কর্মসংস্থানে লাখো মানুষের আয়
এই পুরো অর্থনৈতিক চক্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কর্মসংস্থান। বিভিন্ন গবেষণা ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে ৫০ লাখ থেকে এক কোটি মানুষের জন্য মৌসুমি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে রয়েছেন পশু পরিবহন শ্রমিক, হাট ব্যবস্থাপক, নিরাপত্তাকর্মী, জবাইসেবাকর্মী, চামড়া সংগ্রহকারী এবং অস্থায়ী দোকানকর্মী।
এই কর্মসংস্থানগুলো অনেক ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি হলেও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়ের সুযোগ তৈরি করে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় এটি নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়ায়, যা স্থানীয় বাজার ও ভোগব্যবস্থাকে সক্রিয় রাখে।
শ্রমিক অধিকার বিশেষজ্ঞ, অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্রম সংস্কার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, কোরবানির সময় দেশে বিশাল একটি মৌসুমি শ্রমবাজার তৈরি হয়। এ সময়ে হাজার কোটি টাকার মজুরি শ্রমিকদের মধ্যে লেনদেন হয়।
তিনি জানান, দেশে প্রতিবছর প্রায় এক কোটি গরু কোরবানি করা হয়। প্রতিটি গরু জবাই, পরিষ্কার ও মাংস সংরক্ষণের কাজে গড়ে তিনজন শ্রমিক অংশ নেন। এক লাখ টাকা মূল্যের একটি গরু জবাই ও পরিষ্কার করতে কসাই বা মৌসুমি শ্রমিকদের প্রায় ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি দিতে হয়। সেই হিসাবে কোরবানিকে কেন্দ্র করে প্রায় তিন কোটি শ্রমঘণ্টার সমপরিমাণ কর্মসংস্থান তৈরি হয় এবং কোরবানিদাতাদের প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা শ্রমিক মজুরি বাবদ ব্যয় করতে হয়।
তবে তিনি বলেন, গ্রামীণ এলাকায় অনেক পরিবার নিজেরাই কোরবানির কাজ সম্পন্ন করে থাকে, ফলে বাস্তব পরিসংখ্যানে কিছুটা তারতম্য থাকতে পারে। একই সঙ্গে তিনি শ্রমিকদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তাঁর মতে, কোরবানিকেন্দ্রিক এই মৌসুমি শ্রমবাজার দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এ খাতে সুরক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।