Image description

দেশ জুড়ে একের পর এক শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ ও আতঙ্ক চারপাশে। কোনোভাবেই লাগাম টানা যাচ্ছে না এসব নির্মম অপরাধের। প্রতিশোধ, হতাশা বা ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে নিজের সন্তানকে হত্যা। গত সাড়ে চার মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১১৮ শিশু। গত এক সপ্তাহে অন্তত চার শিশুকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। রাজধানী ঢাকা, সিলেট, ঠাকুরগাঁও ও মুন্সীগঞ্জে ঘটে যাওয়া এসব নির্মম হত্যাকাণ্ডে সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযুক্তরা ছিল শিশুদের পরিচিত মানুষ, যা অভিভাবকদের নিরাপত্তা-শঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। যাদের হাত ধরে বেড়ে ওঠার কথা, কখনো সেই হাতই হয়ে উঠছে মৃত্যুর কারণ। একটি বেসরকারি সংস্থার তথ্যমতে গত ১৬ মাসে হত্যার শিকার হয়েছে অন্তত ৫২৫ শিশু।

সর্বশেষ গত ১৯শে মে রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করে প্রতিবেশী সোহেল রানা। এ ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সারা দেশের মানুষকে শোকাহত করে চোখের পানি ঝরিয়েছে। নিজ বিল্ডিংয়ে নিরাপদ থাকতে পারেনি শিশুটি। ইয়াবা খেয়ে সোহেল রানা ধর্ষণ করে শিশুটিকে হত্যা করে। এ সময়ে শিশুটির মা ফ্ল্যাটের সামনে জুতা দেখে দরজায় ধাক্কাধাক্কি শুরু করলে সোহেল শিশুটির লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে শিশুটির মাথা কেটে বাথরুমে বালতিতে রেখে দেয়, আর দেহ খাটের নিচে রেখে দেয়। ঘটনার সময় সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না বাসায় থাকলেও স্বামীকে বিন্দুমাত্র বাধা দেয়নি। উল্টো স্বামীকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুহত্যা থামাতে শুধু আইন নয়; দরকার পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের একসঙ্গে দাঁড়ানো। দুর্বল হওয়ায় শিশুদের টার্গেট করে হত্যা করা হচ্ছে। শিশুদের প্রতি ধর্ষণ, হত্যা ও অন্যান্য সহিংসতা বৃদ্ধির প্রধান কারণ বিচারহীনতা। অতীতে সংঘটিত অপরাধগুলোর দ্রুত ও পরিপূর্ণ বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার সাহস পায় এবং নতুন অপরাধে উৎসাহিত হয়। শুধু মামলা বা গ্রেপ্তার নয়, বিচার সম্পন্ন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। এ ছাড়া সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, মাদকাসক্তির বিস্তার, বিকৃত, অপরাধ করে পার পাওয়ার প্রবণতা, অপরাধ প্রতিরোধে মানুষের অনীহা এবং নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভয় ও সহিংসতা বৃদ্ধির কারণ। দ্রুত বিচার, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা তৈরি করতে পারলে এ ধরনের অপরাধ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, গত ১লা জানুয়ারি থেকে ২০শে মে পর্যন্ত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ৪৬ শিশু। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ১৪ শিশু এবং ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হয়েছে তিন শিশুকে। ধর্ষণের শিকার দুই শিশু আত্মহত্যা করেছে। চলতি মাসে ২০ দিনে (১ থেকে ২০শে মে পর্যন্ত) ধর্ষণের শিকার হয়েছে ২৪ শিশু। ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ১২ জন এবং ধর্ষণের ঘটনায় পাঁচজনকে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ঘটনায় জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ১১৫ শিশু খুন হয়েছে।

শিশু রামিসাকে হত্যার দিন রামপুরা বনশ্রীর কোরআন ইন্টারন্যাশনাল হিফজ মাদ্রাসার টয়লেট থেকে ছাত্র আব্দুল্লাহর (১০) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরিবারের অভিযোগ, আব্দুল্লাহকে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশও বলছে, শিশুটির পায়ুপথ ছিল অস্বাভাবিক। বলাৎকার হওয়ার পর আত্মহত্যা করতে পারে শিশুটি। এর রেশ কাটতে না কাটতেই ২১শে মে চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় চার বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ করে দোকানের কর্মচারী মনির। এ সময় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়ার সময় এলাকাবাসী তাকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ ও এলাকাবাসীর সঙ্গে সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। গত ১৪ই মে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলায় লামিয়া আক্তার নামে চার বছরের এক শিশুকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় অভিযুক্ত মুরসালিনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর দু’দিন পর গত ১৬ই মে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় ১০ বছরের আছিয়া আক্তারকে। এ ঘটনায় মেয়েটির সৎ মামা রাজা মিয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তিনি ৬ বছর ধরে শিশুটির পরিবারের সঙ্গে একই বাড়িতে বসবাস করে আসছিলেন। এর আগে ৬ই মে সিলেট সদর উপজেলার জালালাবাদে ৪ বছরের শিশু ফাহিমা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা টিপে হত্যা করে প্রতিবেশী জাকির হোসেন।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জাকির জানায়, ইয়াবা সেবনের পর জাকির শিশুটিকে ধর্ষণ করে। এ সময় শিশুটি অজ্ঞান হয়ে পড়লে ধরা পড়ার ভয়ে সে গলা টিপে হত্যা করে শিশুটির নিথর দেহ সুটকেসে লুকিয়ে রাখে। ঘটনার পর এলাকাবাসী যখন শিশুটিকে খুঁজছিল তখন অভিযুক্ত জাকিরও তাদের সঙ্গে ছিল। হত্যার দু’দিন পর পাশের একটি ডোবা থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ২৭শে ফেব্রুয়ারি দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে সাত বছর বয়সী শিশু সিরাজুল আল সামসকে হত্যার ঘটনা ঘটে। তার ছোট শরীরের এমন কোনো স্থান বাদ নেই, যেখানে আঘাতের চিহ্ন নেই। সামসকে প্রথমে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপর পায়ের রগ কেটে, ছুরি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হয় পুরো শরীর। পারিবারিক কোন্দলে তার চাচাতো ভাই আমানুর ইসলাম এভাবে হত্যা করে শিশুটিকে। গত ২৪শে এপ্রিল ফরিদপুরের বাখুণ্ডা আশ্রয়ণ প্রকল্পে সাত বছরের শিশু আইরিন আক্তার কবিতাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে হত্যা করে মাদকাসক্ত যুবক ইসরাফিল মৃধা। হত্যার পর শিশুটিকে পাশের বাড়ির শৌচাগারের সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে ফেলে দেয় সে। 

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, শিশুদের প্রতি ধর্ষণ, হত্যা ও অন্যান্য সহিংসতা বৃদ্ধির প্রধান কারণ বিচারহীনতা। অতীতে সংঘটিত অপরাধগুলোর দ্রুত ও পরিপূর্ণ বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার সাহস পায় এবং নতুন অপরাধে উৎসাহিত হয়। তিনি বলেন, শুধু মামলা বা গ্রেপ্তার নয়, বিচার সম্পন্ন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। মাগুরার আছিয়া হত্যাকাণ্ড-এর কথা উল্লেখ করে বলেন, ওই ঘটনার সময়ও দ্রুত বিচারের দাবি উঠেছিল, কিন্তু প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার এখনো শেষ হয়নি। এ ছাড়া সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, অপরাধ প্রতিরোধে মানুষের অনীহা এবং নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভয় ও সহিংসতা বৃদ্ধির কারণ। অনেক মানুষ অপরাধ দেখেও বাধা দেয় না।

সমাজের একাংশ এখনো নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করে, যা সমস্যাকে আরও বাড়ায়। দ্রুত বিচার, কঠোর আইনপ্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা তৈরি করতে পারলে এ ধরনের অপরাধ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। দ্রুত বিচার সম্পন্ন হলে সমাজে একটি শক্ত বার্তা যায়, যা সম্ভাব্য অপরাধীদের সতর্ক করে। তখন অন্যান্য এই ধরনের অপরাধমনস্ক বা অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের অপরাধ করা থেকে সে দূরে রাখে বা সতর্ক রাখে। এই পরিস্থিতিগুলো বা এই বিষয়গুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে এটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি, মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসেন বলেন, প্রতিটি হত্যার ঘটনা গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হয়। শিশুদের বিষয়টি তো আরও স্পর্শকাতর। এমন ঘটনায় যারাই জড়িত থাকুক, তাদের আইনের আওতায় আনা হয়। কঠোর বিচার যেন হয়, তাই দ্রুত চার্জশিট দেয়া হয়। তার মতে, সামাজিক অস্থিরতা শিশু নির্যাতন ও হত্যার অন্যতম প্রধান কারণ।