দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান চালিকাশক্তি কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে কয়লা পরিবহন খাতে অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। সুনির্দিষ্ট নীতিমালা এবং নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা থাকা সত্ত্বেও এসব অমান্য করে কতিপয় মধ্যস্বত্বভোগী লজিস্টিক্স কোম্পানির সিন্ডিকেটের কারণে লোকসানে পড়ছেন লাইটার জাহাজ মালিকরা। সিন্ডিকেটের লাইটার জাহাজ নেই। তারা বিভিন্ন মালিক থেকে জাহাজ ভাড়া নেয়। কিন্তু জাহাজ মালিকদের ন্যায্য ভাড়া পরিশোধ করে না। অপরদিকে জাহাজ মালিকরাও সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর চাপে জাহাজ ভাড়া দিতে বাধ্য হয়। একদিকে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য ও আকাশচুম্বী পরিচালনা ব্যয়ের বিপরীতে সিন্ডিকেট সংকটের কারণে কয়লা বহনকারী জাহাজ মালিকরা এখন দিশাহারা। তাদের দাবি, মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের প্রভাবমুক্ত না করতে পারলে লাইটার জাহাজ পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে। এর ফলে কয়লা পরিবহনে ভয়াবহ সংকট দেখা দিতে পারে। রামপাল ও পায়রার মতো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হয়ে তীব্র লোডশেডিংসহ বিদ্যুৎ খাতে বিপর্যয় দেখা দেবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা যায়, বর্তমানে দেশে ৫টি কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে একমাত্র মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়া বাকি কেন্দ্রগুলোতে ভৌগোলিক ও নদীর নাব্য সংকটের কারণে সরাসরি কয়লাবাহী ‘মাদার ভ্যাসেল’ বা বড় জাহাজ ভিড়তে পারে না। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর থেকে লাইটারেজ (ছোট জাহাজ) জাহাজের মাধ্যমে কয়লা খালাস করে নদীপথে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নিয়ে যেতে হয়। কিন্তু রামপাল বা পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা খালাসের কাজে ব্যবহৃত ক্রেনের ‘গ্রাব’ তুলনামূলক বড়, যা প্রায় ৩৫ কিউবিক মিটার আয়তনের। ফলে সাধারণ এক-দুই হাজার টনের ছোট লাইটার জাহাজগুলোর হ্যাজ বা খোপ ছোট হওয়ায় ওই সব ক্রেনের গ্রাব সেখানে প্রবেশ করতে পারে না। তবে বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি) বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে প্রায়শ ছোট জাহাজ বরাদ্দ দেয়, যা বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা খালাসের অনুপযোগী। এই সুযোগে বিডব্লিউটিসিসির যোগসাজশে কিছু মধ্যস্বত্বভোগী লজিস্টিক্স কোম্পানি গড়ে তুলেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
জাহাজ পরিচালনাকারী মালিকপক্ষের অভিযোগ : পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ দুই ব্যবসায়ীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানসহ কিছু প্রতিষ্ঠান এই সিন্ডিকেটে যুক্ত। এদের মধ্যে কিউএনএস শিপিং লজিস্টিক্সের চেয়ারম্যান নুরুল কাইয়ুম খান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘ সময় ডিপো মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা) সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে শফিকুল আলম জুয়েলের মালিকানাধীন এএমএমএস গ্রুপ আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে ভারী যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন পণ্য সরবরাহ করে। ভুক্তভোগী জাহাজ মালিকরা জানান, রামপাল বা পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল ঠিকাদার থেকে কয়লা পরিবহনের সাব-কন্ট্রাক্ট পায় এই প্রতিষ্ঠানগুলো। কিন্তু তাদের নিজেদের পর্যাপ্ত লাইটার জাহাজ নেই। ফলে তারা বিডব্লিউটিসিসির নিয়ম অমান্য করে বিভিন্ন মালিক থেকে জাহাজ ভাড়া নেয়।
এ ক্ষেত্রে জাহাজ মালিকের ন্যায্য ভাড়া তারা পরিশোধ করে না। জাহাজ মালিকরাও সংশ্লিষ্ট সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর চাপে জাহাজ ভাড়া দিতে বাধ্য হয়। ভুক্তভোগীরা জানান, মধ্যস্বত্বভোগী কোম্পানিগুলো জাহাজ ভাড়া নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে মোংলা বা পায়রা রুটে কয়লা পরিবহনে নৌপরিবহন অধিদপ্তর ও বিডব্লিউটিসিসির টনপ্রতি নির্ধারিত যে ভাড়া, তার অর্ধেক ধরিয়ে দিচ্ছে। এ বিষয়ে ইনল্যান্ড ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব চিটাগংয়ের (আইভোয়াক) ভাইস চেয়ারম্যান পারভেজ আহমেদ মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, যারা মূল ঠিকাদারদের কাছ থেকে সাব-কন্ট্রাক্ট নেয়, তাদের নিজস্ব জাহাজের সংখ্যা কম। ফলে তারা লাইটার মালিকের জাহাজ সরাসরি কম ভাড়ায় চালিয়ে আসছিল, যা এ খাতে অস্থিরতা তৈরি করছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে কিউএনএস শিপিং লজিস্টিক্সের চেয়ারম্যান নুরুল কাইয়ুম খান। তিনি বলেন, কয়লা বহনকারী লাইটার জাহাজের ভাড়া মালিক পক্ষের সম্মতিতে নির্ধারণ করা হয়। এএমএমএস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুল আলম জুয়েলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
অর্ধেক ভাড়া সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ : মধ্যস্বত্বভোগী কোম্পানির সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে গত ১৭ মে বিক্ষোভ করেছেন জাহাজ মালিকরা। তারা এ সময় বিডব্লিউটিসিসির নীতিমালা শতভাগ কার্যকরের দাবি জানান। পরে মালিকপক্ষের সঙ্গে ওইদিনই জরুরি বৈঠক করে নৌপরিবহন অধিদপ্তর। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিডব্লিউটিসিসির আহ্বায়ক শফিক আহমেদ বলেন, পায়রা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জাহাজ পরিবহনের জন্য নৌপরিবহন অধিদপ্তর আলাদা সিরিয়াল পুল করে দেবে। ভাড়াও সরকার নির্ধারণ করে দেবে। বিডব্লিউটিসিসির অধীনে ১ হাজারের বেশি লাইটার জাহাজ রয়েছে। এর বাইরে বড় শিল্পকারখানার মালিকদের নিজস্ব লাইটার জাহাজ রয়েছে। সেগুলো নিজস্ব কাঁচামাল বা পণ্য পরিবহন করে। সরকারি গেজেটে পরিষ্কার বলা আছে, বাকি সব লাইটার জাহাজ বিডব্লিউটিসিসির সিরিয়ালে বা পুলে চলবে। নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের চিফ ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ার (রুটিন দায়িত্ব) মির্জা সাইফুর রহমান বলেন, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তদারকি করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। আশা করছি, মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।