ওয়ান-ইলেভেন সৃষ্টি ও দেশকে অস্থিতিশীল করে বিরাজনীতিকরণ করার কুচক্রীদের মধ্যে এখন পর্যন্ত সাবেক তিন সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু যারা এই প্লট তৈরি করে তারেক রহমানকে নির্যাতন করে দেশছাড়া করেছিলেন সেই শীর্ষ সু-শীলরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। শীর্ষ সু-শীলদের একজন হলেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান এবং অন্যজন ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম। তাঁরা এখনো পুরোপুরি প্রকাশ্যেই রয়েছেন। কোনো আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ায় রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সাবেক সেনা কর্মকর্তা অনেকেরই প্রশ্ন-ওয়ান-ইলেভেন সৃষ্টির জন্য সামরিক বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনা হলে বেসামরিক সু-শীলরা কেন বিচারের বাইরে থাকবেন?
সম্প্রতি এক-এগারোর অন্যতম মূল সামরিক পরিকল্পনাকারী তথা বিতর্কিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, শেখ মামুন খালেদ এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) মো. আফজাল নাছের গ্রেপ্তার হওয়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি গ্রেপ্তার অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, শেখ মামুন খালেদ এবং মো. আফজাল নাছেরকে রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। গোয়েন্দাদের জেরার মুখে তাঁরা তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদসহ এক-এগারো সরকারের নেপথ্যে থাকা সু-শীল সমাজের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম প্রকাশ করেছেন। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদে উঠে এসেছে কীভাবে মাইনাস ফর্মুলা বাস্তবায়ন এবং বিরাজনীতিকরণের ছক কষা হয়েছিল। এ তালিকায় অবধারিতভাবেই দেশের শীর্ষস্থানীয় দুটি ইংরেজি ও বাংলা দৈনিকের সম্পাদকের নাম নতুন করে আলোচনায় আসে।
সূত্র জানান, এক-এগারোর সামরিক কুশীলবরা নজরদারি ও আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় এলেও এই দুই প্রভাবশালী মিডিয়া ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি পদক্ষেপ বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি না হওয়ায় জনমনে নানান প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ’সহ দেশের একাধিক রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন এই দুই সু-শীল ব্যক্তিত্বকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেপ্তারের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়ে আসছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ২০০৭ সালে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে ধ্বংস করতে এবং শীর্ষ নেতাদের মাইনাস করার পেছনে এই দুই সম্পাদক তাঁদের লেখনী ও মিডিয়া হাউসকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। জানা গেছে, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে সু-শীল সমাজের একটি অংশ, সেনাবাহিনীর কিছু শীর্ষ কর্মকর্তা মিলে বিদেশি ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছিল।
এ ষড়যন্ত্রের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের গণতন্ত্র এবং উন্নয়ন চিরতরে ধ্বংস করা। তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ এবং সু-শীল সমাজের প্রতিনিধি ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে এই সরকারের প্রধান কাজ ছিল বাংলাদেশের জনগণের অধিকার হরণ করা। দেশকে পিছিয়ে দেওয়া। এই সরকার ক্ষমতা দখলের পর থেকেই রাজনৈতিক নেতাদের ওপর নেমে আসে জুলুম এবং নির্যাতন। এই সরকারের তাত্ত্বিক ভিত্তি দিয়েছিল দেশের প্রভাবশালী ও শীর্ষস্থানীয় দুটি সংবাদপত্র। সু-শীল সমাজের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত এই সংবাদপত্র দুটি মাইনাস ফর্মুলার তত্ত্ব প্রবর্তন করে। মাইনাস ফর্মুলা নিয়ে সম্পাদকীয়র মাধ্যমে তারা তৎকালীন সরকারকে বিরাজনীতিকরণের পথ দেখায়। এই সময়ে একের পর এক রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেপ্তার করে মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে তাঁদের চরিত্রহননের নীলনকশা বাস্তবায়নের চেষ্টা করে। দেশকে রাজনীতিশূন্য করে, বিদেশি তাঁবেদার রাষ্ট্র বানানোই ছিল মইন-ফখরুদ্দীন সরকারের প্রধান লক্ষ্য। শুধু তাই নয়, দেশকে নেতৃত্বশূন্য করতে আজকের প্রধানমন্ত্রী ও বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানকে মিথ্যা অভিযোগে গ্রেপ্তার করে। তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করে অমানবিক নির্যাতন করা হয়।
এক-এগারোর দেশবিরোধী সরকার বাংলাদেশে দেশপ্রেমিক, জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তিকে নিঃশেষ করতে চেয়েছিল। এ কারণেই বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমানকেও বিনা অপরাধে গ্রেপ্তার করে নির্যাতন করে। এ সময় সংস্কার প্রস্তাবের নামে বিএনপি ভাঙারও ষড়যন্ত্র হয়েছিল। এর আগে প্রথম আলো পত্রিকায় ‘তারেকের দুর্নীতির বিচার হতে হবে’ শিরোনামে মতিউর রহমান মন্তব্য প্রতিবেদন লিখেছিলেন। প্রথম আলোয় ‘মার্শাল ডিস্টিলারিজ কবজায় নিয়ে তারেক-মামুনের চাঁদাবাজি’ শিরোনামে লিড নিউজ করা হয়। এমন আরও অসংখ্য প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রথম আলো এবং দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকা। এ অবস্থায় তীব্র সমালোচনা ও বিচারের দাবির মুখেও মতিউর রহমান ও মাহফুজ আনাম এখনো কোনো আত্মগোপনে যাননি। তাঁরা রাজধানীতে বহাল তবিয়তে অবস্থান করছেন। তাঁদের এ স্বাভাবিক চলাফেরা এক-এগারোর ভুক্তভোগী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের মাঝে এক ধরনের হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। রাজনীতি বিশ্লেষক ও সাবেক সেনাকর্মকর্তাদের মতে এক-এগারোর মতো একটি অসাংবিধানিক ও বিতর্কিত শাসনব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে শুধু সামরিক কর্মকর্তাদের ধরলেই হবে না। যে সু-শীল সমাজ ও মিডিয়া মোগলরা সেই সরকারের পক্ষে জনমত তৈরি করেছিল এবং মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালিয়েছিল তাদেরও বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। অন্যথায় এ বিচারপ্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।