রাজধানীর বাড্ডার বাসিন্দা প্রকৌশলী সাদিকুর রহমান (৩৫) অফিসে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হলে দেখতে পান একটি কুকুর আর বিড়াল মারামারি করছে। প্রাণীপ্রেমী সাদিকুর কুকুরকে তাড়িয়ে বিড়ালকে হাত দিয়ে সরিয়ে নেন। কিন্তু এ সময় বিড়ালটি তার হাতে কামড় দিয়ে ড্রেনের ওপর স্থাপিত একটা চায়ের দোকানের পাটাতনের নিচে গিয়ে পালিয়ে যায়। এরপর তিনি অফিসে চলে যান। কয়েকদিন পর কামড়ের জায়গা না শুকালে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খান। ওই চায়ের দোকানে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন যে বিড়ালটিও মারা গেছে। সপ্তাহ দুয়েক পর গোসল করতে গিয়ে তিনি কোনোভাবেই পানি সহ্য করতে পারছিলেন না। পরের দিন ফ্যানের বাতাস, পানি কোনোটা সহ্য করতে না পারলে স্বজনরা তাকে রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান যে তিনি জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়েছেন। বিড়াল কামড় দিলেও তিনি টিকা নেননি। জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ওই তরুণ প্রকৌশলী।
রাজধানীসহ সারা দেশে কুকুর-বিড়ালের কামড়ে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে প্রতিদিন ৫০০-৭০০ জন আসেন কুকুর-বিড়ালের কামড় দেওয়ায় টিকা নেওয়ার জন্য। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রব বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে সম্প্রতি গাইবান্ধায় কুকুরের কামড়ে পাঁচজনের মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে চলছে আলোচনা।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের পাঁচ মাসে শুধু সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে কুকুর-বিড়ালের কামড়ে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০২৫ সালে এই হাসপাতালে মারা গেছেন ৫৯ জন এবং সারা দেশে মারা গেছেন ৬২ জন। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. শ্রীবাস পাল বলেন, কুকুর, বিড়াল, বেজি ও শিয়াল এই চার প্রাণীর কামড়ে দেশে জলাতঙ্ক ছড়ায়। তাই এসব প্রাণী কামড় দিলে দ্রুত ক্ষতস্থান সাবান কিংবা ডিটারজেন্ট দিয়ে ১৫-২০ মিনিট পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুতে হবে। এরপর যতদ্রুত সম্ভব টিকা দিতে হবে। শরীরের কোনো জায়গায় কামড় দিলে ভাইরাস ধীরে ধীরে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। কিন্তু মাথার কাছাকাছি জায়গায় কামড় দিলে ভাইরাস দ্রুত মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক রোগী টিকার ডোজ সম্পন্ন করেন না। এতে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।’ এদিকে বেওয়ারিশ কুকুরের কামড়ে সারা দেশে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।
কিন্তু ২০২২ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে বেওয়ারিশ কুকুরের টিকা কার্যক্রম। থমকে আছে কুকুরের জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমও। এ ছাড়া দেশে এখন কুকুর-বিড়াল পালনের হারও বেড়েছে। তবে নেই কোনো নীতিমালা। ঘরে-বাইরে সবখানেই রয়েছে প্রাণঘাতী জলাতঙ্কের ঝুঁকি। নতুন করে আতঙ্ক বাড়িয়েছে এই রোগে আক্রান্তের হার ও মৃত্যু বৃদ্ধি। এ ব্যাপারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, বেওয়ারিশ কুকুরকে দেওয়ার টিকা এখন নেই। কারণ এই টিকা সরকার আমাদের সরবরাহ করত। ২০২২ সালে শেষবার সরবরাহ করেছিল। এখন আবার টিকা কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কেনার পর আমাদের দিলে আমরা কার্যক্রম শুরু করব।’ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন কোষ শাখার প্রধান ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘বেওয়ারিশ কুকুরকে টিকা দেওয়া এবং পুরুষ কুকুরদের জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য একটি পাইলট প্রকল্প পাস হয়েছে। এখনো পিডি নিয়োগ হয়নি। পিডি নিয়োগ হলে হয়তো জুলাই থেকে কার্যক্রম শুরু হবে। তিন বছরের এই পাইলট প্রকল্প রাজধানীতে চলবে। এরপর সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হবে।’