বাংলাদেশ সামষ্টিক অর্থনীতি একটি নতুন রাজনৈতিক পটভূমিতে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে-চড়া মূল্যস্ফীতির চাপ, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে স্থবিরতা, সুশাসনের অভাব এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির অনিশ্চয়তা। এসব কারণে অর্থনৈতিক খাতে চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। এর মধ্যে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য উত্তেজনা, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্কজনিত ধাক্কার কারণে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে বৈদেশিক খাত থেকেও চ্যালেঞ্জ আসতে পারে।
এসব কারণে আমদানি ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে। মূল্যস্ফীতির হার আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। তবে প্রতিবেদনে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলা হয়, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে মন্থরগতি, কঠোর মুদ্রানীতি ও সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অর্থ ব্যয়ের ফলে মূল্যস্ফীতির হার আগামীতে কিছুটা কমতে পারে। বুধবার প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সার্বিক চিত্র ও নিকটবর্তী এবং মধ্যমেয়াদে অর্থনীতি কেমন হতে পারে তার একটি পূর্বাভাস তুলে ধরা হয়।
এতে বলা হয়, বাংলাদেশের অর্থনীতি বেশ কয়েক বছর ধরেই নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। এর মধ্যে সম্প্রতি দেশে একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উত্তরাধিকার সূত্রেই অর্থনীতিতে নানামুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট অস্থিরতা এই চ্যালেঞ্জগুলোকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। একটি নতুন রাজনৈতিক পটভূমিতে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বর্তমানে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। পাশাপাশি বিশ্ব বাণিজ্য উত্তেজনা, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত সম্ভাব্য শুল্কজনিত আঘাত অর্থনীতিকে আরও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এসব কারণে অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে বৈদেশিক খাত থেকেও আগামীতে চ্যালেঞ্জ আসতে পারে বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতির বিদ্যমান ও নিকটবর্তী চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে দীর্ঘ সময় ধরে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির ধারা এখনো রয়ে গেছে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে স্থবিরতা এখনো বিদ্যমান। বিভিন্ন খাতে সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতিতে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। এর পাশাপাশি আরও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেগুলো মোকাবিলা করে সামনে এগোতে হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বেসরকারি খাতের ধীরগতির বিনিয়োগ ও সামাজিক অস্থিরতা থেকে পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খলায় বাধার সৃষ্টি হয়েছে। নানা অস্থিরতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমেছে। ফলে বিদায়ি অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশে নেমেছে, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে বেশ কম। এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৪ দশমিক ২২ শতাংশ।
আগামীতে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়ায় আমদানির সঙ্গে দেশে মূল্যস্ফীতিও আমদানি হচ্ছে। ফলে আগামীতে মূল্যস্ফীতির হারে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যা মূলত নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি ও যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্কজনিত কারণে হতে পারে। শুল্কের কারণে রপ্তানি আয় কমলে ডলারের জোগানও কমে যেতে পারে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে চাপ সৃষ্টি হয়ে মূল্যস্ফীতিতে ধাক্কা লাগতে পারে।
অন্যদিকে দেশে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে কৃষি উৎপাদন বেড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমাতে পারে। তবে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কমলে, বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম স্থিতিশীল হলে এবং মুদ্রানীতির কার্যকারিতা বাড়ানো সম্ভব হলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও হ্রাস পেতে পারে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।
এতে বলা হয়, ঋণের উচ্চ সুদের হার, মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি ও তারল্য সংকটের কারণে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের গতি ছিল মন্থর। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি মন্থর, মার্কিন শুল্কের আঘাত, বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা এবং ভূরাজনৈতিক প্রকট অনিশ্চয়তাসহ বৈশ্বিক প্রতিকূলতা বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ার সম্ভাবনাকে সীমিত করে দিতে পারে।
তবে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ফলে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জ্বালানি ও যোগাযোগ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে উৎসাহিত করতে পারে। ফলে কর্মসংস্থানের হারও বাড়তে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বাভাসে কিছুটা সুখবর দিয়ে বলা হয়, চলতি অর্থবছরে রপ্তানি আয় ১০ শতাংশ, রেমিট্যান্স প্রবাহ ৮ শতাংশ, আমদানি ব্যয় ৮ শতাংশ বাড়তে পারে। ফলে অর্থবছর শেষে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এত আরও বলা হয়েছে, এই পূর্বাভাস বিশ্বব্যাপী চাহিদার পরিস্থিতি, পণ্যের দামের ওঠানামা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ নীতির ও পদক্ষেপগুলোর কার্যকারিতার ওপর নির্ভরশীল।
প্রতিবেদনে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলা হয়, মধ্যমেয়াদে টেকসই প্রবাসী আয়, বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার নমনীয় বিনিময় হারের ক্ষেত্রে বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে পারলে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের ওপর চাপ কমতে পারে। তবে বৈশ্বিক উত্তেজনা বৃদ্ধি, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং শুল্কজনিত আঘাতের কারণে বৈদেশিক খাতে চাপ তৈরি হতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজস্ব আয় কমায় সরকার ব্যাংক থেকে মাত্রাতিরিক্ত ঋণ নিচ্ছে। সরকারের অতিরিক্ত ঋণ বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। সরকারের রাজস্ব আহরণ দুর্বল হওয়ায় ঋণের চাপ থেকে মূল্যস্ফীতিতে চাপ বাড়াচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে মধ্যমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পাশাপাশি সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, দারিদ্র্য বিমোচন ও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। রাজস্ব আয় বাড়লে ঋণ কম দেবে, ব্যাংকের তারল্য বাড়বে। ঋণের সুদের হার কমে। তখন বেসরকারি খাত বাড়তি ঋণ নেবে। পাশাপাশি রাজস্ব আয় বাড়লে সরকার অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়াবে। তখন বেসরকারি খাতও বিনিয়োগে এগিয়ে আসবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার বৈশ্বিক নীতির অনিশ্চয়তার মধ্যেও চলতি অর্থবছরে সাড়ে ৫ শতাংশ জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য আশাবাদী। এ লক্ষ্য অর্জনে বেসরকারি খাতে আরও বিনিয়োগ বাড়ানো, বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।