কেওড়া, সুন্দরী, গরান আর গোলপাতার ঘন সবুজের প্রাকৃতিক বন সুন্দরবন। কোথাও গাছের ডাল ঝুঁকে পড়েছে নদীর বুকে, কোথাও খালের দুই পাশে তৈরি হয়েছে সবুজ সুড়ঙ্গপথ।
এই দূষণ অব্যাহত থাকলে সুন্দরবন তার স্বাভাবিক সুরক্ষা ক্ষমতা হারাতে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা।
সম্প্রতি প্রকাশিত ‘রিসেপ্টর মডেলিং অ্যান্ড মাল্টিভেরিয়েন্ট অ্যানালিসিস অব হেভি মেটাল ইন মাড সয়েল ফ্রম দ্য ট্যুরিজম-ইনটেনসিভ সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেম’ শীর্ষক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে আসে। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মাদ আবদুস সালামের নেতৃত্ব ও তত্ত্বাবধানে ১১ জন গবেষক এই গবেষণা পরিচালনা করেন।
গবেষকরা সুন্দরবনের ছয়টি পয়েন্ট করমজল, হাড়বাড়িয়া, কটকা, কচিখালী ও সুপ্তি পয়েন্ট থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছেন। আয়রন, তামা, সিসাসহ ৯ ধরনের ভারী ধাতুর উচ্চমাত্রার দূষণের উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকরা। মাটির উপরিভাগের ১০ সেন্টিমিটার স্তরেই এই ধাতুগুলোর ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি। এসব পয়েন্টের মধ্যে পাঁচটিতেই ভারী ধাতুর মারাত্মক দূষণ দেখা গেছে।
এসব ভারী ধাতুর বিভিন্ন উৎস চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা।
গবেষণায় দেখা গেছে, খুলনাসহ সুন্দরবনের উজানের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র, কলকারখানার বর্জ্য, খুলনা সিটি করপোরেশনের অপরিকল্পিত পয়োনিষ্কাশন ও নন-স্যানিটারি ল্যান্ডফিলের বর্জ্য, উজানের কৃষিজমিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার—এসব নদীর পানির মাধ্যমে সুন্দরবনে প্রবেশ করছে। তা ছাড়া উজানের কৃষিজমিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ও সুন্দরবনের ভেতরে পর্যটকবাহী ট্রলার চলাচল, মাছ ধরার জালে ব্যবহৃত বিষ ও রং এবং পর্যটকদের অবাধ বিচরণ এই দূষণ আরো বাড়িয়ে তুলেছে।
গবেষকরা জানান, জোয়ার-ভাটার কারণে এই ভারী ধাতুগুলো সুন্দরবনের বিভিন্ন নদীর চ্যানেলের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে এবং কাদামাটিতে জমা হচ্ছে। এসব বিষাক্ত ভারী ধাতুগুলো পচনশীল না হাওয়ায় দীর্ঘকাল থেকে যায়। যার ফলে সুন্দরবনের বিশেষ প্রজনন প্রক্রিয়া ‘বিবিপ্যারাস জার্মিনেশন’ বা জরায়ুজ অঙ্কুরোদগম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মাটি ও পানিতে রাসায়নিকের আধিক্য থাকায় সুন্দরী ও গেওয়ার মতো গাছের ‘ন্যাচারাল রিজেনারেশন’ বা প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম ব্যাহত হচ্ছে।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মাদ আবদুস সালাম বলেন, প্রাকৃতিক সুন্দরবনে ভারী ধাতুর দূষণের কারণে বনের স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং স্বাভাবিক ইকোসিস্টেম প্রক্রিয়া ব্যাহত করছে। সুন্দরবন রক্ষায় এর আশপাশে শিল্পকারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখা এবং বর্জ্য নিঃসরণ কঠোরভাবে মনিটরিং, রাসায়নিক সারনির্ভর কৃষির পরিবর্তে অর্গানিক বা জৈব কৃষিতে উৎসাহিত করা এবং পর্যটন এলাকায় ‘নেচার বেজড ট্যুরিজম’ গাইডলাইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন জরুরি। সুন্দরবনের স্বাভাবিক ইকোসিস্টেম ৩০-৫০ বছর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে সরকারি ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।