Image description
কল্লোলিনী তিস্তা এখন ধু-ধু বালুচর

দিন যায়, মাস যায়, চলে গেছে বছরের পর বছর। তবুও তিস্তার দুই পারের মানুষের দুঃখ ঘোচেনি। মেলেনি তিস্তা নদীর পানির নায্য হিস্যা। ভারত পানি আটকে রাখায় শুষ্ক মৌসুমে স্রোতঃস্বিনী তিস্তার রূপ হয়ে যায় মরুভূমির মতো। আর বর্ষায় ভারত থেকে অতিরিক্ত পানি ছাড়ার কারণে বন্যা ও নদী ভাঙনের বিপর্যস্ত হন দুই কূলের মানুষ। দফায় দফায় প্রতিশ্রুতির পরেও তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি করেনি ভারত। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিস্তা মহাপরিকল্পনার উদ্যোগ ও সমীক্ষার কাজ করা হলেও বাস্তবে কোনো ফলাফল আসেনি। বিএনপি সরকারের পথচলার শুরুতেই তিস্তা মহাপরিকল্পনায় কিছু সংশোধন এবং সেখানে পানি সংরক্ষণের অপশন যুক্ত করে নতুনভাবে প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল ঘোষণা দিয়েছেন পদ্মা ব্যারাজের মতো তিস্তা ব্যারাজও হবে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এ প্রকল্প বাস্তবায়নে আছে বিস্তর চ্যালেঞ্জ। ভারত থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী দেশটি পানি না দিলে কীভাবে তা ব্যবস্থাপনা করা হবে, প্রকল্পের অর্থায়ন, প্রকল্প ঘিরে ভূ-রাজনৈতিক শক্তির টানাপোড়েন, তিস্তাপারের পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য রক্ষা, নদীকে ঘিরে কৃষি ও অর্থনৈতিক প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনা তার মধ্যে অন্যতম চ্যালেঞ্জ।

নির্বাচনে জয়ী হলে আগামী ৫ বছরে দেশব্যাপী ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন করার বিষয়টি বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে ছিল। এতে উল্লেখ করা হয়, তিস্তা ও পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলে পানি নিরাপত্তা, বন্যা ও মরুকরণ প্রতিরোধ নিশ্চিত করা হবে। এই উদ্যোগে ৭৫ লাখ হেক্টর জমি সেচ সুবিধা পাবে এবং ৫ কোটিরও বেশি মানুষ বন্যার কবল থেকে রক্ষা পাবেন।

গত মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ম্যানিফেস্টো টু অ্যাকশন : চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড ওয়েফরোয়াড’ শীর্ষক এক নাগরিক সংলাপে অংশ নিয়ে জুলাই থেকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারাজের কাজ শুরু হবে জানিয়েছিলেন পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। তিনি সেই আয়োজনে বলেন, খাল খনন ছাড়াও পদ্মা ও তিস্তাকে নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলে বর্ষায় অতিরিক্ত বন্যা হয়। যদি আমরা পদ্মা ব্যারাজ না করতে পারি, এক সময় দেখা যাবে, সেই অঞ্চল মরুভূমি হয়ে যাবে। পদ্মা ও তিস্তাকে নিয়ে দৃশ্যমান পরিকল্পনা যত দ্রুত বাস্তবে রূপ দেওয়া যায়, সে নিয়ে আমরা জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন দিয়েছি। জুনে বাজেট পাশ হবে এবং জুলাইয়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং পদ্মা ব্যারাজের কাজ শুরু হবে বলে সেদিন তিনি জানিয়েছেন। বলেছেন, এই দুটো প্রজেক্টকেই বলা হয়, মাস্টারমাইন্ড প্রজেক্ট; দুটোর সঙ্গে আমাদের দেশের অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত।

একই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান সচিবালয়ে আরেক আয়োজনে জানান, তিস্তা মহাপরিকল্পনায় কিছু সংশোধন আনা হবে এবং সেখানে পানি সংরক্ষণের অপশন যুক্ত করে নতুনভাবে প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হবে। তিনি আরও বলেন, আমি জয়েন্ট রিভার কমিশনের (জেআরসি) একজন উপদেষ্টা হিসাবে বিষয়টি পরিষ্কার করতে চাই। তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে যে আলোচনা হয়েছে, সেখানে মূল প্রশ্ন ছিল শুধু ভাঙন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ নয়; শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহারের জন্য পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থাও থাকতে হবে। বর্তমানে তিস্তা মহাপরিকল্পনায় নদীকে প্রায় ৮০০ মিটার প্রশস্ততায় সীমিত করা, ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে গভীরতা বৃদ্ধি এবং তীর সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ মূলত বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নদীভাঙন প্রতিরোধবিষয়ক। তিস্তা অববাহিকায় ভাঙন একটি বড় সমস্যা, বন্যাও বড় সমস্যা।

এর মধ্যেই সম্প্রতি একনেকে অনুমোদন পেয়েছে ‘পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্প। প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকার এ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ ইতিবাচক হিসাবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে ঘিরে গত এক দশকে দেশের রাজনীতিতে এসেছে অসংখ্য প্রতিশ্রুতি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে চীনের অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের আলোচনা শুরু হয়। চীনের প্রতিষ্ঠান পাওয়ার চায়না কনস্ট্রাকশন ২০১৬ সালের পর টানা তিন বছর সমীক্ষা চালায়। শুরু থেকেই চীন অর্থায়নের আগ্রহ দেখালেও ভারতের আপত্তির কারণে সে উদ্যোগ আর এগোয়নি। পরে সরকারিভাবে বলা হয়, তিস্তা প্রকল্পে ভারত কাজ করবে।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চলতি বছরের জানুয়ারিতে সাবেক পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনকে নিয়ে তিস্তা অববাহিকা পরিদর্শন করেন। পরে বিএনপির তখনকার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতে চীনের রাষ্ট্রদূত জানান, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বেইজিং প্রস্তুত রয়েছে।

চলতি বছরের ১১ মে লালমনিরহাটে এক অনুষ্ঠানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, সরকার চীনের সহায়তায় দ্রুত তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু করতে চায়।

প্রথমবারের মতো চীন সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের আলোচনায় তিস্তা ইস্যুটি ছিল। মনে করা হয়, তিস্তা প্রকল্পে চীনের আগ্রহের বড় কারণ ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্প। যার মাধ্যমে চীন এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকা মহাদেশকে একীভূত করা হবে। চীনের বিআরআই প্রকল্পের আওতাধীন বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর। এসব কারণেই তিস্তা প্রকল্প নিয়ে চীনের আগ্রহকে শুরু থেকই ভালোভাবে নিচ্ছে না ভারত। অন্যদিকে এই অঞ্চলে চীনের আধিপত্য যেন না বাড়ে তা নিয়ে সচেষ্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তাই তিস্তা প্রকল্পে চীনের আগ্রহ নজরে আছে তাদেরও।

নদী বিশেষজ্ঞ ও গবেষক অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ প্রশ্ন তোলেন, তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ভারত বা চীনের কাছে যেতে হবে কেন? যুগান্তরকে তিনি বলেন, যেহেতু বিষয়টি নিয়ে তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় আছে। তিস্তা প্রকল্পের বাস্তবায়ন হতে হবে আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে। আর তিস্তার প্রকল্প মানুষের জীবন-মরণের প্রকল্প। এ বিষয়ে কোনো কালক্ষেপণ নয়। সরকারকে রোডম্যাপ দিতে হবে কীভাবে কীভাবে কাজটা হবে। বিশ্বে যাদের কারিগরি দক্ষতা ভালো তাদের দিয়েই এটি বাস্তবায়ন করতে হবে। পুরো পরিকল্পনাটি হতে হবে বৈজ্ঞানিকভাবে; যাতে কৃষি, কৃষক, নদী সবাই বেঁচে যায়। জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ ঠিক থাকে।

তিনি বলেন, তিস্তার দুই পারে লাখ লাখ মানুষ ইতোমধ্যে ভাঙনে উদ্বাস্তু হয়েছেন। এর কারণ তিস্তায় পানি থাকে না। পানি যখন থাকে না তখন তিস্তায় প্রচুর চাষাবাদ করা হয়। তখন শুধু শস্য তুলে নেওয়া হয়। আর গাছগাছালি যা থাকে সব নদীতে পড়ে থাকে। এই অবস্থায় যখন নদীতে পানি আসে তখন আরেক দফায় পলি আটকা পড়ে। পলি আটকা পড়লে তলদেশ ভরাট হয়। তখন দুই পাড় আবার ভাঙে। এভাবে দুই পাড় ভেঙেছে প্রচুর। লাখ লাখ মানুষ গৃহহারা হয়েছেন। ফলে তিস্তায় পানি লাগবে। ভারতের পানি আটকে রাখা একটি বর্বরতম কাজ। বারবার আশ্বাস দেওয়ার পরও ভারত তিস্তা পানি চুক্তি করেনি।

তিনি বলেন, তিস্তা যেহেতু আন্তঃদেশীয় নদী, তাই উভয় দেশীয় এবং নিজস্ব ব্যবস্থাপনা দুটোই লাগবে। উভয় দেশীয় ব্যবস্থাপনায় না হলে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কীভাবে তিস্তাকে বাঁচানো যায় তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। তিস্তার নায্য পানি চাওয়ার দাবি বজায় রাখতে হবে। ১৯৯৭ সালের আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহ কনভেনশন আইনে পরিণত হয়েছে ২০১৪ সালে। এতদিন ভারত কি বলবে এজন্য সেটি চাওয়া হয়নি। কিন্তু সেই নতজানু হয়ে থাকার বাস্তবতা এখন আর নেই।

তিস্তার পানি চুক্তি স্বাক্ষর নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিন আলোচনার পর চুক্তির একটি খসড়া চূড়ান্ত হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানির ৩৭ দশমিক ৫ ভাগ বাংলাদেশের এবং ৪২ দশমিক ৫ ভাগ ভারতের পাওয়ার কথা ছিল। বাকি ২০ ভাগ থাকবে নদীর পরিবেশ রক্ষার উদ্দেশ্যে। ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় তিস্তার পানি নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষরের কথা ছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিরোধিতার কারণে চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত স্বাক্ষরিত হয়নি। নরেন্দ্র মোদির সরকার তিস্তার পানি চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে একাধিকবার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা কার্যকর হয়নি।