Image description
জুলাইয়ে সরকারি বেতন বাড়ছে

দীর্ঘ এক দশক পর দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আসছে নতুন বেতনকাঠামো, আগামী ১ জুলাই থেকে যা কার্যকর হচ্ছে। নবম জাতীয় বেতন কাঠামোয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও বেসরকারি খাতের কোটি কোটি কর্মীর বেতনকাঠামোয় আপাতত কোনো পরিবর্তন আসছে না।

ফলে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে ক্রয়ক্ষমতার ব্যবধান আরো প্রকট হবে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। তিন অর্থবছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও আসন্ন বাজেটে এ জন্য ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখা হচ্ছে, যা বাজারে মনস্তাত্ত্বিক মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করতে পারে।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ভালো বেতন ও সুযোগ-সুবিধার আশায় অনেক তরুণ সরকারি চাকরির চেয়ে বেসরকারি খাতকে বেছে নেন। সরকারি চাকরির মতো নিরাপত্তা না থাকলেও আকর্ষণীয় বেতন ও দ্রুত পদোন্নতির সম্ভাবনা বেসরকারি খাতকে তরুণদের পছন্দের জায়গায় পরিণত করেছে।

কিন্তু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আসন্ন নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ফলে বেসরকারি খাতের কর্মীরা নতুন করে চাপে পড়তে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে সরকারি বেতন বৃদ্ধির ‘হুজুগে’ নিত্যপণ্যের দাম আরেক দফা বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা, যা এরই মধ্যে ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতির পারদকে আরো চড়িয়ে দিতে পারে।

জানা গেছে, সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো একবারে নয়, তিন অর্থবছরে ধাপে ধাপে শতভাগ বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম দুই বছরে মূল বেতন ৫০ শতাংশ করে সমন্বয় করা হবে এবং তৃতীয় বছরে যুক্ত হবে বাড়তি ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা।

আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই পে স্কেলের জন্য আসন্ন বাজেটে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় মন্ত্রিপরিষদসচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন কমিটি আজ বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে চূড়ান্ত সুপারিশ করবে।

জানতে চাইলে চাকরিবিষয়ক দেশের সর্ববৃহৎ প্ল্যাটফর্ম বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী ও ভয়েস ফর রিফর্মের সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০১৫ সালের পর দীর্ঘ এক দশক ধরে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন কোনো পে স্কেল হয়নি। এই দীর্ঘ সময়ে দেশে যেভাবে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, তাতে তাঁদের বেতন বাড়ানোটা অত্যন্ত স্বাভাবিক ও যৌক্তিক। কিন্তু নতুন পে স্কেলের সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে সরকারের যে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ হবে, তা আমাদের বর্তমান অর্থনীতির ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করবে।

এই বিপুল অর্থ বাজারে এলে মূল্যস্ফীতি আরো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার বড় ঝুঁকি রয়েছে।’

ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘আমাদের দেশের তরুণসমাজ এমনিতেই কম বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার অভাবে বেসরকারি চাকরির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। তার ওপর বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দা ও উচ্চ উৎপাদন খরচের কারণে কম্পানিগুলোর প্রবৃদ্ধি ও মুনাফা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। ফলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কর্মীদের কাঙ্ক্ষিত বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা দিতে পারছে না। এ অবস্থায় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির কারণে বাজারে যদি আবার জিনিসপত্রের দাম বাড়ে এবং নতুন করে মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়, তবে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেবে। বেসরকারি চাকরিজীবীরা এমনিতেই বর্তমান বাজারে জীবন চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন, সামনে তাঁদের জন্য টিকে থাকার লড়াইটা আরো কঠিন হয়ে যাবে।

বৈষম্যে পড়বে বেসরকারি খাত : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুসারে, দেশের মোট কর্মসংস্থানের মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ সরকারি খাতে। বাকি ৯৩ শতাংশেরও বেশি মানুষ বেসরকারি, করপোরেট ও অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। চার বছর ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি (গড় ৯.৫ শতাংশের ওপরে) চলছে। এই সময়ে সরকারি কর্মীরা নিয়মিত ইনক্রিমেন্ট ও বিশেষ ভাতা পেলেও বেসরকারি খাতের বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান ব্যাবসায়িক মন্দা ও উচ্চ সুদের কারণে বেতন বৃদ্ধি স্থগিত রেখেছে বা নামমাত্র ৩ থেকে ৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ রেখেছে।

নতুন পে স্কেলে ২০তম গ্রেডের মূল বেতন আট হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকায় উন্নীত হচ্ছে (১৪২ শতাংশ বৃদ্ধি) এবং প্রথম গ্রেডে ৭৮ হাজার থেকে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে দুই খাতের কর্মীদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে একটি বড় ফাটল তৈরি হবে।

একটি বহুজাতিক কম্পানির মধ্যম স্তরের কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা উচ্চ হারে ট্যাক্স দিই, কিন্তু বাজারে গিয়ে দেখি সরকারি কর্মীর ক্রয়ক্ষমতা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি। চাকরির নিরাপত্তা ও পেনশন তো আছেই। এতে বেসরকারি খাতের প্রতি অনীহা তৈরি হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই বৈষম্য মেধাবী তরুণদের সরকারি চাকরির প্রতি আকৃষ্ট করবে এবং বেসরকারি খাত থেকে দক্ষ জনশক্তির ব্রেইন ড্রেন বাড়াবে।

মূল্যস্ফীতির মনস্তাত্ত্বিক চাপ : ইতিহাস বলছে, সরকারি বেতন বৃদ্ধির ঘোষণার পর বাজারে প্রায়ই কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি দেখা যায়। ২০১৫ সালের অষ্টম পে স্কেলের পর বাড়িভাড়া ও নিত্যপণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। বর্তমানে ব্যাংকঋণের সুদহার ১৪-১৫ শতাংশ এবং বেসরকারি ঋণপ্রবাহ লক্ষ্যমাত্রার নিচে থাকায় নতুন তারল্য বাজারে চাপ বাড়াতে পারে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, সর্বশেষ গত এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.০৪ শতাংশ। গত ছয় মাসের মধ্যে পাঁচ মাসই মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি ছিল। অথচ গত এপ্রিলে জাতীয় গড় মজুরি হার ছিল ৮.১৬ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বেড়েছে কম।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে. মুজেরি বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত যৌক্তিক হলেও এর ফলে বেসরকারি খাতের কর্মীরা যে গভীর অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপে পড়বেন, তা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। দেশের কর্মসংস্থানের বেশির ভাগই যেখানে বেসরকারি খাতে, সেখানে দুই খাতের মধ্যে ক্রয়ক্ষমতার এই ফারাক সামাজিক বৈষম্য আরো বাড়িয়ে দেবে।

এই অর্থনীতিবিদ আরো বলেন, অবিলম্বে বাজারে মনস্তাত্ত্বিক মূল্যস্ফীতি বা কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি রোধে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা দরকার। পাশাপাশি, মন্দাক্রান্ত বেসরকারি খাতে গতি আনতে এবং তারা যেন কর্মীদের বেতন কিছুটা হলেও পুনর্বিন্যাস করতে পারে, সে জন্য আসন্ন বাজেটে করপোরেট কর যৌক্তিকীকরণ এবং উৎপাদনশীল খাতে বিশেষ নীতি সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে এই পে স্কেলের প্রভাবে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতির আগুনে সাধারণ বেসরকারি চাকরিজীবীরা পিষ্ট হবেন।

করণীয় কী : অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে প্রশাসনিক সংস্কার, দক্ষতা বৃদ্ধি ও দুর্নীতি কমানো জরুরি। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের জন্য কর সুবিধা, জ্বালানি সরবরাহে অগ্রাধিকার এবং কঠোর বাজার তদারকি প্রয়োজন।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন অবশ্যই জরুরি। কিন্তু সেই উন্নয়ন যেন দেশের বেশির ভাগ বেসরকারি খাতের মানুষের জীবনকে আরো চাপের মধ্যে না ফেলেএটিই এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন অজুহাতে নিত্যপণ্যের দাম আরো বাড়িয়ে দিতে পারেন, যার চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদের ওপরই পড়বে। এতে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বেড়ে যাবে এবং সাধারণ জনগণের জন্য পরিস্থিতি মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা-এর মতো হয়ে দাঁড়াবে।

তিনি বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাজারে অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ব্যবসায়ীরা এটিকে ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ানোর সুযোগ নেবেন। তাই বর্তমান সময়ে বেতন বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত উপযুক্ত নয়।

নাজের হোসাইন বলেন, বেতন বাড়ানোর ফলে প্রায় ২০ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী সুবিধা পেলেও এর নেতিবাচক প্রভাব ভোগ করতে হবে দেশের প্রায় ১৮ কোটি সাধারণ মানুষকে। তাই সরকারকে বিষয়টি আরো গভীরভাবে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। কাঠোর বাজার তদারকিসহ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।