Image description

এক. গাজীপুরের কাপাসিয়ায় সম্প্রতি বসতঘরে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় একই পরিবারের পাঁচজনকে। হত্যাকারী নিহতদের বাবা, স্বামী ও দুলাভাই। ঘটনার পর হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত সেই ফোরকান মিয়ার লাশ মেলে নদীতে। নিজেদের বসতঘরের মেঝেতে পাশাপাশি পড়ে থাকা লাশগুলো ছিল তারই তিন মেয়ে মীম (১৫), মারিয়া (৮) ও ফারিহার (২)। জানালার পাশে ছিল স্ত্রী শারমিনের হাত-মুখ বাঁধা নিথর দেহ এবং বিছানার ওপর শ্যালক রসুলের রক্তাক্ত লাশ। ৯ মে এ পাঁচ লাশ উদ্ধারের ঘটনা আলোড়ন তুলেছিল সারা দেশে। লাশের ভয়ানক দৃশ্য দেখে আঁতকে ওঠেন সবাই। চোখের জল ফেলতে বাধ্য হন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। সেই সঙ্গে প্রশ্ন ওঠে-যে বাবা নিজের জীবন দিয়ে সন্তানদের বাঁচান, স্ত্রীকে নিরাপত্তা দেন, কীসের ক্ষোভে, কেন, কীভাবে একজন বাবা নিজের সন্তানদের জবাই করতে পারলেন? কেনইবা হত্যা স্ত্রী ও শ্যালককে?

দুই. রামিসা আক্তার নামে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা এবং মাথা বিচ্ছিন্ন করার নৃসংসতাও কাঁপন তুলেছে দেশময়। কীভাবে সম্ভব? প্রতিবেশীর বাসায় প্রথমে শিশুটির মস্তকবিহীন দেহ পান মা। এরপর খুঁজে পাওয়া যায় মাথা। মঙ্গলবার রাজধানীর পল্লবীতে এ ঘটনার পর ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। একটি শিশুকে এমন রোমহর্ষক হত্যা মেনে নিতে পারছেন না কেউ। ঘাতক সোহেল (৩২) ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে আটক করেছে পুলিশ। আদালতে নিজের দোষও স্বীকার করেছেন ঘাতক। কিন্তু মেয়েকে হারানোর পর বিচারব্যবস্থার ওপর গভীর আক্ষেপ ও অনাস্থা প্রকাশ করে শিশুটির বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা বলেন, ‘আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই।’

তিন. তার এক দিন আগে উদ্ধার করা হয় প্রবাসী মোকাররম মিয়ার (৩৭) আট টুকরা লাশ। প্রথমে পাওয়া যায় মস্তকবিহীন সাত টুকরা; পরে মাথা উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর ১৭ মে মুগদা-মান্ডায় সংঘটিত এ ঘটনার রোমহর্ষক ও শরীর হিম করা বর্ণনা দেন খুনিরা। তবে হত্যা ও লাশ গুমের পর কীভাবে পরকীয়া প্রেমিকা তাসলিমা আক্তার, তাসলিমার বান্ধবী হেলেনা বেগম ও হেলেনার মেয়ে (১৩) বিরিয়ানি খেতে পারেন? কীভাবে প্রতিবেশীদের নিয়ে ছাদে পার্টি করতে পারেন? ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর হতবাক সবাই। খুনের পর এমনভাবে খাওয়া ও পার্টি করা কি কোনো স্বভাবিক মানুষের পক্ষে সম্ভব?

শুধু এ ঘটনাগুলোই নয়, পুলিশ সদও দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) সারা দেশে ১ হাজার ১৪২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১০টির মতো খুনের ঘটনা ঘটেছে দেশে। এপ্রিলে ২৮৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। ওই চার মাসে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই ৭৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী একটা অস্থিরতা চলছে। বাংলাদেশেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে প্রযুক্তির রেশ প্রকট আকার ধারণ করেছে। আত্মিক বন্ধন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে মানুষ। সেই সঙ্গে নিজের লোভ পূরণে উদ্গ্রীব হয়ে পড়া, পরিবারের সঙ্গে সংযোগ কমে যাওয়া, স্বজনদের সঙ্গে সহমর্মিতার অভাব, প্রযুক্তি আসক্তি, টেলিভিশনে ক্রাইম প্যাট্রলের মতো অনুষ্ঠান প্রচার, নেটফ্লিক্সে ভয়ানক ছবি দেখা, সংবেদনশীলতার সংকট, ছোট থাকতেই বিভিন্ন গেমসের মাধ্যমে খুন করা শেখা, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ বাধাগ্রস্ত হওয়া, নৈতিকতার অভাব, সংস্কৃতির চর্চার অভাবসহ নানান কারণেই সমাজে খুনাখুনি বাড়ছে।

এর থেকে পরিত্রাণ পেতে সংস্কৃতিচর্চা, খেলাধুলার সুযোগ ও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি জোর দিতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহারও সীমিত পরিসরে করতে হবে।’ পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সামাজিকভাবে মানুষ খুব অল্পতেই ধৈর্যহারা হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া নৈতিক অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধন কমে যাওয়া, অবৈধ সম্পর্কে জড়ানোর কারণে খুনাখুনি বাড়ছে। এমনিতে খুনাখুনির ঘটনা প্রতিরোধ করা খুবই কঠিন। এর পরও আমরা চেষ্টা করছি যে ঘটনাগুলো ঘটছে সেগুলো বিশ্লেষণ করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার।’ তিনি আরও বলেন, ‘খুন হয়েছে আর জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, এমন ঘটনা নেই। এর পরও কেউ খুনাখুনিতে জড়ালে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’