Image description

লিখিতভাবে কাউকে দায়িত্ব না দিয়েই টানা এক সপ্তাহ ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন দিনাজপুর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মুহা. তৌহিদুল ইসলাম। তার অনুপস্থিতিতে এসএসসি পরীক্ষা পরিচালনা, এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি, বিদ্যালয়-কলেজের কমিটি অনুমোদন, কর্মচারীদের পদোন্নতি, বেতন-ভাতাসহ শিক্ষা বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত ১১ মে সন্ধ্যায় চেয়ারম্যান প্রফেসর মুহা. তৌহিদুল ইসলাম বুকে ব্যথা অনুভব করছেন বলে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর বোরহান উদ্দিনকে জানান। পরে সরকারি গাড়িতে রংপুরে যান তিনি। যাওয়ার সময় বোর্ডের সরকারি মোবাইল ফোন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছে রেখে যান।

পরদিন হোয়াটসঅ্যাপে শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর নূর মো. আব্দুর রাজ্জাককে কর্মচারীদের পদোন্নতি-সংক্রান্ত বৈঠক স্থগিত করার নির্দেশ দেন চেয়ারম্যান। একই সঙ্গে তিনি ঢাকায় চলে গেছেন বলেও জানান। এরপর থেকে তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। পরিবারের সদস্যরাও ফোন রিসিভ করছেন না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

নিয়ম অনুযায়ী, শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ছুটিতে গেলে লিখিতভাবে সচিবকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার কথা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। মন্ত্রণালয় থেকেও কোনও নির্দেশনা না আসায় প্রশাসনিক জটিলতায় পড়েছেন কর্মকর্তারা।

শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর নূর মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “১১ মে সন্ধ্যায় চেয়ারম্যান স্যার বুকে ব্যথার কথা জানান। তাকে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়ার কথা বলা হলেও তিনি রংপুরে ভাইয়ের কাছে যেতে চান। পরে বোর্ডের গাড়িতে তাকে সেখানে পৌঁছে দেওয়া হয়।”

তিনি বলেন, “১৩ মে কর্মচারীদের পদোন্নতি-সংক্রান্ত বোর্ড মিটিং হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু চেয়ারম্যান স্যার ফোন ধরছিলেন না। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বৈঠক স্থগিতের নির্দেশ দেন। এরপর থেকে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।”

সচিব আরও বলেন, “শিক্ষা বোর্ডের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ কাজেই চেয়ারম্যানের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এখন অনেক সেবাপ্রার্থী ফিরে যাচ্ছেন। শুধু রুটিন কাজ চলছে, কিন্তু প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না।”

বিদ্যালয় পরিদর্শক ও কলেজ পরিদর্শকের দায়িত্বে থাকা প্রফেসর আমিনুল হক বলেন, “৩ হাজার ২০২টি বিদ্যালয় ও ৭২০টি কলেজের কমিটি অনুমোদনের কাজ চলছিল। কিন্তু চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর ছাড়া কোনও কমিটি অনুমোদন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।”

তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভেঙে দেওয়া কমিটিগুলোর পরিবর্তে নতুন কমিটি গঠনের কাজ শুরু হয়েছিল। কিন্তু এখন সেই প্রক্রিয়াও আটকে গেছে।

পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর বোরহান উদ্দিন বলেন, “এসএসসি পরীক্ষা চলছে। বিভিন্ন কেন্দ্রের আর্থিক ব্যয় আপাতত ব্যক্তিগতভাবে মেটানো হচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘদিন এভাবে চালানো সম্ভব নয়।”

তিনি আরও বলেন, “এইচএসসি পরীক্ষার ফয়েল পেপার ও অন্যান্য প্রস্তুতিমূলক কাজেও চেয়ারম্যানের অনুমোদন প্রয়োজন। যোগাযোগ না হওয়ায় আমরা অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি।”

চেয়ারম্যানের সরকারি গাড়ির চালক সারোয়ার হোসেন বলেন, “স্যারকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশের এলাকায় তার ভাইয়ের বাসায় নামিয়ে দিই। পরে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরে ডাক্তার দেখাবেন।”

শিক্ষা বোর্ডের কর্মচারীরা বলছেন, চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতির কারণে তাদের বহুদিনের প্রত্যাশিত পদোন্নতি প্রক্রিয়াও থেমে গেছে।

বোর্ডের কর্মচারী মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, “সব প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পরও চেয়ারম্যান না থাকায় পদোন্নতির মিটিং স্থগিত হয়ে গেছে। আমরা জানিই না তিনি কোথায় আছেন বা কবে ফিরবেন।”

শিক্ষা বোর্ড কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মোওদুদ-উল-করীম বাবু বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি নিয়ে আন্দোলন করছি। ১৩ মে এ বিষয়ে বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে সব অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছে।”

তিনি আরও বলেন, “এখন শুধু পদোন্নতি নয়, বেতন-বোনাস, প্রাক-বাজেট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কমিটি—সব কাজ আটকে আছে।”

এ বিষয়ে জানতে একাধিকবার চেয়ারম্যান প্রফেসর মুহা. তৌহিদুল ইসলামের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

শিক্ষা শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলনের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।