Image description

রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি ছাড়াও নানাভাবে ১৫ কোটি টাকা লুটপাট, ময়মনসিংহের বনপাড়া আদর্শ স্কুলে অধ্যক্ষ ও তার স্ত্রী-সন্তান-শ্যালক থেকে গাড়িচালক—সবারই জাল সনদে চাকরি

দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জালিয়াতি ও অনিয়মের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের খবর উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় এবং ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজে ১৪১ শিক্ষকের নিয়োগ অবৈধ। তাদের কেউ করেছেন অনার্স পাশ সনদ জালিয়াতি, আবার কেউ দেখিয়েছেন ভুয়া নিয়োগ বোর্ড, আবার অনেকে ভুয়া অভিজ্ঞতা সনদ এবং এনটিআরসিএর (বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ) সনদ জালিয়াতিসহ নানা প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন।

সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষক আছেন ১৩৩ জন। এর মধ্যে জালিয়াতির মাধ্যমে শিক্ষক হয়েছেন ৬৮ জন। এছাড়া অবৈধভাবে ইচ্ছেমতো বেতন-ভাতা নেওয়া, কেনাকাটায় অনিয়ম, হিসাব জালিয়াতিসহ বিভিন্ন দুর্নীতির মাধ্যমে লুটপাট করা হয়েছে প্রায় ১৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৭৬ জন শিক্ষকের মধ্যে ৭৩ জনের নিয়োগ অবৈধ হিসেবে প্রমাণ পেয়েছে ডিআইএ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুটির তদন্ত প্রতিবেদন সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। যার একটি কপি ইত্তেফাকের এই প্রতিনিধির হাতে এসেছে।

পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) পরিচালক এম এম সহিদুল ইসলাম গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজের অবৈধ শিক্ষক নিয়োগ এবং সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে জালিয়াতিসহ প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অনিয়মের প্রতিবেদনটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’

জানা গেছে, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ পর্যন্ত দেড় হাজার শিক্ষকের জাল সনদ চিহ্নিত হয়েছে। এসব শিক্ষককে শোকজ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। জাল সনদধারী শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বাবদ ৩৭৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। যা এসব শিক্ষকদের কাছ থেকে ফেরত নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিআইএ পরিচালক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, জাল সনদধারী সব শিক্ষককে চিহ্নিত করতে হবে। চিহ্নিত হয়েছে তো অল্প একটা অংশ। হয়তো এর পেছনে আরো অনেক রয়ে গেছে। জানা গেছে, জাল সনদের বিষয়টি তদন্তাধীন। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলেন, শিক্ষকদের জাল সদদের বিষয়টি লজ্জাজনক। শুধু যারা জাল সনদ 

নিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে হবে না, এই সনদের সঙ্গে যারা জড়িত তাদেরকেও চিহ্নিত করতে হবে। সেই সঙ্গে এদের যারা নিয়োগ দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে নিতে হবে আইনি ব্যবস্থা।

শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ বলেন, চাকরিতে যোগদানের সময় অবহেলা করে কিংবা বাইরে দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের কারণে সনদগুলো যাচাই না করার কারণে এসব হয়েছে। এটা কাঙ্ক্ষিত নয়। চাকরিতে যোগদানের সময় কেন সনদ যাচাই হয়নি—সে বিষয় খুঁজে বের করে জড়িতদেরসহ সনদ জালিয়াতি করা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে আরো যত অনিয়ম: রাজধানীর বেইলি রোডে সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের অবস্থান। ডিআইএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. সাহাব উদ্দিন মোল্লা এবং বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. দেলুয়ার হোসেন ২০১৪ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দ্বিগুণ হারে উত্সব ভাতা গ্রহণ করেছেন। সাহাব উদ্দিন মোল্লা অবৈধভাবে বেসরকারি বেতন বাবদ ৯৭ লাখ টাকা এবং দেলুয়ার হোসেন প্রায় ৮০ লাখ টাকা নিয়েছেন, যা ফেরতযোগ্য। এছাড়া দেলুয়ার হোসেনের নিয়োগ বিধিসম্মত না হওয়ায় আরো প্রায় ৩৮ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরতযোগ্য হবে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে অবৈধভাবে ২ কোটি ৩২ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে, যা ফেরত নিতে প্রতিবেদনে সুপারিশ করেছে ডিআইএ। 

প্রতিষ্ঠানটির সংরক্ষিত তহবিলের সনদ যাচাইয়ে দেখা যায়, ফার্স্ব ফিন্যান্স লিজিং কোম্পানিতে ৫ কোটি ৭২ লাখ ২৫ হাজার ৩৫৬ টাকা, পিপলস লিজিং  কোম্পানিতে ২ কোটি ১২ লাখ ১২ হাজার ৪৯ টাকা এবং এবং জিএসপি ফিন্যান্স কোম্পানিতে ৪ লাখ টাকার এফডিআর করা হয়েছে; যা বিধিসম্মত হয়নি। বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা উত্তোলন করে বিধি মোতাবেক তপশিলি ব্যাংকে এফডিআর করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির জেনারেটর ও লিফট কেনা এবং বিভিন্ন মেরামতকাজ, অভিভাবক শেড নির্মাণে বড় ধরনের অনিয়ম পেয়েছে ডিআইএ। ক্যান্টিন থেকে প্রতি মাসে ভাড়া পেলেও সেসংক্রান্ত কোনো তথ্য সরবরাহ করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানের জন্য কেনা পাঁচটি ল্যাপটপের মধ্যে দুটি ল্যাপটপ পাওয়া গেছে। এমনকি প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ৫ লাখ টাকা দেওয়ার সময় দেড় লাখ টাকা আত্মসাত্ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক সভাপতির ছেলে শেখ এমরানুল আলম ২০২৩ সালের মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে প্রতি মাসে ৪২ হাজার টাকা করে ৩ লাখ ৩৬ হাজার টাকা অবৈধভাবে নিয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন শ্রেণির কোচিং বাবদ আদায় করা টাকার রসিদ, টাকা ব্যয়ের রেকর্ড পরিদর্শনকালে সরবরাহ করা হয়নি। এ ব্যাপারে জানতে প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. দেলুয়ার হোসেনকে মোবাইলে একাধিক ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

বনপাড়া স্কুলে ৭৩ শিক্ষকের নিয়োগ অবৈধ: ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজের কলেজ শাখায় ৬১ জন শিক্ষকের সবারই নিয়োগ অবৈধ। অন্যদিকে স্কুল শাখা ১২ শিক্ষকের নিয়োগের অবৈধ। ডিআইএর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ তার পরিবারের ১১ জনকে নিয়োগ দিয়েছেন, যাদের সবারই সনদ জাল। এর মধ্যে স্ত্রী, ছেলে, ছেলের বউ, মেয়ে, বোন, বোনের জামাই, শ্যালকের স্ত্রী, চাচাতো ভাইবোন; বাদ পড়েননি নিজের ব্যক্তিগত গাড়িচালকও। এমনকি অধ্যক্ষ ইমদাদুল হকেরই সব সনদ জাল। শিক্ষক নিয়োগে ইমদাদুল হক নিয়েছেন ঘুষ। নিয়োগ দেওয়ার পর তাদের বেতন-ভাতার একটা অংশও নিয়ে নিতেন তিনি। নিয়োগ পাওয়া এই ভুয়া ব্যক্তিদের দেওয়া বেতন-ভাতা বাবদ সরকারি কোষাগারের ৫ কোটি ৫৭ লাখ ৫৬ হাজার টাকা ফেরত আনতে সুপারিশ করেছে ডিআইএ।  আর ইমদাদুল হকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি ফৌজদারি মামলার সুপারিশ করা হয়েছে।

জানা গেছে, ইমদাদুল হকের স্ত্রী ইসমেতারাকে অফিস সহায়ক, ছেলে ইমরুল হাসান কায়েস ল্যাব সহকারী, ছেলের বউ সুস্মিতা আক্তার জেরিনকে ল্যাব সহকারী, মেয়ে ইসরাত জাহানকে ল্যাব সহকারী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। এছাড়া বোন আসমা খাতুনকে কৃষিশিক্ষার সহকারী শিক্ষক, বোনের জামাই আজিজুল হককে বাণিজ্য বিভাগের প্রভাষক, শ্যালকের স্ত্রী শেফালি খাতুনকে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন ইমদাদুল। চাচাতো ভাই কামরুল ইসলামকে ব্যাংকিং বিভাগের প্রভাষক এবং চাচাতো বোন শাহনাজ পারভীনকে নিয়োগ দেন প্রভাষক হিসেবে। তার ব্যক্তিগত গাড়িচালকও এই নিয়োগ থেকে বাদ যাননি। এ ব্যাপারে অধ্যক্ষ ইমদাদুল হকের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি।