নিয়মের যেন কোনো বালাই নেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। একের পর এক বিধি লঙ্ঘনে যেন অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়েছে এ বিশ্ববিদ্যালয়। বিধিবিধান আর নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়েছে পদোন্নতি। ৫৬ জন শিক্ষক বিধি বহির্ভূতভাবে গ্রহণ করেছেন খণ্ডকালীন ভাতা। এ ছাড়া প্রাপ্যতার অতিরিক্ত ভাতা নিয়েছেন আরও ৩০৬ শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ গ্রেডের চিকিৎসকরা বিধি ভেঙে নিয়েছেন দ্বিতীয় গ্রেড। পদ না থাকলেও কর্মকর্তারা বাগিয়ে নিয়েছেন কম্পিউটার অপারেশন ম্যানেজার পদ। এমন অনেক অনিয়ম উঠে এসেছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, শুধু ২০২৪-২৫ অর্থ বছরেই এ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১১৫ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে। জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী, ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতির জন্য নবম গ্রেডের কর্মকর্তাদের চাকরির বয়স হতে হবে কমপক্ষে পাঁচ বছর। চতুর্থ গ্রেড পদোন্নতির জন্য চাকরির মেয়াদ হতে হবে ১২ বছর। কিন্তু বিধি অনুযায়ী চাকরির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই সাত কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এঁরা হলেন সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নিলুফার ইয়াসমিন, উপ-রেজিস্ট্রার আখতারা বেগম, উপপরিচালক মাহাবুবুর রহমান চৌধুরী, উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক রুমানা আহমেদ, উপপরিচালক আমিনুল হক, উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ ও উপ-রেজিস্ট্রার আজিজুল হক। বিধি অনুযায়ী এই সাত কর্মকর্তার পদোন্নতি হওয়ার কথা ২০২৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে। অথচ তাঁরা সবাই পদোন্নতিপ্রাপ্ত হয়েছেন ২০২৫ সালের মে মাসে। এসব অনিয়মের ফলে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৭৫ লাখ ৮৭ হাজার ১৬০ টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট অধ্যাপকের ২৫ শতাংশ প্রথম গ্রেড প্রাপ্য হবেন। কিন্তু এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫৫৬ অধ্যাপকের মধ্যে বিধি লঙ্ঘন করে ১৫৭ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ পদ না থাকলেও দেওয়া হয়েছে অতিরিক্ত ১৮ জনকে। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৯২০ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৬৮ শিক্ষককে প্রাপ্যতার অতিরিক্ত বই ভাতা প্রদান করা হয়েছে। এতে আর্থিক অনিয়ম হয়েছে ১২ লাখ ৫৮ হাজার ৪০০ টাকা।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নির্দেশনা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল ও কলেজের জনবলকে কোনো অবস্থাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের জনবল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। এ নির্দেশনা উপেক্ষা করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলের শিক্ষক ও কর্মকর্তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজস্ব বাজেট থেকে বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়েছে। আর এতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৪ কোটি ৩৬ লাখ ১৪ হাজার ৪২৮ টাকা।
চাকরি আদেশ অনুযায়ী, শিক্ষকদের মূল পদের বাইরে বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্ব প্রদান করা হলে ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে মূল বেতনের ১০ শতাংশ অথবা ১৫০০ টাকার মধ্যে যা কম হয় তা প্রদান করতে হবে। কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল পদের বাইরে বিভিন্ন পদে (প্রক্টর, প্রভোস্ট, চেয়ারম্যান, তত্ত্বাবধায়ক, ছাত্র উপদেষ্টা) অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করে বিধি বহির্ভূতভাবে প্রাপ্যতার অতিরিক্ত ভাতা দেওয়া হয়েছে ৩০৬ শিক্ষককে। আর এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৬০ লাখ ৫২ হাজার ৬০ টাকা। চাকরি আদেশ অনুযায়ী, স্বশাসিত এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী খণ্ডকালীন ভাতা নামে কোনো ভাতাপ্রাপ্য নন। অথচ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৬ শিক্ষক বিধি বহির্ভূতভাবে খণ্ডকালীন ভাতা গ্রহণ করেছেন। বিধি লঙ্ঘন করে প্রাপ্যতা ছাড়াই খণ্ডকালীন ভাতা গ্রহণ করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৩৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুযায়ী ৫৯ বছর শেষে বাধ্যতামূলক অবসরে যেতে হবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়জন কর্মকর্তা ৫৯ বছরে পিআরএলে না গিয়ে ৬২ বছর চাকরি করার পর পিআরএলে গেছেন। তাঁদের অতিরিক্ত বেতন-ভাতা প্রদান করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি ৯৩ লাখ ২৫ হাজার ১৯১ টাকা। এঁরা হলেন অতিরিক্ত প্রধান চিকিৎসক ডা. রেকসনা খাতুন, ডা. ফকির মো. আবু জাহিদ, কিউরেটর শফিকুল ইসলাম, প্রধান চিকিৎসক ডা. মো. তবিবুর রহমান, সহকারী রেজিস্ট্রার শফিকুল ইসলাম, সহকারী অধ্যাপক হরেন্দ্রনাথ রায় ও ডেপুটি রেজিস্ট্রার কাজেম আলী।
বিভিন্ন প্যাকেজে ভবন নির্মাণ কাজের জন্য ঠিকাদারদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন মেয়াদের সময় বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু ঠিকাদাররা কাজ বাস্তবায়নে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে তিন বছর বেশি (১ হাজার ৯৫ দিন) বিলম্ব করেন। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো হলো শিক্ষক কোয়ার্টারের নির্মমাণকাজ পাওয়া কবির সিন্ডিকেট লি. ও কে কে এন্টারপ্রাইজ; আবাসিক হল নির্মাণকাজ পাওয়া দি বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েটস লি. এবং কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ভবনের নির্মাণকাজ পাওয়া মাজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লি.। চুক্তিপত্র অনুযায়ী, প্রতিদিন বিলম্বের জন্য অসম্পাদিত কার্য মূল্যের ০.০৫ থেকে ০.১০ শতাংশ জরিমানা আদায় করতে হবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের বিলম্ব জরিমানা না করেই বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এর ফলে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২৩ কোটি ৬৫ লাখ ২ হাজার ৮৪১ টাকা।
বিশ্ববিদ্যালয় অর্গানোগ্রামে কম্পিউটার অপারেশন ম্যানেজার নামে কোনো পদ না থাকলেও এ পদে ৩০ জনকে পদায়ন করা হয়েছে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী অর্গানোগ্রামের বাইরে কোনো পদে নিয়োগ, পদোন্নতি প্রদান করা যাবে না। কম্পিউটার অপারেশন ম্যানেজারদের বেতন-ভাতা বাবদ বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৩ কোটি ৩৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৬৪ টাকা। গত বছরের মার্চে অনুষ্ঠিত ৫৩৭তম সিন্ডিকেট সভায় আট কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষভাবে পদোন্নতি প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে পদোন্নতি প্রাপ্তি কার্যকরের তারিখ থেকে বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৭ লাখ ৭৪ হাজার ৭৬০ টাকা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে সম্মান প্রথম বর্ষ ভর্তি পরীক্ষায় ৩২ কোটি ৭৪ লাখ ৩৭ হাজার টাকা আয় হলেও এ টাকা আয়-ব্যয়ের বিবরণী, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, বিল ভাউচার কিছুই উপস্থাপন করা হয়নি সরকারের শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরে। এ ছাড়া হিসাববিজ্ঞান ও তথ্যব্যবস্থা বিভাগ, ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ, মার্কেটিং বিভাগ, ফাইন্যান্স ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স বিভাগ তাদের সান্ধ্যকালীন কোর্সে ভর্তিসংক্রান্ত তথ্য, আয়ব্যয় বিবরণী, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ক্যাশবুক শিক্ষা অডিটের নিরীক্ষা দলের কাছে উপস্থাপন করেনি।
আইবিএ ডিপার্টমেন্টের তিনটি প্রোগ্রাম থেকে প্রায় দেড় কোটি টাকা আয় হলেও এর এক চতুর্থাংশ কেন্দ্রীয় তহবিলে জমা না করায় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৬ লাখ ৯৩ হাজার ৩১৭ টাকা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ববর্তী প্রশাসন বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সমিতির ‘চাপে পড়ে’ বিভিন্ন দাবি মেনে নিয়েছে। পরে সেগুলো সিন্ডিকেটে পাস করিছেয়ে; যা সরকারের বিভিন্ন বিধি অনুমোদন করে না। কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। অধ্যাদেশের ক্ষমতা ও সরকারি বিভিন্ন বিধির ফারাক সব সময় থেকেই যায়।