পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশে নতুন নোটের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে চাহিদার তুলনায় অনেক কম নগদ অর্থ পাচ্ছে। একই সঙ্গে ঈদকে কেন্দ্র করে নগদ টাকার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোতে অর্থ উত্তোলনের চাপও বাড়ছে। এর প্রভাবে আন্তব্যাংক কলমানি বাজারে সুদহার ১১ শতাংশ অতিক্রম করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কয়েকটি ব্যাংক নগদ টাকার চাহিদার বিপরীতে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ অর্থ পাচ্ছে। এতে ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়েছে। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, এটি কোনো তারল্যসংকট নয়; বরং নতুন ছাপানো নোটের ঘাটতির কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংকারদের তথ্য অনুযায়ী, আট-দশ দিন ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক চাহিদার তুলনায় অনেক কম নগদ সরবরাহ করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন নগদ লেনদেনের পরিবর্তে ইলেকট্রনিক লেনদেন বাড়াতে উৎসাহ দিচ্ছে। ঈদুল আজহার আগে স্বাভাবিকভাবেই নগদ টাকার চাহিদা বেড়ে যায়। গরুর হাটে বড় অঙ্কের নগদ লেনদেন, শ্রমিকদের বোনাস-ভাতা পরিশোধ এবং গ্রাহকদের ব্যক্তিগত খরচের কারণে ব্যাংক থেকে নগদ উত্তোলন বাড়ছে। ফলে ব্যাংকগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ঈদের আগে সাধারণত নগদ উত্তোলনের চাপ বেশি থাকে। এবার গরুর হাটকে কেন্দ্র করে বড় অঙ্কের নগদ টাকার চাহিদা তৈরি হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানও শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধের জন্য নগদ তুলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঈদ উপলক্ষে কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকশালের কাছে ১৬ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট চেয়েছিল। তবে কাগজ ও কালি সংকটের কারণে মাত্র প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। এর মধ্যে টাকশাল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে ৪ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট সরবরাহ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, বর্তমানে
ক্ষতিগ্রস্ত নোট বাজার থেকে প্রত্যাহার করা হচ্ছে এবং ছোট মূল্যমানের নোটের পরিবর্তে বড় মূল্যমানের নোট সরবরাহের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। কারণ ঈদুল আজহার সময় বড় অঙ্কের নোটের চাহিদা বেশি থাকে। তবে একই সময়ে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি-সংবলিত পুরোনো ডিজাইনের প্রায় ১৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকার নোট এখনো সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনে মজুত রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক সেসব নোট বাজারে ছাড়তে অনাগ্রহী।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশে মোট মুদ্রার পরিমাণ প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে ছাপানো টাকার চাহিদা ৩ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি। দীর্ঘদিন ধরে পুরোনো ডিজাইনের নোট স্থগিত থাকায় চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান আরও বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ব্যাংকগুলোর চাহিদা ধাপে ধাপে পূরণ করা হচ্ছে। নতুন ছাপানো নোট পর্যায়ক্রমে বিতরণ করা হচ্ছে। এখন কম পেলেও পরে অতিরিক্ত চাহিদা পূরণ করা হবে।
১১ শতাংশ ছাড়াল কলমানি সুদহার : নগদ টাকার বাড়তি চাহিদার প্রভাব পড়েছে আন্তব্যাংক মানি মার্কেটেও। গতকাল আন্তব্যাংক কলমানি সুদহার ১১ শতাংশ অতিক্রম করেছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল কলমানি সুদহার ছিল ৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৫০ শতাংশের মধ্যে। অধিকাংশ লেনদেন নিষ্পত্তি হয়েছে ১০ দশমিক ০৬ শতাংশ থেকে ১১ শতাংশ সুদহারে। এদিকে আন্তব্যাংক কলমানি বাজারে মোট লেনদেনও বেড়েছে। গতকাল এ বাজারে লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা, যা আগের কর্মদিবসে ছিল ৪ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা।
আরিফ হোসেন খান বলেন, ঈদের আগে বাজার স্থিতিশীল রাখতে আমরা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। রেপো সুবিধার মাধ্যমে তারল্য সহায়তা এবং ডলার কেনার বিপরীতে বাজারে অর্থ সরবরাহ করায় কলমানি সুদহার কিছুটা কমতে পারে। গতকাল স্থানীয় মুদ্রার বিপরীতে ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তব্যাংক স্পট মার্কেট থেকে নিলামের মাধ্যমে আরও ৮ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার কিনেছে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ঈদের আগে নগদ উত্তোলন বৃদ্ধি এবং ট্রেজারি বিলের বিপরীতে ৯ হাজার কোটি টাকা পরিশোধের কারণে মানি মার্কেটে চাপ বেড়েছে। তবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেলে কলমানি সুদহার আবার ১১ শতাংশের নিচে নেমে আসতে পারে।