‘আমার নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৪০ লাখ টাকা থাকা সত্ত্বেও আজ আমি নিঃস্ব। স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসার চলছে না। দৈনন্দিন বাজার খরচের টাকাও নেই। সামনে ঈদ আসছে, সবার ঘরেই আনন্দ থাকবে। আমাদের কী হবে? টাকার শোকে স্বামী মারা গেছে, এখন আমিও চোখে অন্ধকার দেখছি। আমার ছেলেমেয়েদের কেন ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। ব্যাংকে টাকা রাখাই কি আমাদের অপরাধ?’
কান্নাজড়িত কণ্ঠেই কথাগুলো বলছিলেন মিরপুর আরামবাগ এলাকার জান্নাত আক্তার। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের মিরপুরের একটি শাখায় তার হিসাব রয়েছে। জান্নাত আক্তার এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘অসুস্থতার কারণে স্বামী বেকার হয়ে পড়লে ২০১৮ সালে নিজেদের শেষ সম্বল রাজধানীর ৬০ ফিটের বাড়ি বিক্রি করে ৫০ লাখ টাকা পাই। তার মধ্য থেকে ব্যাংক এশিয়ায় স্বামীর অ্যাকাউন্টে ৪০ লাখ টাকার একটা এফডিআর করি। বাকি টাকা সঞ্চয়ী হিসাবে রেখে কোনোরকম সংসার চালাতাম। পাশাপাশি স্বামীর চিকিৎসাও করতাম। কিন্তু স্বামীর শারীরিক সমস্যার কারণে এবং কর্মকর্তাদের ভালো মুনাফার আশ্বাসে বছর তিনেক আগে ওই ৪০ লাখ টাকার এফডিআর ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে নিয়ে আসি। সরকার পরিবর্তনের পর থেকে ওই টাকা থেকে ১ টাকাও তুলতে পারছি না। গত বছরের জুলাই মাসে নানাভাবে চেষ্টা করে, অনেক অনুনয় করেও ব্যাংক থেকে টাকা না পেয়ে প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণায় স্বামী মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অনেক দৌড়ঝাঁপ করে চলতি বছরের শুরুর দিকে মুনাফার কিছু টাকা তুলতে পেরেছিলাম। তার পর থেকে আর টাকা পাচ্ছি না। আত্মীয়স্বজনের কাছে ধারদেনা করে প্রায় ডুবে গেছি। এখন ধারও কেউ দেয় না। কাছের আত্মীয় যারা ধার দেবে, তারা নিজেরাও ব্যাংকে টাকা রেখে বিপাকে রয়েছে। আমার মেয়েটা আগামী ডিসেম্বরে এসএসসি পরীক্ষা দেবে, তার ওপর সে অসুস্থ। ছেলেটা চাকরির চেষ্টা করেও পাচ্ছে না। বিদেশে পাঠাব তারও জো নেই। কারণ টাকা আটকে আছে ব্যাংকে। এখন আবার শুনছি, দেউলিয়া হওয়া ব্যাংকে যত টাকাই জমা থাকুক, ২ লাখ টাকার বেশি নাকি পাওয়া যাবে না! আমার দিন যে কীভাবে যাচ্ছে, তা শুধু আমার সৃষ্টিকর্তাই জানে। সংসারের এ চাপে একদিন হয়তো আমার স্বামীর মতো আমারও মৃত্যু হবে।’
প্রায় একই রকম করুণ গল্প সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের রাজধানী ভাটারা ব্র্যাঞ্চের গ্রাহক শিরিন আক্তারেরও। স্থানীয় বাসিন্দা এ গৃহিণী বলেন, ‘গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহে মায়ের দেওয়া জমি বিক্রি করে ১৮ লাখ টাকা পেয়েছিলাম। নিরাপত্তার জন্য সেটা ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাবে রাখি। সেখান থেকে ৩ লাখ টাকা চব্বিশের আন্দোলনের আগেই তুলেছিলাম। বাকি টাকা আটকে যায়। অবশ্য গত দুই বছরে পাঁচ-দশ হাজার করে ১০ লাখ টাকার মতো তুলেছি। বাকি ৫ লাখ টাকা এখনো আটকে আছে। উপায় না পেয়ে এ টাকা এফডিআর করে রেখেছি। এখন চাইলেও মূল টাকা তুলতে পারছি না। আবার মেয়াদ শেষ না হওয়ায় মুনাফাও তুলতে পারছি না। মুনাফা যখন দেবে, তখন আবার হেয়ার কাট করে কম দেবে।’
তিনি বলেন, ‘স্বামী ছোট একটা চাকরি করে, যা দিয়ে সঞ্চয় খুব একটা সম্ভব নয়। এ টাকা দিয়ে ছেলের ভবিষ্যতের জন্য কিছু একটা করতে চেয়েছিলাম। তা আর হলো না। ব্যাংকের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা আর ঋণখেলাপিদের শাস্তি পাচ্ছি আমরা যারা ব্যাংকগুলোকে বিশ্বাস করে টাকা রেখেছিলাম তারা।’
শুধু শিরিন বা জান্নাত আক্তারই নন—এমন করুণ কাহিনি লাখ লাখ গ্রাহকের। জানা যায়, অ্যাকাউন্টে টাকা রেখেও প্রয়োজন মতো টাকা তুলতে পারছেন না এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকসহ একীভূত পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহকরা। এ ছাড়া নানা কারণে সমস্যায় পড়া ন্যাশনাল ব্যাংকও টাকা দিতে পারছে না।
শুধু ব্যাংকই নয়, এ তালিকায় রয়েছে পাঁচটি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানও। অবসায়নের তালিকায় থাকা এফএএস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের গ্রাহকরাও দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন তাদের কষ্টার্জিত টাকা তুলতে।
বড় ধরনের মূলধন ঘাটতিতে পড়ে চরম ঝুঁকিতে ২০ ব্যাংক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত, বিশেষায়িত ও বেসরকারি মিলিয়ে দেশের মোট ২০টি ব্যাংক বড় ধরনের মূলধন ঘাটতিতে পড়ে চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। তিন মাস আগে পরিস্থিতি আরও নাজুক ছিল। একই বছরের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে মূলধন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকের সংখ্যা ছিল ২৩টি এবং সম্মিলিত ঘাটতি ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা।
দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম, দুর্নীতি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুর্বল তদারকির কারণে দেশের ব্যাংক খাতে এমন চরম দুরবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এসব অনিয়মের কারণে ব্যাংকগুলোতে অস্বাভাবিক খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এ ছাড়া ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, বোর্ডের দ্বন্দ্ব, ঋণের বিপরীতে প্রয়োজন মতো জামানত না থাকা বা অস্তিত্বহীন জামানত, বোর্ডের সদস্যদের অর্থ আত্মসাৎ, পছন্দের লোক ব্যাংকে বসিয়ে ইচ্ছামতো পরিচালনাসহ নানা সমস্যায় অনেক ব্যাংক আগে থেকেই অর্থ সংকটে ছিল। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর অনেক ব্যাংক গ্রাহকের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় টাকা দিতেও ব্যর্থ হয়। কারণ ঋণগ্রহীতাদের অনেকে পালিয়ে যায় কিংবা আটক হয়। তাদের নেওয়া ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় জামানতও পাওয়া যায়নি। এমন প্রেক্ষাপটে ব্যাংকের প্রতি আস্থা হারিয়েছেন অনেক গ্রাহক। এর ফলে এখন নতুন আমানত সংগ্রহ করে অর্থ সংকট থেকে বের হতে পারছে না ব্যাংকগুলো।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চরম সংকটে থাকা পাঁচটি ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে একটি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। এখন কয়েকটি ব্যাংক এ সম্মিলিত ব্যাংক থেকে বের হয়ে যেতে চাইছে। ব্যাংকগুলোর পুরোনো পরিচালকরাও ফিরে আসতে চাইছেন, যা নিয়ে আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে ব্যাংকগুলো।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের আমানতকারীরা ৪ শতাংশ হারে মুনাফা পাবেন, যা ১১ শতাংশ পর্যন্ত ছিল। যারা আগে ১১ শতাংশ হারে মুনাফা তুলে নিয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে মূল টাকা থেকে কেটে রেখে ৭ শতাংশ সমন্বয় করা হবে, যাকে ব্যাংকের ভাষায় হেয়ারকাট বলা হচ্ছে। ভুক্তভোগী গ্রাহকরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই ‘হেয়ারকাট’ বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছেন।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের সময় ব্যাংকটির মোট মূলধন ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে। বাকি অর্থের মধ্যে ব্যক্তি আমানতকারীদের মধ্যে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ শেয়ার ইস্যু করা হবে। আর প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের দেওয়া হবে আরও সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকার শেয়ার। পরিকল্পনা ছিল এভাবে ব্যাংকটি সরকারি মালিকানায় চলার পর একপর্যায়ে আবার বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হবে।
আমানত সুরক্ষা আইনে আস্থাহীনতা বাড়বে: গ্রাহকদের মধ্যে যারা ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা তুলতে পারছেন, আস্থাহীনতার কারণে তারাও আর ব্যাংকে টাকা রাখছেন না। সেই আস্থাহীনতার কফিনে শেষ পেরেক যেন ঠুকে দিল আমানত সুরক্ষা আইন। এই আইন অনুসারে, কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া ঘোষিত হলে একজন গ্রাহক তার অ্যাকাউন্টে যত টাকাই জমা থাকুক না কেন, সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ সরাসরি ফেরত পাবেন। দুই লাখ টাকার বেশি আমানত থাকলে গ্রাহককে অবসায়ন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত দাবি উত্থাপন করতে হবে। দেউলিয়া হওয়া প্রতিষ্ঠানটির সম্পত্তি বিক্রি বা পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাকি পাওনা অর্থ পর্যায়ক্রমে পরিশোধের ব্যবস্থা করা হয়।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন এটি অনিশ্চিত। কারণ পর্যাপ্ত সম্পত্তি না থাকলে সেই টাকা পাওয়া যাবে না। আর বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, ব্যাংকগুলো ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত রাখে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যাপ্ত মনিটরিং না থাকায়, ব্যাংকগুলোতে সুশাসন নিশ্চিত না হওয়ায়, পরিচালকদের আর্থিক অনিয়মসহ নানা কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণও বেশি থাকে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে।
রাস্তায় নামছেন গ্রাহকরা: প্রতিনিয়ত সংকটের মধ্যে পড়ায় গ্রাহকরা প্রায়ই এখন রাস্তায় নামছেন তাদের টাকা ফেরতের দাবি নিয়ে। তুলে ধরছেন তাদের জীবনে নেমে আসা চরম অর্থকষ্টের করুণ কাহিনি। সর্বশেষ গত ১০ মে ‘হেয়ারকাট’ পদ্ধতি বাতিল করে আমানত ও মুনাফা ফেরতের দাবি জানিয়েছেন সম্মিলিত পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের রাজশাহী অঞ্চলের ভুক্তভোগী গ্রাহকরা। সেইসঙ্গে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম চালুরও দাবি জানান তারা। বাংলাদেশ ভুক্তভোগী ব্যাংক আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশনের ব্যানারে এসব দাবি তুলে ধরেন তারা।
জানা যায়, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মোট গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৭৫ লাখ। এসব গ্রাহকের সঙ্গে জড়িত পরিবারের সদস্য প্রায় ৩ কোটি।
ভুক্তভোগী ব্যাংক আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব আলিফ রেজা ২০২০ সাল থেকে ইউনিয়ন ব্যাংকে হিসাব পরিচালনা করছেন। ২০২৪ জুলাই পর্যন্ত তার হিসাবে ২৮ লাখ টাকা ছিল। বাড়ি তৈরির কাজে রাখা এ আমানত থেকে গত দুই বছরে মাত্র ২ লাখ টাকা তুলতে পেরেছেন।
তিনি বলেন, ‘আমার বাড়ির কাজ কিছুদূর করে এখন বন্ধ রয়েছে। যেটুকু করেছিলাম সেটুকুও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বাকি কাজ করতে পারছি না। বড় ধরনের কোনো চিকিৎসা ব্যয় লাগলে সেটাও আমি করতে পারছি না। আমার জীবনটা এক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমার মতো এমন লাখ লাখ গ্রাহকের প্রায় একই অবস্থা। অনেকে চাকরিজীবন শেষে পেনশনের টাকা রেখেছিলেন শেষ জীবনে স্বস্তিতে কাটাবেন বলে। কিন্তু এখন তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।’
জানা যায়, আমানতকারীরা এখন চার দফা দাবি নিয়ে বিভিন্ন সময় রাস্তায় আন্দোলন করছেন। এসব দাবির মধ্যে রয়েছে, ‘হেয়ারকাট’ পদ্ধতি বাতিল করে পুরো মুনাফাসহ আমানতের টাকা ফেরত, অন্যান্য তপশিলি ব্যাংকের মতো স্বাভাবিক লেনদেন চালু, স্থায়ী আমানত, সঞ্চয় আমানতসহ বিভিন্ন আমানতের পুরো মুনাফাসহ পরিশোধ এবং ২০২৬ সালের জন্য ঘোষিত ৯ থেকে সাড়ে ৯ শতাংশ মুনাফার হার বাস্তবায়ন।
তারা বলছেন, আমাদের মধ্যে যারা এফডিআর করছেন তাদের ৪ শতাংশ হারে মুনাফা দেওয়া হচ্ছে। দেশে এখন মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ। অন্যান্য ব্যাংকে রাখলে এই টাকার ওপর ১০ শতাংশ মুনাফা পাওয়া যেত। তাহলে আমাদের সঙ্গে এই বৈষম্য কেন।
আমানতের ৮৬ শতাংশই খেলাপির হাতে: বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দ্রুত বেড়ে গত এপ্রিল শেষে এক লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকায় ঠেকেছে, যা মোট ঋণের ৮৬ শতাংশ। চার মাস আগে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত একীভূত পাঁচ ব্যাংকের ঋণ ছিল এক লাখ ৯৬ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে ছিল এক লাখ ৬৫ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা, যা ৮৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। এর মানে ঋণ কমলেও খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে।
ব্যাংক খাতের মোট মূলধন ঘাটতির অর্ধেকের বেশি এই পাঁচ ব্যাংকে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল দুই লাখ ৮২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে পাঁচ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি এক লাখ ৫০ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা। এই ব্যাংকগুলোর মোট আমানত কমে এক লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকায় নেমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোকে বিশেষ ধার হিসেবে ৫৯ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।
জামানতের বড় অংশই অস্তিত্বহীন: প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, ১০০ টাকা বন্ধকি সম্পত্তির বিপরীতে ব্যাংকগুলো ৫০ থেকে ৮০ টাকা ঋণ দিতে পারে। সমস্যায় পড়া ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ার সময় এ রকমটাই দেখিয়েছে।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রস্তুত করা সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন বলছে বড় বড় ঋণের বিপরীতে জামানত হিসেবে যেসব জমি বন্ধক রেখেছে ব্যাংকগুলো তার অধিকাংশই অস্তিত্বহীন। অনেকগুলোতে হয়েছে অতিমূল্যায়ন। একীভূত পাঁচ ব্যাংকের ঋণের বন্ধকি সম্পত্তির আর্থিক মূল্যায়ন করে এমন চিত্রই পাওয়া গেছে। সার্ভেয়ার প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নে দেখা গেছে, পাঁচ ব্যাংকের এক লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পত্তির বাজারমূল্য আছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের মাত্র ২৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ। আর ফোর্স সেল ভ্যালু বা তাৎক্ষণিক বিক্রয়মূল্য রয়েছে ৩১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রস্তুত করা সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ফার্স্ট সিকিউরিটি, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংকের। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব ব্যাংকের সম্পত্তির অস্তিত্ব নেই। আবার ঋণের বেশিরভাগ বেনামি এবং সুবিধাভোগী পলাতক থাকায় নতুন করে বন্ধক বা আদায় করা যাচ্ছে না।
অর্থনীতিবিদরা যা বলছেন: গবেষণা সংস্থা ‘চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ’-এর গবেষক এবং অর্থনীতি বিশ্লেষক এম. হেলাল আহমেদ জনি বলেন, আর্থিক খাতে বিনিয়োগকারী হলেন সাধারণ গ্রাহক। তারা আস্থাহীন হয়ে পড়লে দেশের অর্থনীতির জন্য বড় সংকট দেখা দেবে। তাই তাদের অর্থ ফেরতের উদ্যোগ সরকারকে নিতে হবে। প্রয়োজনে একটি টাস্কফোর্স করে ঋণখেলাপিদের সম্পদ বিক্রির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সংকট সমাধানের জন্য বাজেট থেকে অর্থ বরাদ্দ করা হলে এটাও পরোক্ষভাবে জনগণের অর্থ খরচ হবে। বারবার দুর্বল ব্যাংককে সরকারি অর্থ দিয়ে বাঁচানো হলে নৈতিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ব্যাংক পরিচালনায় অনিয়ম করলেও শেষ পর্যন্ত সরকার উদ্ধার করবে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে।