সরকার গঠনের পর থেকেই একদিকে ব্যস্ততা অন্যদিকে নানা সঙ্কটের মধ্য দিয়েই চলছে বিএনপি। তারপরও সাংগঠনিক কার্যক্রম গতিশীল করতে বিএনপি ও অঙ্গদলের পুনর্গঠনপ্রক্রিয়া শুরু করেছে দলটি। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী পরিষ্কার বার্তা দিয়েছেন যে, এবার কোনো ‘পকেট কমিটি’ নয়, বরং যারা রাজপথে লড়াই-সংগ্রামে পরীক্ষিত, তাদেরই প্রাধান্য দেয়া হবে। কেন্দ্র থেকে গত দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে যারা রাজপথে আন্দোলন সংগ্রামে সোচ্চার ছিলেন, জেল জুলুম, মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন, তাদের নিয়ে কমিটি গঠনের নির্দেশনা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেটি মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠছে। মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে পকেট কমিটি ঘোষণা ও গঠনের আয়োজন চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, রাজনীতির কোনো পাঠ কিংবা দলের পেছনে কোনো অবদানের প্রয়োজন নেই এখন বিএনপিতে। যিনি যত টাকা দেবেন তিনিই নেতা হবেন। এ ছাড়া মূল দল ও অঙ্গসংগঠনে নিজের আস্থাভাজন লোকদের নিয়ে পকেট কমিটিও করা হচ্ছে। সম্প্রতি ছাত্রদলের কমিটি গঠন নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্তানে যেভাবে বিক্ষোভসহ সহিংসতা সৃষ্টি হয়েছে, সেটি মূলত কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অমান্য করে আর্থিক লেনদেন, পকেট কমিটি ও বহিরাগতদের রাখার কারণেই হয়েছে বলে জানা গেছে।
তথ্যানুযায়ী, বিএনপির ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে ১০টিরই মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। দলের হাইকমান্ড মেয়াদোত্তীর্ণ এসব কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন নেতৃত্ব আনার প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে। সে লক্ষ্যে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এরই মধ্যে সংগঠনের নেতাদের সাথে বৈঠক শুরু করেছেন। এরই মধ্যে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের সাথে বৈঠক করেছেন। এই তিনটি সংগঠনের নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এবারের পুনর্গঠনে ‘ত্যাগী, যোগ্য ও তরুণ’ সামনে নিয়ে আসাকে মূল লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এখানেও ত্যাগী ও যোগ্যদের বাদ দিয়ে বহিরাগত ও পকেট কমিটি করার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের একাধিক নেতার সাথে কথা বলে জানা যায়, আওয়ামী লীগ আমলে স্বাভাবিক পরিস্থিতি না থাকায় কমিটি করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু সরকার পতনের দুই বছর হতে চললেও নতুন কমিটি গঠনে এখনো সিরিয়াস না হওয়ায় অনেকের মধ্যেই হতাশা তৈরি হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন খান মোহন মনে করেন, বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক দলের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ইমেজ সঙ্কট মোকাবেলা করা। তার মতে, ক্ষমতায় আসার পর যেকোনো দলে সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশ, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা দেখা দিতে পারে। তাই নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে সততা, সংযম এবং জনসম্পৃক্ততাকে অগ্রাধিকার দেয়া জরুরি।
সূত্র মতে, বিএনপিতে কমিটি গঠন ঘিরে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। জুলাই পরবর্তীতে যে কয়টি কমিটি করা হয়েছে, তার সবটিতেই বিদ্রোহ হয়েছে, আর্থিক লেনদেনসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির ঘোষিত ৩৫টি ওয়ার্ড আহ্বায়ক কমিটি ঘিরে দলে তীব্র বিতর্ক, ক্ষোভ লক্ষ করা গেছে। বাদ পড়াদের অভিযোগ, দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিল, তাদের বাদ দিয়ে টাকার বিনিময়ে ‘পকেট কমিটি’ গঠন করা হয়েছে।
কমিটি গঠনের বিষয়ে সাবেক কাউন্সিলর ও চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সহসভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ঘোষিত কমিটি আওয়ামী লীগের লিয়াজোঁ কমিটি। আন্দোলনের পরীক্ষিত সৈনিকদের বাদ দিয়ে সুবিধাভোগীদের পদ দেয়া হয়েছে, এটা দলের শেকড় ধ্বংসের চক্রান্ত।
একই ঘটনা ঘটেছে মোংলা উপজেলার সুন্দরবন ইউনিয়নের বিএনপির কমিটি গঠনের ক্ষেত্রেও। বিএনপির ত্যাগী নেতা কর্মীদের নাম বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগের দোসরদের দিয়েই কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে মোংলা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিবাদ জানায় ইউনিয়নের বিএনপির সব অঙ্গ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। তারা বলেছে, ৫ আগস্টের পরে বিএনপি সেজে দলে যারা ঢুকে পড়েছে ওই সব আওয়ামী লীগ কর্মী। ফ্যাসিস্ট হাসিনার দোসররা সুন্দরবন ইউনিয়নের নেতৃত্ব দিচ্ছে। টাকার বিনিময়ে কমিটিতে পদায়ন করা হয়েছে।
সরকার গঠনের ফেনীতে যুবদলের বিতর্কিত কমিটি পরবর্তী কর্মকাণ্ড জেলা বিএনপির অস্বস্তির বড় কারণ হয়ে উঠেছে। যুবদলের কমিটিতে ছাত্রলীগ-যুবলীগ সংশ্লিষ্টদের স্থান দেয়া, চাঁদাবাজি-দখলদারিত্বের অভিযোগ এবং শৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনায় কেন্দ্রীয় নেতারা বিব্রত ও ক্ষুব্ধ। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ভাষ্য, ফেনী জেলা যুবদল এখন আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গত ৪ মে যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জেলা যুবদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। জানা গেছে, পৌর যুবদলের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে এ পদক্ষেপ নেয়া হয়। ওই বিজ্ঞপ্তিতে পৌর যুবদলের সভাপতি এ কে এম জাহিদ হোসেন বাবলু ও সাধারণ সম্পাদক হায়দার আলী রাসেল পাটোয়ারীকে প্রাথমিক সদস্য পদসহ দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
সাংগঠনিক কার্যক্রম আরো গতিশীল করতে সম্প্রতি একযোগে ৪৫ কমিটি ঘোষণা করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। এসব কমিটিতে জায়গা হয়নি অনেক ত্যাগী নেতাকর্মীর। এতে অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ জানিয়েছেন। রাজধানীর নয়াপল্টনসহ কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছেন বঞ্চিতরা। নতুন কমিটি গঠনের পর ফেসবুকে লাইভে এসে অঝোরে কেঁদেছেন লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মো: জাহিদ। পকেট কমিটি গঠন, ছাত্রলীগকে পুনর্বাসন, বিবাহিত ও অছাত্রদের পদায়ন এবং ত্যাগী নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়নের অভিযোগ পদবঞ্চিতদের। অবস্থা এমন যে, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরের নিজ জেলা নোয়াখালীতে তার বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন স্থানীয় ছাত্রদল নেতারা। নবঘোষিত কমিটিকে ‘পকেট কমিটি’ আখ্যা দিয়ে নাছিরকে জেলায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। গত শনিবার ঝিনাইদহে সদ্য ঘোষিত জেলা ছাত্রদলের কমিটি বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা নবঘোষিত কমিটিকে ‘পকেট কমিটি’ আখ্যা দিয়ে ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়নের দাবি জানান।
জানা গেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে ২০১৭ সালের ৩ মের হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামি এনামুল হক সুজনকে পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাধারণ সম্পাদক করা হয়। যুবলীগের সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত রাকিবকে ১১ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি করা, ছাত্র হত্যা মামলার আসামি নাদিমকে পদ দেয়া, জেলা যুবদলের সদস্য রিপুকে আহ্বায়কের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে কমিটিতে রাখা এবং তার পরিবারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আলোচনার এসেছে। স্থানীয় নেতারা মনে করছেন, বিভিন্ন ওয়ার্ডে যুবলীগ ও ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টদের পদ দেয়ার ঘটনায় সংগঠনটির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে, দাগনভূঞা, সোনাগাজী ও ছাগলনাইয়াসহ বিভিন্ন উপজেলায় যুবদলের নেতাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সাথে ঘনিষ্ঠতা, চোরাচালান, ট্রাক চুরি ও নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
শুধু দেশে নয়, বিদেশেও কমিটি গঠন নিয়ে রয়েছে নানা বিতর্ক। অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে একটি অবৈধ ও একক কর্তৃত্বের বৃত্তে আটকে আছে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্য শাখা বিএনপি। মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এটিকে তাদের ব্যক্তিগত সম্পদ মনে করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মিশিগান বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিব সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বিএনপি কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এটি গণমানুষের দল, একটি প্রাণবন্ত গণতান্ত্রিক সংগঠন। অথচ মিশিগান বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বছরের পর বছর একই পদে বহাল রয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোবাশ্বের টুটুল বলেন, রাজনীতিতে ওপরে ওঠার প্রতিযোগিতা থাকবেই। কিন্তু সেটা যদি ‘নীতির’ বদলে ‘কৌশল আর লেনদেনে’ রূপ নেয়, তাহলেই সমস্যা। বিএনপির উচিত হবে একটি অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন ও পুরস্কার-শাস্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। তা না হলে এই অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব দীর্ঘমেয়াদে দলের ক্ষতি করবে।
জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী নয়া দিগন্তকে বলেন, দলীয় অঙ্গসংগঠনগুলোর পুনর্গঠনকার্যক্রম একটি চলমান প্রক্রিয়া। আমাদের নেতা তারেক রহমান নিজে দায়িত্বশীলদের নিয়ে এ বিষয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করছেন। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই আমরা একটি শক্তিশালী কাঠামো দেখতে পাব। অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, বিএনপি একটি বড় দল। এখানে ছোটখাটো কিছু অভিযোগ থাকবেই। সবাইকে তো কমিটিতে স্থান দেয়া সম্ভব নয়। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।